ডেঙ্গু প্রতিরোধে ঘরে ও বাইরে করণীয় | চ্যানেল আই অনলাইন

ডেঙ্গু প্রতিরোধে ঘরে ও বাইরে করণীয় | চ্যানেল আই অনলাইন

ডেঙ্গুর প্রকোপ বিশ্বজুড়ে দ্রুত বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) জানিয়েছে, গত ৫০ বছরে বিশ্বজুড়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ প্রায় ৩০ গুণ বেড়েছে। একই সঙ্গে লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনের গবেষক ড. অলিভার জে. ব্র্যাডির নেতৃত্বে Nature Microbiology জার্নালে প্রকাশিত একটি আন্তর্জাতিক গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৮০ সালের মধ্যে বিশ্বের ৬১০ কোটিরও বেশি মানুষ ডেঙ্গুর ঝুঁকিতে থাকতে পারেন।

ডেঙ্গুর কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। তাই মশার কামড় এড়ানো এবং এডিস মশার বংশবিস্তার রোধ করাই ডেঙ্গু প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

পরিবারকে ডেঙ্গু থেকে সুরক্ষিত রাখুন: এডিস মশাকে বংশবিস্তার করতে দেবেন না

ডেঙ্গু ছড়ায় এডিস (Aedes) প্রজাতির মশার মাধ্যমে। তাই এই মশার সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করাই ডেঙ্গু প্রতিরোধের মূল কৌশল।

এডিস মশা সাধারণত মানুষের ব্যবহার করা বা ফেলে রাখা ছোট ছোট পানিভর্তি পাত্রে ডিম পাড়ে। যেমন—

  • প্লাস্টিকের বোতল
  • ফুলের টব
  • পুরোনো টায়ার
  • বালতি
  • ফ্রিজের পানির ট্রে
  • নারকেলের খোসা, ভাঙা কাপ বা যেকোনো পাত্র যেখানে পানি জমে থাকে

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এডিস মশার ডিম শুকনো অবস্থায়ও প্রায় এক বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। পরে পানি পেলেই সেগুলো থেকে নতুন মশা জন্মায়

এডিস মশা স্থির পানিতে ডিম পাড়ে। এই ডিম এক বছর পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে এবং পানি পেলেই ফুটে যায়। তাই আশপাশ পরিষ্কার রাখা এবং যেখানে পানি জমতে পারে এমন পাত্র সরিয়ে ফেলা অত্যন্ত জরুরি।
— বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)

বাড়িতে ডেঙ্গু প্রতিরোধে যা করবেন

  • পানির সংরক্ষণ পাত্র সবসময় ঢেকে রাখুন এবং সপ্তাহে অন্তত একবার পরিষ্কার করুন।
  • টায়ার, বালতি, ফুলের টব, বোতল বা অন্য যেকোনো পাত্রে পানি জমতে দেবেন না।
  • দরজা-জানালায় মশা প্রতিরোধী জালি ব্যবহার করুন।
  • প্রয়োজনে মশা নিরোধক (রিপেলেন্ট), কয়েল, ভ্যাপোরাইজার বা কীটনাশকযুক্ত মশারি ব্যবহার করুন।
  • সম্ভব হলে ওভিট্র্যাপ বা অন্যান্য মশা ধরার ফাঁদ ব্যবহার করুন।
  • ঘর ঠান্ডা রাখতে এয়ার কন্ডিশনার ব্যবহার করলে মশার কার্যক্রম কিছুটা কমে।

ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সকলের অংশগ্রহণ জরুরি

শ্রীলঙ্কায় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ শুধু স্বাস্থ্যখাতের পক্ষে সম্ভব নয়এজন্য পুরো সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
— বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)

ডেঙ্গু প্রতিরোধ শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; প্রত্যেক ব্যক্তি ও পরিবারেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কারণ একটি বাড়িতে জমে থাকা অল্প পানি থেকেও পুরো এলাকায় এডিস মশার বিস্তার ঘটতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একাধিক মশা নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি একসঙ্গে ব্যবহার করলে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব

এর সফল উদাহরণ রয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে।

  • সিঙ্গাপুরে সমন্বিত জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি, নিয়মিত নজরদারি এবং মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের মাধ্যমে ডেঙ্গু মোকাবিলায় উল্লেখযোগ্য সাফল্য এসেছে। বাসিন্দাদের ফুলদানির পানি নিয়মিত ফেলে দেওয়া এবং আশপাশ পরিষ্কার রাখার মতো ব্যক্তিগত দায়িত্ব পালনে উৎসাহিত করা হয়।
  • মেক্সিকোরপ্যাটিও লিম্পিও (Patio Limpio)” কর্মসূচিতে স্থানীয় মানুষ নিজেরাই বাড়ির আশপাশে মশার প্রজননস্থল খুঁজে বের করে ধ্বংস করেন। গবেষণায় দেখা গেছে, এই কর্মসূচিতে অংশ না নেওয়া পরিবারগুলোর ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অংশগ্রহণকারীদের তুলনায় দুই গুণেরও বেশি ছিল।

জনস্বাস্থ্য সংস্থা ডেঙ্গুর টিকার ভূমিকা

জনস্বাস্থ্য সংস্থাগুলো জনগণকে সচেতন করা, সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়া এবং প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

উদাহরণ হিসেবে সিঙ্গাপুরে সরকার একটি ট্রাফিক লাইট সতর্কতা ব্যবস্থা চালু করেছে। সেখানে লাল, হলুদ ও সবুজ সংকেতের মাধ্যমে এলাকাভিত্তিক ডেঙ্গুর ঝুঁকি জানিয়ে বাসিন্দাদের প্রয়োজনীয় সতর্কতা গ্রহণে উৎসাহিত করা হয়।

অন্যদিকে, শ্রীলঙ্কায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের যৌথ জনসচেতনতামূলক কর্মসূচির ফলে ডেঙ্গুজনিত হাসপাতালে ভর্তি প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে এবং বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব এড়ানো সম্ভব হয়।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে টিকাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এটি শুধু টিকা গ্রহণকারী ব্যক্তিকে গুরুতর ডেঙ্গুর ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা দিতে সহায়তা করে না, বরং রোগের বিস্তার কমাতেও ভূমিকা রাখতে পারে। বর্তমানে কিছু ডেঙ্গুর টিকা অনুমোদিত হয়েছে এবং আরও কয়েকটি টিকা উন্নয়নের বিভিন্ন ধাপে রয়েছে।

ডেঙ্গুর টিকা চারটি ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত ডেঙ্গু ভাইরাস—DENV-1, DENV-2, DENV-3 এবং DENV-4—জনিত সংক্রমণ প্রতিরোধে সহায়তা করতে পারে।
— যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (CDC)

সচেতনতাই ডেঙ্গু প্রতিরোধের সবচেয়ে বড় অস্ত্র

বিশ্বব্যাপী নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও ডেঙ্গুর বিস্তার এখনো বাড়ছে। তাই ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ এবং জনস্বাস্থ্য সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগই পারে এই রোগের ঝুঁকি কমাতে।

মনে রাখতে হবে, ডেঙ্গু আক্রান্ত অনেকের ক্ষেত্রে উপসর্গ হালকা বা একেবারেই নাও থাকতে পারে। কিন্তু উপসর্গ দেখা দেওয়া প্রতি ২০ জনের মধ্যে প্রায় জনের ক্ষেত্রে রোগটি দ্রুত গুরুতর প্রাণঘাতী রূপ নিতে পারে

তাই নিজের বাড়ি, ছাদ, বারান্দা ও আশপাশে কোথাও যেন তিন দিনের বেশি পানি জমে না থাকে, সেটি নিশ্চিত করুন। নিজের পরিবারকে সুরক্ষিত রাখার পাশাপাশি প্রতিবেশীকেও সচেতন করুন। কারণ ডেঙ্গু প্রতিরোধে ব্যক্তিগত সচেতনতা ও সামাজিক অংশগ্রহণই সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা।

Scroll to Top