এই খবরটি পডকাস্টে শুনুনঃ
বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, সংঘাত, নিপীড়ন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারণে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বর্তমানে প্রায় ১১ কোটি ৭৮ লাখে পৌঁছেছে। অর্থাৎ বিশ্বের প্রতি ৭০ জন মানুষের মধ্যে একজন নিজ ঘরবাড়ি ছেড়ে বাস্তুচ্যুত অবস্থায় জীবনযাপন করছেন।
আজ (১১ জুন) বৃহস্পতিবার বৃহস্পতিবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে আল জাজিরা জানিয়েছে, জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের সর্বশেষ প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। বৈশ্বিক বাস্তুচ্যুতির সংকট এখনও ভয়াবহ পর্যায়ে থাকলেও গত এক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো মোট বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা প্রায় চার শতাংশ কমেছে।
ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, সংঘাতপ্রবণ বিভিন্ন দেশ থেকে বিপুল সংখ্যক শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষের নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার কারণে এই হ্রাস সম্ভব হয়েছে। ২০২৫ সালে প্রায় এক কোটি ৪৭ লাখ মানুষ নিজ ভূমিতে ফিরে গেছেন, যা সংস্থাটির ইতিহাসে শরণার্থীদের প্রত্যাবর্তনের সবচেয়ে বড় রেকর্ড। ফিরে যাওয়া মানুষের অধিকাংশই কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র, সুদান, সিরিয়া, আফগানিস্তান, ইউক্রেন ও মিয়ানমারে ফিরেছেন।
তবে পরিস্থিতিকে পুরোপুরি ইতিবাচক হিসেবে দেখছে না জাতিসংঘ। সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, অনেক ক্ষেত্রে মানুষ এখনও অনিরাপদ ও অস্থিতিশীল পরিবেশে ফিরতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে তাদের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে। বিশ্বের মোট শরণার্থীর প্রায় ৭২ শতাংশ এসেছে মাত্র সাতটি দেশ থেকে। এসব দেশের মধ্যে রয়েছে ভেনেজুয়েলা, ফিলিস্তিন, ইউক্রেন, সিরিয়া, আফগানিস্তান, সুদান এবং দক্ষিণ সুদান। সবচেয়ে বেশি শরণার্থী এসেছে ভেনেজুয়েলা থেকে, যার সংখ্যা প্রায় ৬৪ লাখ। এরপর রয়েছে ফিলিস্তিন, ইউক্রেন ও সিরিয়া।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে বাস্তুচ্যুত মানুষের মধ্যে প্রায় ৬ কোটি ৮৬ লাখ নিজ দেশের অভ্যন্তরেই বাস্তুচ্যুত অবস্থায় রয়েছেন। এছাড়া ২ কোটি ৮৫ লাখ ইউএনএইচসিআর-এর আওতাভুক্ত শরণার্থী, ৯০ লাখ আশ্রয়প্রার্থী, ৭২ লাখ আন্তর্জাতিক সুরক্ষার প্রয়োজন রয়েছে এমন ব্যক্তি এবং প্রায় ৬০ লাখ ফিলিস্তিনি শরণার্থী রয়েছেন, যারা ইউএনআরডাব্লিউএ-এর আওতাভুক্ত।
অন্যদিকে বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছে মাত্র সাতটি দেশে। শরণার্থী আশ্রয়দাতা দেশের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে কলম্বিয়া। এরপর রয়েছে জার্মানি, তুরস্ক, উগান্ডা, ইরান, চাদ এবং পাকিস্তান। ইউএনএইচসিআর-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৬৫ শতাংশ শরণার্থী নিজ দেশের প্রতিবেশী রাষ্ট্রেই আশ্রয় নিয়েছে।
নতুন করে বাস্তুচ্যুতির সংকটও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৬ সালের মার্চের শেষভাগ থেকে শুরু হওয়া সংঘাতের ফলে লেবাননে ১০ লাখের বেশি এবং ইরানে প্রায় ৩২ লাখ মানুষ নতুন করে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এতে বৈশ্বিক বাস্তুচ্যুতির সংখ্যা কমার যে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গিয়েছিল, তা অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে।
বৈশ্বিক শরণার্থী সংকটের ইতিহাসও দীর্ঘ। ১৯৫১ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে শরণার্থীদের সুরক্ষার জন্য জাতিসংঘ শরণার্থী কনভেনশন প্রণয়ন করে। সে সময় বিশ্বে শরণার্থীর সংখ্যা ছিল মাত্র ২১ লাখ। পরবর্তী সময়ে আফগানিস্তান, ইথিওপিয়া, ইরাক, সিরিয়া, দক্ষিণ সুদান, ইউক্রেন এবং সুদানের যুদ্ধ ও সংঘাতের কারণে এই সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে প্রায় ১২ কোটির কাছাকাছি পৌঁছেছে।





