হারিয়ে যাওয়া স্বর্ণলতার দেখা যান্ত্রিক শহরে

হারিয়ে যাওয়া স্বর্ণলতার দেখা যান্ত্রিক শহরে

বাংলাদেশের প্রকৃতিতে সৌন্দর্য বাড়িয়ে তোলে এমন কয়েকটি লতার মধ্যে স্বর্ণলতা অন্যতম। এই উদ্ভিদ তার নিজ উজ্জ্বল সোনালি রঙের মাধ্যমে নজর কেড়ে নিতো সকলের। গ্রাম বাংলার মেঠোপথে এই উদ্ভিদ নিজের মত করে তার আপন রুপের মহিমা ছড়িয়ে দিত চারদিকে। গ্রাম-গঞ্জে এই উদ্ভিদকে অনেকে শূণ্যলতা বা আলোক লতা নামেও চিনেন। একসময় গ্রামে বসবাসকারী সব বয়সী লোকজন এটিকে চিনলেও বর্তমানে এর দেখা পাওয়া খুবই দুষ্কর। দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে এই চিরচেনা স্বর্ণলতা।

হারিয়ে যাওয়া এই স্বর্ণলতার দেখা মিলেছে রাজধানী ঢাকার শাহবাগ চত্বরে। একটি বড়ই গাছের মাথায় সৌন্দর্য বর্ধন করে বেঁচে আছে এই স্বর্ণলতা। যান্ত্রিক এই শহরে নিরব চিত্তে একা দাঁড়িয়ে নিজ সৌন্দর্য দিয়ে নজর কেড়ে নিচ্ছে হাজারো মানুষের। কিন্তু, যান্ত্রিক শহরে দাঁড়িয়ে থাকা লতাটির নাম যে স্বর্ণলতা সেটিও জানেন না অনেকে। পরজীবি এই উদ্ভিদটি বেশিরভাগই বড়ই গাছের কাণ্ড আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকে। এ লতিকাটির ইংরেজি নাম জায়ান্ট ডডার (giant dodder) এবং এর বৈজ্ঞানিক নাম কাসকিউটা রিফ্লেক্সা (Cuscuta reflexa)।

পথচারীরা বলেন, স্বর্ণলতা একটি ঔষধি উদ্ভিদ। বর্তমানে গ্রাম-গঞ্জেও এ উদ্ভিদের দেখা মেলে না। এখনকার ছেলে-মেয়েরা এগুলো চিনে না। আমরা ছোট বেলায় এই লতাগুলো নিয়ে অনেক খেলাধুলা করেছি। এ লতার সাথে আমাদের অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। গ্রামে-গঞ্জে যে উদ্ভিদের দেখা নেই কিন্তু ঢাকা শহরের মতো জায়গায় এ উদ্ভিদের দেখা মিলেছে, এটা আসলে খুব অবাক করার মত বিষয়।

ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের উদ্ভিদতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড.মো. আব্দুল করিম বার্তা ২৪. কমকে বলেন, স্বর্ণলতা একটি পরজীবী উদ্ভিদ। গাছেই এই লতার জন্ম হয়, গাছেই এটি বেড়ে ওঠে এবং বংশ বিস্তার করে।

তিনি আরও বলেন, স্বর্ণলতা একটি পত্রহীন এবং একবর্ষজীবী উদ্ভিদ। এটি জীবন্ত গাছে জন্ম নিয়ে গাছকে অবলম্বন করেই টিকে থাকে। এই লতাটি হস্টেরিয়া (Hosteria) নামক চোষক অঙ্গের মাধ্যমে আশ্রয়ী গাছ থেকে পুষ্টি উপাদান গ্রহণ করে বেঁচে থাকে।

পৌষ থেকে চৈত্র মাসে মূলত এই লতাটি বেড়ে ওঠে এবং এরপরে এটির ফুল ফোঁটে। তবে এই সময়ের আগে-পরেও এই পরজীবী উদ্ভিদের জন্ম হয় এবং এতে ফুল ফোঁটে, ফলও আসে। মৌসুমের বাইরেও বেঁচে থাকে এ লতা।

স্বর্ণলতার ঔষধি গুণাগুণ সম্পর্কে তিনি বলেন, এটি বায়ুনাশক ও পেট ব্যথায় খুব কার্যকর। এ লতা জন্মনিরোধক ও কৃমিনাশক হিসেবেও কাজ করে থাকে। এটি নির্যাস পেটফাঁপা ও কোষ্ঠকাঠিন্যের জন্য খুব উপকারী। মুখে ঘা হলে এ লতার সেদ্ধ করা জল দিয়ে কুলকুচি করলে ঘা দ্রুত ভালো হয়। স্বর্ণলতা উদ্ভিদ থেকে বীজ সংগ্রহ করে সেই বীজ চূর্ণ করে খেলেও কৃমি ভালো হয়।

স্বর্ণলতা হারিয়ে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, আজ থেকে ১০-১২ বছর আগেও এটি দেশের যে কোন স্থানে ব্যাপকভাবে চোখে পড়তো। মূলত বড়ই গাছই ছিল এর প্রধান ধারক। কিন্তু বর্তমানে পথের পাশে বড়ই গাছের ডাল-পালা ছেঁটে ফেলার কারণে এই স্বর্ণলতা আর জন্মায় না। যদিও বা জন্মায় তাকে আগাছা হিসেবে উপড়ে ফেলা হয়। আর এভাবেই কমে যাচ্ছে স্বর্ণলতা। তবে এ ধরণের ঔষধি উদ্ভিদ গুলোর পরিচর্যা করে এগুলোকে বাঁচিয়ে রাখা প্রয়োজন বলেও মনে করছেন তিনি।

Scroll to Top