কেন ৫১ লাখ মানুষকে দুই ডোজ কলেরার টিকা দিচ্ছে সরকার? | চ্যানেল আই অনলাইন

কলেরা প্রতিরোধে দেশের উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় টিকাদান কর্মসূচি শুরু করছে সরকার। আইসিডিডিআর,বি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), ইউনিসেফ ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সহযোগিতায় শনিবার (২২ আগস্ট) থেকে শুরু হবে প্রথম ধাপের টিকাদান।

প্রথম ডোজ দেওয়া হবে আজ শনিবার (২২ আগস্ট) থেকে সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত। দ্বিতীয় ডোজের কর্মসূচি চলবে শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর ) থেকে রোববার (২৫ অক্টোবর) পর্যন্ত। ‘প্রিভেন্টিভ ওরাল কলেরা ভ্যাকসিনেশন ক্যাম্পেইন-২০২৬’-এর আওতায় দুই ধাপে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকার ৫১ লাখ ৭৫ হাজার মানুষকে মুখে খাওয়ার কলেরার টিকা দেওয়া হবে।

গত বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) সকালে কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, টিকাদানের জন্য এলাকা নির্বাচনে বিজ্ঞানভিত্তিক বিশ্লেষণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

কলেরা টিকাদান ক্যাম্পেইনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন

যেসব এলাকায় দেওয়া হবে টিকা

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, প্রথম ধাপে দেশের ১৪টি ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলা ও থানায় টিকা দেওয়া হবে। এক বা তার বেশি বয়সী গর্ভবতী নারী ছাড়া অন্য সব নাগরিক বিনামূল্যে ‘ইউরিকল প্লাস’ নামের এই টিকা নিতে পারবেন।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের লালবাগ, গেন্ডারিয়া, কদমতলী ও কামরাঙ্গীরচর থানার ১৭টি ওয়ার্ডের ১৯২টি কেন্দ্রে প্রায় ১১ লাখ ৭০ হাজার মানুষকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।

এ ছাড়া ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের শেরেবাংলা নগর, খিলক্ষেত ও তেজগাঁও, মুন্সিগঞ্জ সদর, কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ, হোসেনপুর ও তাড়াইল, নারায়ণগঞ্জ সদর এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর ও নবীনগর এলাকায় কর্মসূচি চলবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা জানিয়েছে, রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর চিকিৎসার পরিবর্তে আগেই প্রতিরোধ গড়ে তুলতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

গর্ভবতী নারী ছাড়া এক বা তার চেয়ে বেশি বয়সের সব নাগরিককে বিনামূল্যে দেওয়া হবে টিকাটি

কেন এখন টিকা দেওয়া হচ্ছে

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, কলেরার টিকাদান হঠাৎ নেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত নয়। পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে কয়েক বছর ধরেই এ কর্মসূচির প্রস্তুতি চলছিল।

২০২৪ থেকে ২০২৮ সাল পর্যন্ত নির্দিষ্ট সংখ্যক টিকা বাংলাদেশকে দেওয়ার কথা ছিল আন্তর্জাতিক টিকা জোট গ্যাভির। তবে বৈশ্বিক আর্থিক সংকট এবং টিকার চাহিদা ও উৎপাদনসংক্রান্ত বিভিন্ন কারণে কর্মসূচি পিছিয়ে যায়। পরে ২০২৫ সালে এটি অনুমোদন পায়।

রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. হালিমুর রশিদ বলেন, গ্যাভি অনেক আগেই বাংলাদেশকে টিকা দিয়েছে এবং তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী এখন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। গত ছয় মাস ধরে এ নিয়ে পরিকল্পনা ও মাইক্রোপ্ল্যান তৈরির কাজ হয়েছে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথম ধাপের পর পর্যায়ক্রমে উচ্চঝুঁকিতে থাকা মোট ১৪৪টি উপজেলা ও থানায় টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে বর্তমানে গ্যাভির পক্ষ থেকে এক বছরের জন্য প্রয়োজনীয় টিকা পাওয়া গেছে।

২০২২ সালে কলেরার প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে মুখে খাওয়ার কলেরা টিকা দেয়া হয়

কীভাবে নির্ধারণ করা হলো ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, টিকাদানের এলাকা নির্ধারণে ‘প্রায়োরিটি এরিয়া অব মাল্টিসেক্টোরাল ইন্টারভেনশন’ বা পামি বিশ্লেষণ ব্যবহার করা হয়েছে।

ডা. শামসাদ রব্বানী খানের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্লোবাল টাস্কফোর্স অন কলেরা কন্ট্রোলের সঙ্গে গ্যাভি একটি নির্দিষ্ট টুল তৈরি করেছে। ওই টুলের মাধ্যমে বিভিন্ন সূচক বিশ্লেষণ করে দেশের ১৪৪টি ঝুঁকিপূর্ণ থানা ও উপজেলা চিহ্নিত করা হয়েছে।

এ ক্ষেত্রে রোগের প্রকোপ, জনসংখ্যার ঘনত্ব, ঝুঁকিপ্রবণতা, আগের টিকাদানের ইতিহাস এবং সংক্রমণের আশঙ্কার মতো বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

দুই ডোজের এই টিকা গ্রহণ করলে এর সুরক্ষা তিন থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত থাকতে পারে বলে স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

যেকোনো টিকার মতোই কলেরার টিকা নিলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যেতে পারে

টিকা বিনামূল্যে, সরকারকে অর্থ দিতে হচ্ছে না

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা জানিয়েছে, ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্স গ্যাভি বাংলাদেশকে কলেরার টিকা অনুদান হিসেবে দিয়েছে। ফলে টিকাদান কর্মসূচির জন্য সরকারকে আলাদা করে টিকা কেনার অর্থ বরাদ্দ করতে হচ্ছে না।

এর আগে ২০১৭ সালে এবং ২০২৫ সালের শুরুতে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতেও কলেরার টিকা দেওয়া হয়েছিল।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ২৯ লাখ মানুষ কলেরায় আক্রান্ত হন এবং প্রায় ৯৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। বিশ্বের প্রায় ১৩০ কোটি মানুষ এ রোগের ঝুঁকিতে রয়েছেন, যাদের বড় অংশ আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ায় বসবাস করেন।

কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ডব্লিউএইচওর প্রতিনিধি আহমেদ জামশীদ মোহামেদ জানান, বাংলাদেশে কলেরা প্রতিরোধে ১ কোটি ৩৫ লাখ টিকার ডোজ নিশ্চিত করা হয়েছে।

পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কতটা

স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অন্য টিকার মতো কলেরার টিকা গ্রহণের পরও কিছু মানুষের সাময়িক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে বমি ভাব বা ডায়রিয়া হতে পারে।

তবে গ্লোবাল টাস্কফোর্স অন কলেরা কন্ট্রোলসহ বিভিন্ন গবেষণায় এই টিকাকে তুলনামূলক কম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াযুক্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ডা. শামসাদ রব্বানী খান জানান, ২০২২ সালে ঢাকায় কলেরার প্রাদুর্ভাবের সময় এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে একই টিকা ব্যবহারের অভিজ্ঞতায় উল্লেখযোগ্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি।

ইউনিসেফ বাংলাদেশও জানিয়েছে, কলেরা থেকে সুরক্ষার জন্য দুটি ডোজই নেওয়া প্রয়োজন। একটি ডোজ নিলে প্রত্যাশিত দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা পাওয়া যাবে না।

আক্রান্তের তুলনায় টিকার পরিধি নিয়ে প্রশ্ন

কলেরায় আক্রান্ত মানুষের তুলনায় বড় সংখ্যক জনগোষ্ঠীকে টিকার আওতায় আনা হচ্ছে কি না, তা নিয়েও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে।

২০২৬ সালের আগস্টে প্রকাশিত আইসিডিডিআর,বি ও কয়েকটি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা যায়, ২০০৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ঢাকায় নথিভুক্ত কলেরা রোগীর সংখ্যা ছিল ৬ হাজার ১৪১। ২০০৪ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত আক্রান্তের হার সবচেয়ে বেশি ছিল। পরে কমলেও ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে আবার আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ে।

তবে হাসপাতালে ভর্তি না হওয়া রোগীদের হিসাব না থাকায় প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও ওরস্যালাইনের ব্যবহারের কারণে কলেরার ঝুঁকি আগের তুলনায় কিছু ক্ষেত্রে কমেছে। ফলে টিকাদানে অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে কি না, তা নিয়ে মূল্যায়ন প্রয়োজন।

তবে টিকা দেওয়ার পর এর বাস্তব সুফল কতটা পাওয়া যায়, তা আক্রান্তের আগের ও পরের পরিসংখ্যান তুলনা করেই বোঝা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

টিকার পাশাপাশি নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনে গুরুত্ব

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা জানিয়েছে, বৈশ্বিক রোডম্যাপ অনুসরণ করে বাংলাদেশে জাতীয় কলেরা নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনা (এনসিসিপি) প্রণয়ন করা হয়েছে।

দীর্ঘমেয়াদে কলেরা নিয়ন্ত্রণে নিরাপদ পানীয় জলের সুবিধা নিশ্চিত করা, স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং নিয়মিত হাত ধোয়ার মতো স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এ পরিকল্পনায়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মতে, টিকাদানের পাশাপাশি নিরাপদ পানি, উন্নত স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করা গেলে দেশে কলেরার প্রাদুর্ভাব ও এর ক্ষয়ক্ষতি কমাতে একটি সমন্বিত প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

Scroll to Top