বন্ধ্যাত্ব নির্ণয়ে কোন কোন পরীক্ষা জরুরি, বয়স ও হরমোন কতটা প্রভাব ফেলে | চ্যানেল আই অনলাইন

বন্ধ্যাত্ব নির্ণয়ে কোন কোন পরীক্ষা জরুরি, বয়স ও হরমোন কতটা প্রভাব ফেলে | চ্যানেল আই অনলাইন

গত পর্বে আমরা আলোচনা করেছিলাম বন্ধ্যাত্ব কী, স্বাভাবিক গর্ভধারণের প্রক্রিয়া এবং নারী-পুরুষ উভয়ের বন্ধ্যাত্বের কারণ নিয়ে। আজকের পর্বে থাকছে বন্ধ্যাত্ব নির্ণয়ে ব্যবহৃত পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং বয়স, হরমোন ও মানসিক চাপের ভূমিকা।

উপরের আলোচনা থেকে বোঝা যায়, বন্ধ্যাত্বের জন্য স্বামী বা স্ত্রীর যে কারও সমস্যা থাকতে পারে। অর্থাৎ বন্ধ্যাত্ব কোনো একক ব্যক্তির সমস্যা নয়, এটি দম্পতির সমস্যা। তাই চিকিৎসার স্বার্থে স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি।

বন্ধ্যাত্বের পরীক্ষা-নিরীক্ষা সাধারণত শুরু হয় স্বামীর বীর্য পরীক্ষার মাধ্যমে। পরীক্ষার আগে সাধারণত ২ থেকে ৩ দিন যৌনমিলন থেকে বিরত থাকতে বলা হয়। এটি একটি সহজ ও নন-ইনভেসিভ পরীক্ষা এবং বাংলাদেশের প্রায় সব জেলাতেই করা যায়। একটি মাত্র পরীক্ষার মাধ্যমেই পুরুষের প্রজননক্ষমতা সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ধারণা পাওয়া সম্ভব।

যদি প্রাথমিকভাবে দেখা যায় বীর্যে উল্লেখযোগ্য কোনো সমস্যা নেই, তাহলে গুরুত্ব দেওয়া হয় স্ত্রীর পরীক্ষা-নিরীক্ষায়। এসব পরীক্ষা সাধারণত ধাপে ধাপে করা হয়।

প্রথমেই করা হয় একটি বিশেষ ধরনের ট্রান্সভ্যাজাইনাল আল্ট্রাসনোগ্রাফি (TVS)। এর মাধ্যমে জরায়ুর টিউমার, ডিম্বাশয়ের টিউমার বা অন্যান্য অস্বাভাবিকতা সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পাওয়া যায়। একই সঙ্গে চিকিৎসার সময় ওভারিতে ফলিকল বা ডিম ঠিকভাবে বড় হচ্ছে কি না, সেটিও পর্যবেক্ষণ করা হয়।

যেসব নারীর দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ্যাত্ব রয়েছে অথবা যাদের অ্যাপেনডিসাইটিস, একটোপিক প্রেগন্যান্সি কিংবা পেলভিক সার্জারির ইতিহাস আছে, অথবা ডিম পরিপক্ব হওয়া এবং স্বামীর বীর্য স্বাভাবিক থাকা সত্ত্বেও গর্ভধারণ হচ্ছে না, তাদের ক্ষেত্রে ডিম্বনালী বা ফেলোপিয়ান টিউবের পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে।

ডিম্বনালী খোলা আছে কি না, তা নির্ণয়ের জন্য কয়েকটি পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়।

১. হিস্টেরোসালপিনগোগ্রাফি (HSG): এ পরীক্ষায় জরায়ুর ভেতরে রেডিও-ওপেক ডাই প্রবেশ করিয়ে এক্স-রের মাধ্যমে দেখা হয় ফেলোপিয়ান টিউব খোলা আছে কি না।

২. স্যালাইন ইনফিউশন সোনোগ্রাফি (SIS): একটি সরু ক্যাথেটারের মাধ্যমে জরায়ুতে স্যালাইন প্রবেশ করানো হয়। স্যালাইন যদি পাউচ অব ডগলাসে পৌঁছে, তাহলে ধরে নেওয়া হয় টিউব খোলা রয়েছে।

৩. ল্যাপারোস্কপি: প্রয়োজনে এই পদ্ধতির মাধ্যমেও ডিম্বনালীর অবস্থা মূল্যায়ন করা হয়।

চিকিৎসার শুরুতেই স্বামী-স্ত্রী উভয়ের বিস্তারিত চিকিৎসা-ইতিহাস নেওয়া হয়। দুজনের ক্ষেত্রেই বয়স গুরুত্বপূর্ণ হলেও নারীদের ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব অনেক বেশি। কারণ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডিমের সংখ্যা যেমন কমে, তেমনি এর গুণগত মানও হ্রাস পায়।

নারীর মাসিকের ইতিহাসও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণভাবে মাসিক নিয়মিত হলে ধরে নেওয়া হয় যে ওভুলেশন বা ডিম নিঃসরণ হচ্ছে। তবে এর কিছু ব্যতিক্রম রয়েছে। প্রয়োজনে এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে অতিরিক্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যেসব নারীর ওজন বেড়ে যায়, মুখ বা পেটে অতিরিক্ত লোম গজায় এবং মাসিক অনিয়মিত হয়, তাদের অনেকেরই পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম (PCOS) থাকতে পারে। ‘পলিসিস্টিক’ শব্দের অর্থ হলো ডিম্বাশয়ে একাধিক সিস্ট বা ফলিকল থাকা। পিসিওএসের সঙ্গে বন্ধ্যাত্বের সম্পর্ক থাকলে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে চিকিৎসা করা প্রয়োজন।

এ ছাড়া ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হাইপোথাইরয়েডিজম এবং প্রোল্যাকটিনজনিত হরমোনের সমস্যা থাকলেও সেগুলোর যথাযথ চিকিৎসা জরুরি।

বর্তমান জীবনযাত্রায় মানসিক চাপ ও উদ্বেগ আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে, যা বন্ধ্যাত্বের অন্যতম একটি কারণ হতে পারে। অতিরিক্ত মানসিক চাপের সময় শরীরে কর্টিসল নামের একটি হরমোন নিঃসৃত হয়, যা শুক্রাণু ও ডিমের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

মানসিক চাপ কমাতে নিয়মিত হাঁটা, যোগব্যায়াম, গান শোনা, বই পড়া, নিজের জন্য কিছু সময় রাখা এবং বিভিন্ন ধরনের শারীরিক ব্যায়াম উপকারী হতে পারে।

অনেক সময় দেখা যায়, পড়াশোনা, চাকরি বা সামাজিক ব্যস্ততার কারণে স্বামী-স্ত্রীর সময়মতো শারীরিক সম্পর্ক হচ্ছে না। কারও কাজের শিফট আলাদা হওয়ায়ও এমন সমস্যা তৈরি হতে পারে। ফলে গর্ভধারণের সম্ভাবনা কমে যায়।

সাধারণত মাসিক চক্রের একটি নির্দিষ্ট সময়ে ডিম নিঃসৃত হয়। নিয়মিত ২৮ দিনের মাসিকচক্রে সাধারণত ১২ থেকে ১৬তম দিনের মধ্যে ওভুলেশন হয়। ব্যবহারিকভাবে মাসিকের মাঝামাঝি সময়টিকে সবচেয়ে উর্বর বা ফার্টাইল পিরিয়ড হিসেবে ধরা হয়। এ সময় এক দিন পরপর শারীরিক সম্পর্ক করলে গর্ভধারণের সম্ভাবনা বাড়ে।

ডিম সাধারণত ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত কার্যকর থাকে, আর শুক্রাণু ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। তাই ওভুলেশনের সময়টিকে লক্ষ্য করেই পরিকল্পনা করা গুরুত্বপূর্ণ।

গর্ভধারণের জন্য সুস্থ ডিম ও সুস্থ শুক্রাণুর পাশাপাশি তাদের সঠিক সময়ে মিলিত হওয়াও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেসব দম্পতির সবকিছু স্বাভাবিক থাকে, তাদের ক্ষেত্রেও প্রতি মাসিক চক্রে গর্ভধারণের সম্ভাবনা মাত্র ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ। তাই প্রথম মাসেই সফলতা নাও আসতে পারে। ধৈর্য ধরে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।

কখনো কোনো মাসে ডিমের মান ভালো থাকে, আবার অন্য কোনো মাসে শুক্রাণুর মান ভালো থাকে। এমনকি জ্বর, সর্দি বা ভাইরাল সংক্রমণের মতো সাময়িক অসুস্থতাও শুক্রাণুর মানকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই চিকিৎসার ফল পেতে কিছুটা সময় লাগা অস্বাভাবিক নয়।

কিছু হরমোনজনিত সমস্যার ক্ষেত্রে রিপ্রোডাক্টিভ এন্ডোক্রাইনোলজি অ্যান্ড ইনফার্টিলিটি (REI) বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। যেমন, পিসিওএস, অ্যামেনোরিয়া বা মাসিক বন্ধ থাকা, বয়ঃসন্ধি পার হওয়ার পরও মাসিক শুরু না হওয়া কিংবা গর্ভধারণ ছাড়াই অল্প বয়সে মাসিক স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া।

অতিরিক্ত ওজন বা স্বাভাবিকের তুলনায় খুব কম ওজনের কারণেও মাসিক বন্ধ থাকতে পারে। অনেক ক্ষেত্রেই জীবনধারার পরিবর্তনের মাধ্যমে এসব সমস্যার সমাধান সম্ভব।

কিছু নারীর ক্ষেত্রে অপরিণত বয়সেই ডিম্বাশয়ের কার্যক্ষমতা কমে যায়। ৪০ বছর বয়সের আগেই ডিম্বাশয়ের ক্ষমতা অস্বাভাবিকভাবে হ্রাস পাওয়ায় মাসিক বন্ধ হয়ে যেতে পারে বা বন্ধ্যাত্ব দেখা দিতে পারে। এ ক্ষেত্রে যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষা, দীর্ঘমেয়াদি কাউন্সেলিং এবং পরিকল্পিত চিকিৎসা প্রয়োজন।

এ ছাড়া মস্তিষ্কের পিটুইটারি গ্রন্থির হরমোনজনিত সমস্যা, হাইপোথাইরয়েডিজম কিংবা অতিরিক্ত প্রোল্যাকটিন হরমোনের কারণেও বন্ধ্যাত্ব হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে নির্ভুল রোগনির্ণয় এবং সময়মতো চিকিৎসাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

পরবর্তী পর্বে থাকছে:

এন্ডোমেট্রিওসিস, ল্যাপারোস্কপি, হিস্টেরোস্কপি, আইইউআই এবং আইভিএফসহ আধুনিক বন্ধ্যাত্ব চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা।

(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আইয়ের সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Scroll to Top