ভাবা, জানা, বোঝা, মনে রাখা কিংবা সিদ্ধান্ত নেওয়া—এসব শব্দ সাধারণত মানুষের মানসিক কার্যকলাপ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence বা AI) সম্পর্কে একই ধরনের শব্দ ব্যবহার করলে অনেক সময় অজান্তেই যন্ত্রকে মানুষের মতো সচেতন বা অনুভূতিসম্পন্ন হিসেবে ভাবার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। গবেষকদের মতে, এ ধরনের ভাষা সাধারণ মানুষের মধ্যে এআই সম্পর্কে ভুল ধারণা সৃষ্টি করতে পারে এবং প্রযুক্তির প্রকৃত সক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতা বোঝার ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি তৈরি করে।
সম্প্রতি এ বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা পরিচালনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের Iowa State University-এর গবেষক Jo Mackiewicz ও Jeannine Aune। গবেষণায় আরও অংশ নেন Brigham Young University-এর সহযোগী অধ্যাপক Matthew J. Baker এবং University of Northern Colorado-এর সহকারী অধ্যাপক Jordan Smith। তাদের গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে Technical Communication Quarterly জার্নালে।
এআই ‘বোঝে’ না, ডেটার প্যাটার্ন বিশ্লেষণ করে
গবেষকদের মতে, “চ্যাটজিপিটি বুঝতে পেরেছে”, “এআই সিদ্ধান্ত নিয়েছে” বা “এআই জানে”—এ ধরনের বাক্য বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কারণ বর্তমানের এআই সিস্টেম মানুষের মতো সচেতনভাবে চিন্তা করে না, অনুভূতি অনুভব করে না কিংবা নিজস্ব উদ্দেশ্য নিয়ে সিদ্ধান্তও নেয় না। বরং এটি বিপুল পরিমাণ ডেটার মধ্যে থাকা ভাষাগত ও পরিসংখ্যানগত প্যাটার্ন বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য সবচেয়ে উপযুক্ত উত্তর তৈরি করে।
উদাহরণ হিসেবে, কেউ যদি নির্দেশ দেন—“বৃষ্টির দিন নিয়ে একটি অনুচ্ছেদ লেখো”, তাহলে এআই মানুষের মতো বৃষ্টির অভিজ্ঞতা স্মরণ করে লেখে না। বরং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বিপুল ডেটা থেকে “বৃষ্টি”, “মেঘলা”, “শান্ত পরিবেশ”, “প্রকৃতি”, “ছাতা”, “ভেজা রাস্তা” ইত্যাদি শব্দ ও ধারণার পারস্পরিক সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে একটি সুসংগঠিত লেখা তৈরি করে। অর্থাৎ এখানে কোনো অনুভূতি বা ব্যক্তিগত উপলব্ধি নয়, বরং ভাষার প্যাটার্ন বিশ্লেষণই মূল প্রক্রিয়া।
২০ বিলিয়ন শব্দ বিশ্লেষণ
গবেষণায় প্রায় ২০টি দেশের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রায় ২০ বিলিয়ন শব্দ বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষকরা বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণ করেন, “AI” ও “ChatGPT”-এর সঙ্গে learns, knows, understands, means ইত্যাদি মানুষের মানসিক কার্যকলাপ নির্দেশকারী শব্দ কতটা ব্যবহৃত হচ্ছে।
তাদের মতে, এ ধরনের ভাষাগত প্রবণতাকে বলা হয় Anthropomorphism (অ্যানথ্রোপোমরফিজম)। অর্থাৎ কোনো অমানবিক বস্তু, প্রযুক্তি বা সিস্টেমের ওপর মানুষের বৈশিষ্ট্য, অনুভূতি বা মানসিক ক্ষমতা আরোপ করা।
কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?
গবেষকদের মতে, ভাষার এই ব্যবহার শুধু শব্দের বিষয় নয়; এটি মানুষের চিন্তাভাবনাকেও প্রভাবিত করতে পারে।
যদি মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে যে এআই সত্যিই “বোঝে”, “ভাবতে পারে” বা “নিজে সিদ্ধান্ত নেয়”, তাহলে তারা প্রযুক্তিটির সীমাবদ্ধতা ভুলে যেতে পারে। এর ফলে এআই-এর ওপর অতিরিক্ত আস্থা বা নির্ভরশীলতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এমন পরিস্থিতিতে ভুল তথ্য, পক্ষপাতপূর্ণ ফলাফল বা বিভ্রান্তিকর উত্তরও মানুষ যাচাই না করেই গ্রহণ করতে পারে।
বিশেষ করে সাংবাদিকতা, শিক্ষা, গবেষণা, স্বাস্থ্যসেবা এবং সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে এআই ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ঝুঁকিও আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
কী ধরনের ভাষা ব্যবহার করা উচিত?
গবেষকরা পরামর্শ দিয়েছেন, এআই সম্পর্কে কথা বলার সময় যতটা সম্ভব নিরপেক্ষ ও প্রযুক্তিনির্ভর ভাষা ব্যবহার করা উচিত।
উদাহরণ হিসেবে—
- সঠিক: “এআই ডেটা বিশ্লেষণ করে উত্তর তৈরি করে।”
- সঠিক: “মডেলটি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে সম্ভাব্য উত্তর তৈরি করেছে।”
- এড়িয়ে চলা উচিত: “এআই সমস্যাটি বুঝে উত্তর দিয়েছে।”
- এড়িয়ে চলা উচিত: “চ্যাটজিপিটি জানে যে…”
এ ধরনের নিরপেক্ষ ভাষা ব্যবহার করলে পাঠক বা ব্যবহারকারীরা প্রযুক্তিটির প্রকৃত কার্যপ্রণালি সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাবেন।
সাংবাদিকদের জন্য বিশেষ পরামর্শ
গবেষকরা সংবাদমাধ্যমের জন্য Associated Press (AP) Stylebook-এর ভাষা নির্দেশিকা অনুসরণের ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন। তাদের মতে, সাংবাদিকদের উচিত এমন শব্দচয়ন করা, যাতে এআইকে মানুষের মতো সচেতন সত্তা হিসেবে উপস্থাপন না করা হয়। এতে প্রযুক্তি নিয়ে সংবাদ আরও নিরপেক্ষ, তথ্যভিত্তিক ও বিভ্রান্তিমুক্ত হবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্রুত উন্নত হচ্ছে এবং আমাদের দৈনন্দিন জীবন, শিক্ষা, গবেষণা ও কর্মক্ষেত্রে এর ব্যবহারও বাড়ছে। তবে প্রযুক্তি যত শক্তিশালীই হোক, এটি মানুষ নয়—এটি একটি উন্নত গণনাভিত্তিক ব্যবস্থা, যা ডেটা বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য উত্তর তৈরি করে।
তাই এআই সম্পর্কে আমরা কীভাবে কথা বলি, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। ভাষার ছোট একটি পরিবর্তনও মানুষের ধারণা ও প্রত্যাশাকে প্রভাবিত করতে পারে। গবেষকদের মতে, এআইকে মানবিক গুণসম্পন্ন সত্তা হিসেবে নয়, বরং একটি শক্তিশালী প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম হিসেবে ব্যাখ্যা করাই সবচেয়ে দায়িত্বশীল ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি।
ভিডিও প্রতিবেদনে দেখুন:






