বয়স মাত্র ১৫ বছর। যে বয়সে একজন শিক্ষার্থীর জীবনের বড় অংশ জুড়ে থাকে পড়াশোনা, স্বপ্ন আর নিজেকে গড়ে তোলার প্রস্তুতি, সেই বয়সেই আন্তর্জাতিক আর্চারির মঞ্চে নিজের সামর্থ্যের জানান দিচ্ছেন বাংলাদেশের তরুণ প্রতিভা সম্পন্ন সায়মা সালাহ উদ্দিন। ইরাকের সুলাইমানিয়ায় চলমান ২০২৬ এশিয়া কাপ ওয়ার্ল্ড র্যাংঙ্কিং টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় লেগে রিকার্ভ নারী একক ইভেন্টের ফাইনালে উঠে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন বিকেএসপি’র এই শিক্ষার্থী।
আগামী ২৯ অক্টোবর স্বর্ণ পদকের লড়াইয়ে ইরানের অভিজ্ঞ প্রতিযোগী মোবিনা ফাল্লাহর মুখোমুখি হবে সায়মা। ফাইনালে ওঠার পথে তাঁর ধারাবাহিকতা, আত্মবিশ্বাস ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ পারফরম্যান্স বাংলাদেশের আর্চারিতে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
কোয়ালিফিকেশন রাউন্ডে পঞ্চম, এরপর একের পর এক জয়
সুলাইমানিয়ায় অনুষ্ঠিত এশিয়া কাপের কোয়ালিফিকেশন রাউন্ডে রিকার্ভ নারী একক ইভেন্টে ৬৩৫ পয়েন্ট অর্জন করে পঞ্চম স্থান নিশ্চিত করেন সায়মা। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে লড়াই করে নকআউট পর্বে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দেন তিনি।
নকআউট পর্বে পাকিস্তানের নিহাত নাহিদকে ৬–০ সেট পয়েন্টে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠেন সায়মা। এরপর আজারবাইজানের লালা আবদুরাহমানোভাকে একই ব্যবধানে পরাজিত করে জায়গা করে নেন সেমিফাইনালে।
সেমিফাইনালে তাঁর প্রতিপক্ষ ছিলেন কাজাখস্তানের আলেক্সান্দ্রা জেমলিয়ানোভা। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লড়াইয়ে তাঁকে ৬–৪ সেট পয়েন্টে হারিয়ে ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করেন বাংলাদেশের এই তরুণ আর্চার।
একটি আন্তর্জাতিক আসরে পরপর তিনটি নকআউট ম্যাচে জয় তুলে নিয়ে ফাইনালে পৌঁছানো সায়মার আত্মবিশ্বাস ও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ। বিশেষ করে সেমিফাইনালে কাজাখস্তানের প্রতিপক্ষকে পরাজিত করে তিনি দেখিয়েছেন, চাপের মুহূর্তেও নিজের লক্ষ্য ধরে রাখার সামর্থ্য তাঁর রয়েছে।
জাতীয় পর্যায়ের সাফল্য থেকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে
সায়মার এই অগ্রযাত্রার পেছনে রয়েছে নিয়মিত অনুশীলন, প্রতিযোগিতামূলক অভিজ্ঞতা এবং নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রত্যয়।
ওয়ার্ল্ড আর্চারির প্রকাশিত প্রোফাইল ও পরিচিতিমূলক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ঢাকায় অনুষ্ঠিত “তীর ১৬তম জাতীয় আর্চারি চ্যাম্পিয়নশিপ-২০২৫” এ রিকার্ভ নারী বিভাগের বাছাই পর্বে ৭২০-এর মধ্যে ৬৪৯ পয়েন্ট অর্জন করে শীর্ষস্থান দখল করেন সায়মা। পরে নকআউট পর্ব পেরিয়ে সেমিফাইনালে পৌঁছে ব্রোঞ্জ পদকও অর্জন করেন তিনি।
জাতীয় পর্যায়ের এই সাফল্য তাঁর প্রতিভার প্রাথমিক স্বীকৃতি দেয়। পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে নিজের দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ পান তিনি।
মাত্র ১৪ বছর বয়সে আন্তর্জাতিক আর্চারির গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে নিজের যাত্রা শুরু করা সায়মা এখন দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় তরুণ রিকার্ভ নারী আর্চার হিসেবে পরিচিতি গড়ে তুলছেন। তাঁর সামনে রয়েছে আরও বড় প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়া, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা অর্জন এবং নিজের পারফরম্যান্সকে ধারাবাহিকভাবে উন্নত করার সুযোগ।
বিকেএসপির শিক্ষার্থী, বাংলাদেশের সম্ভাবনা
বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান—বিকেএসপিতে পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার পথে এগিয়ে চলেছেন সায়মা। একজন তরুণ অ্যাথলেটের জন্য পড়াশোনা ও উচ্চপর্যায়ের ক্রীড়া চর্চার মধ্যে সমন্বয় করা গুরুত্বপূর্ণ। সেই পথচলায় তাঁর বর্তমান সাফল্য নিঃসন্দেহে অনুপ্রেরণাদায়ক।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাফল্য অর্জনের জন্য শুধু প্রতিভা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন নিয়মিত অনুশীলন, মানসিক দৃঢ়তা, শৃঙ্খলা, উপযুক্ত প্রশিক্ষণ এবং প্রতিযোগিতার অভিজ্ঞতা। সায়মার সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স ভবিষ্যতে তাঁর আরও উন্নতির সম্ভাবনাকে সামনে নিয়ে এসেছে।
একই সঙ্গে তাঁর এই অর্জন তরুণ প্রজন্মের কাছে একটি ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দেয়—সঠিক পরিবেশ, প্রশিক্ষণ ও অধ্যবসায়ের সমন্বয় ঘটাতে পারলে অল্প বয়সেও আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে নিজের পরিচয় তৈরি করা সম্ভব।
স্বর্ণ পদকের লড়াইয়ে সামনে ইরানের মোবিনা ফাল্লাহ
ফাইনালে সায়মার প্রতিপক্ষ ইরানের মোবিনা ফাল্লাহ। বাছাইপর্বে ফাল্লাহ ৬৫৫ পয়েন্ট অর্জন করে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন। অন্যদিকে কাজাখস্তানের আলেক্সান্দ্রা জেমলিয়ানোভা ৬৫৮ পয়েন্ট নিয়ে কোয়ালিফিকেশন রাউন্ডে শীর্ষস্থান অর্জন করেন। পরে সেমিফাইনালে জেমলিয়ানোভাকেই হারিয়ে ফাইনালে পৌঁছান সায়মা।
এই পরিসংখ্যান ফাইনালের প্রতিদ্বন্দ্বিতার গুরুত্ব তুলে ধরে। তবে কোয়ালিফিকেশন রাউন্ডের স্কোরই চূড়ান্ত ফল নির্ধারণ করে না; নকআউট পর্বে প্রতিটি সেটে লক্ষ্যভেদ, ধারাবাহিকতা ও চাপ সামলানোর ক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
আগামী ২৯ অক্টোবর সায়মার সামনে তাই শুধু একটি পদকের লড়াই নয়, নিজের সামর্থ্যকে আরেকটি বড় মঞ্চে প্রমাণ করার সুযোগও অপেক্ষা করছে।
বাংলাদেশ সময় বিকেল ৫টা ২০ মিনিটে ফাইনাল অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূচিতে উল্লেখ করা হয়েছে। ম্যাচের সময়সূচিতে পরিবর্তন হলে আয়োজকদের সর্বশেষ তথ্য অনুসরণ করা প্রয়োজন।
একজন সায়মা, অসংখ্য তরুণের স্বপ্ন
বাংলাদেশের আর্চারিতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তরুণ প্রতিভাদের উঠে আসা আশাব্যঞ্জক। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অভিজ্ঞতা অর্জনের পাশাপাশি পদকের লড়াইয়ে নিজেদের অবস্থান তৈরি করার এই প্রচেষ্টা দেশের ক্রীড়াঙ্গনের জন্য ইতিবাচক।
সায়মা সালাহ উদ্দিনের ফাইনালে ওঠার সাফল্যকে তাই কেবল একজন অ্যাথলেটের ব্যক্তিগত অর্জন হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। এটি দেশের তরুণ আর্চারদের সম্ভাবনা, বিকেএসপি’র মতো ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বেরও একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
তবে সামনে পথ আরও দীর্ঘ। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ধারাবাহিক সাফল্য অর্জন করতে হলে প্রয়োজন নিয়মিত প্রশিক্ষণ, পর্যাপ্ত প্রতিযোগিতার সুযোগ, অভিজ্ঞতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। সাশমার মতো প্রতিভাবান তরুণদের বিকাশে এসব সহযোগিতা অব্যাহত থাকা জরুরি।
লাল-সবুজের পতাকা উঁচু করার অপেক্ষা
মাত্র ১৫ বছর বয়সে এশিয়া কাপের স্বর্ণপদকের ফাইনালে পৌঁছে সায়মা সালাহ উদ্দিন ইতোমধ্যে বাংলাদেশের ক্রীড়া প্রেমীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। এখন সবার অপেক্ষা তাঁর ফাইনাল লড়াইয়ের দিকে।
স্বর্ণ পদক অর্জন করতে পারলে তা হবে তাঁর ক্যারিয়ারের একটি স্মরণীয় মাইলফলক। আর ফলাফল যা-ই হোক, এই পর্যায়ে পৌঁছানোর অভিজ্ঞতা তাঁর ভবিষ্যৎ পথচলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সায়মার জন্য রইল আন্তরিক শুভকামনা। তাঁর হাত ধরে বাংলাদেশের আর্চারি আরও এগিয়ে যাক, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উজ্জ্বল হোক লাল-সবুজের পতাকা—এটাই এখন ক্রীড়া প্রেমীদের প্রত্যাশা।
সায়মা সালাহ উদ্দিন শুধু একজন তরুণ আর্চার নন; তিনি বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের এক সম্ভাবনাময় নতুন নক্ষত্র। তাঁর স্বপ্ন আরও বড় হোক, সাফল্যের পথ হোক আরও দীর্ঘ ও উজ্জ্বল।




