ঢাকা, ৩০ জানুয়ারি – আর্থিক খাতের সংস্কার ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় এবং কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।
তিনি বলেন, ভবিষ্যতে অনেক কঠিন চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে হবে। ষড়যন্ত্র করে কেউ যাতে জনগণের অধিকার কেড়ে নিতে না পারে, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। কেউ যাতে আন্দোলনের নামে অরাজকতা সৃষ্টি করে মানুষের জানমাল ও জীবিকার ক্ষতিসাধন করতে না পারে, সে বিষয়েও থাকতে হবে সতর্ক।
গুজব ও অপপ্রচারের বিষয়ে নজরদারি বৃদ্ধি ও জনগণকে সম্পৃক্ত রেখে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান রাষ্ট্রপতি।
মঙ্গলবার (৩০ জানুয়ারি) দ্বাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন। বর্তমান রাষ্ট্রপতি এই প্রথম জাতীয় সংসদে ভাষণ দিলেন।
স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে অধিবেশনে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধীদলীয় নেতা জিএম কাদেরসহ সরকার দলীয় অন্য সংসদ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
ভাষণে রাষ্ট্রপতি বলেন, গণতন্ত্রের স্বাভাবিক গতিপথ রুদ্ধ হলে উন্নয়নও বাধাগ্রস্ত হয়। গত দেড় দশকে দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং ধারাবাহিক গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা বজায় থাকায় এ উন্নয়ন সম্ভব হয়েছে। উন্নয়ন স্থায়ী ও টেকসই করতে হলে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে মজবুত, তৃণমূল পর্যায়ে গণতন্ত্রের চর্চা ছড়িয়ে দিতে হবে। উন্নয়নের এ গতিধারা অব্যাহত রাখতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হবে।
তিনি বলেন, জাতীয় সংসদ আমাদের গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের মূলভিত্তি। জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত মহান এ প্রতিষ্ঠানটি জনগণের সব প্রত্যাশার ধারক ও বাহক। তাদের চাহিদাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে নাগরিকদের কল্যাণে জাতীয় সংসদ যথাযথ ও কার্যকর ভূমিকা পালন করবে এটাই জনগণের প্রত্যাশা।
সংসদ সদস্যরা সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, জনগণ অনেক আশা নিয়ে তাদের সেবা করার সুযোগ দিয়েছে, যাতে তাদের চাওয়া-পাওয়া আপনারা সংসদে তুলে ধরেন। এটাই সংসদ সদস্য হিসেবে আপনাদের মূল দায়িত্ব ও কর্তব্য। সংসদের অনেক সদস্য প্রথমবারের মতো নির্বাচিত হয়েছেন। এরমধ্যে অনেকে বয়সে নবীন। সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি এবং সংশ্লিষ্ট রীতি-নীতি আয়ত্ত করে তারা দক্ষ পার্লামেন্টারিয়ান হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলবেন এটি আমার প্রত্যাশা। এক্ষেত্রে জাতীয় সংসদের অভিজ্ঞ সংসদ সদস্যরা তাদের মেধা ও অভিজ্ঞতা দিয়ে নবীনদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিতে পারেন।
তিনি আরও বলেন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, পরমতসহিষ্ণুতা, মানবাধিকার ও আইনের শাসন সুসংহতকরণ এবং জাতির অগ্রযাত্রার স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষার সফল বাস্তবায়নে সরকারি দলের পাশাপাশি বিরোধীদলকেও গঠনমূলক ভূমিকা পালন করতে হবে। রাজনৈতিক নীতি-আদর্শ, মত-পথের ভিন্নতা থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সংসদকে গণতন্ত্র ও উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করার ক্ষেত্রে কোনো মতদ্বৈধতা জনগণ প্রত্যাশা করে না। তাই সংসদকে আরও কার্যকর ও গতিশীল করতে সবার প্রতি আমি আন্তরিক আহ্বান জানাচ্ছি।
দ্রব্যমূল্যের প্রসঙ্গ টেনে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, করোনা অতিমারির ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে না উঠতেই শুরু হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। ফলে পশ্চিমা দেশসমূহ এবং রাশিয়ার মধ্যে পাল্টাপাল্টি বিভিন্ন অবরোধের ফলে খাদ্য, জ্বালানিসহ বিশ্বব্যাপী নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। আমাদের দেশেও জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে, যার প্রভাব পড়েছে জনজীবনে। সরকার বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণের মাধ্যমে জনজীবনে স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিতকরণের চেষ্টা করেছে। এ কার্যক্রমের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে এক কোটি স্বল্প আয়ের পরিবারের মধ্যে ভর্তুকি মূল্যে সয়াবিন তেল, মসুর ডাল ও চাল বিক্রি। পাশাপাশি ওএমএস কর্মসূচির মাধ্যমে দরিদ্র ও নিম্নআয়ভুক্ত মানুষের কাছে সাশ্রয়ী মূল্যে চাল ও আটা বিক্রি করা হচ্ছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য স্থিতিশীল রাখার জন্য নিয়মিত বাজার পরিবীক্ষণ করা হচ্ছে এবং বেশ কয়েকটি পণ্যের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংকট দেখা দিলে এর প্রভাব আমাদের ওপরও পড়বে। এজন্য আমাদের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি থাকতে হবে। যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য কৃষি খাতের উৎপাদন ব্যবস্থা অব্যাহত রাখতে হবে। উচ্চমূল্য ফসল উৎপাদনে গুরুত্ব দিয়ে রপ্তানি নিশ্চিত করার জন্য উন্নত কৃষিপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে।
কৃষিপণ্য সংরক্ষণাগার এবং কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে রাষ্ট্রপ্রধান বলেন, বাংলাদেশের পণ্যসমূহ রপ্তানি বাজারে যাতে শুল্কমুক্ত সুবিধা পায় সে লক্ষ্যে দ্বিপাক্ষিক ও আঞ্চলিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সংক্রান্ত চুক্তি সই এবং কার্যকর করার ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতের লক্ষ্যে গভীর সমুদ্রে গ্যাস ও তেল অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির পাশাপাশি নতুন নতুন শ্রমবাজারের অনুসন্ধান করতে হবে যাতে দক্ষ শ্রমশক্তি রপ্তানি সম্ভব হয়। আর্থিক খাতের সংস্কার এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
সূত্র: জাগো নিউজ
আইএ/ ৩০ জানুয়ারি ২০২৪





