স্বাস্থ্যসেবার সংকটে এআই কি হতে পারে গেমচেঞ্জার? | চ্যানেল আই অনলাইন

স্বাস্থ্যসেবার সংকটে এআই কি হতে পারে গেমচেঞ্জার? | চ্যানেল আই অনলাইন

এই খবরটি পডকাস্টে শুনুনঃ

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। রাজধানীকেন্দ্রিক চিকিৎসাসেবা, গ্রাম-শহরের বৈষম্য, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংকট, হাসপাতালগুলোতে রোগীর অতিরিক্ত চাপ এবং চিকিৎসা ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি সাধারণ মানুষের জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পাওয়াকে কঠিন করে তুলেছে। এমন বাস্তবতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) স্বাস্থ্য খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চিকিৎসকের বিকল্প নয়, বরং সহায়ক প্রযুক্তি হিসেবে এআই বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৬৮ শতাংশ মানুষ গ্রামে বাস করেন। তবে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, আধুনিক হাসপাতাল ও উন্নত রোগ নির্ণয় সুবিধা মূলত ঢাকা ও বড় শহরকেন্দ্রিক। ফলে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর বড় অংশ সময়মতো চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয়। দারিদ্র্য, যাতায়াত সমস্যা ও সচেতনতার অভাব এ বৈষম্য আরও বাড়িয়ে তুলছে। স্বাস্থ্য খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, ঢাকার সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিন প্রায় ৫০ থেকে ৭০ হাজার রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন, যাদের বড় অংশই গ্রামাঞ্চল থেকে আগত।

রোগী ও চিকিৎসক সহায়ক এআই

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, হাসপাতালে আসা জরুরি ও সাধারণ রোগীদের একটি বড় অংশকে প্রাথমিক পর্যায়ে সঠিক স্বাস্থ্য পরামর্শ, ঘরোয়া ব্যবস্থাপনা এবং কমিউনিটি পর্যায়ের চিকিৎসার মাধ্যমে হাসপাতালে আসা থেকে বিরত রাখা সম্ভব।

কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, এই হার ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, অ্যাজমা, ডায়রিয়া, হালকা সংক্রমণ ও ছোটখাটো আঘাতজনিত সমস্যার মতো অনেক রোগ রয়েছে, যেগুলোকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে ‘অ্যাম্বুলেটরি কেয়ার সেনসিটিভ কন্ডিশন’ (এসিএসসি) বলা হয়। এসব রোগ প্রাথমিক পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণে রাখা গেলে জটিলতা এবং হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজনীয়তা অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. আহমদ পারভেজ জাবীন চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, স্বাস্থ্যসেবায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বাড়লেও এটি কখনোই একজন চিকিৎসকের বিকল্প হতে পারে না। বরং রোগী ও চিকিৎসকের মধ্যে একটি কার্যকর সহায়ক মাধ্যম হিসেবে কাজ করতে পারে। কারণ চিকিৎসা শুধু তথ্য বিশ্লেষণ বা রোগের লক্ষণ মিলিয়ে দেখার বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িত থাকে রোগীর শারীরিক অবস্থা, মানসিক অবস্থা, পারিবারিক প্রেক্ষাপট, চিকিৎসকের অভিজ্ঞতা এবং মানবিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

এছাড়াও বিশেষ করে রোগীর রেকর্ড কিপিংয়ে এআই ব্যাপক ভূমিকা রাখছে।

এআই এক্স-রে: দেশে যক্ষ্মা শনাক্তে নতুন দিগন্ত

বাংলাদেশে যক্ষ্মা নির্মূলে কাজ করা বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা ইতোমধ্যে এআই-সমর্থিত পোর্টেবল এক্স-রে প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। এর ফলে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে সক্রিয়ভাবে রোগী খুঁজে বের করা সহজ হয়েছে। বিশেষ করে যাদের দীর্ঘদিন কাশি, ওজন কমে যাওয়া বা অন্যান্য উপসর্গ রয়েছে, তাদের দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে।

এআই-সমর্থিত পোর্টেবল এক্স-রে মেশিন স্বাস্থ্যসেবায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। সহজে বহনযোগ্য এসব যন্ত্র নিয়ে স্বাস্থ্যকর্মীরা সরাসরি মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারছেন। মাঠপর্যায়ে এক্স-রে করার পর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সফটওয়্যার কয়েক মিনিটের মধ্যেই ফুসফুসের ছবিতে যক্ষ্মার সম্ভাব্য লক্ষণ বিশ্লেষণ করে প্রাথমিক ফলাফল দিতে সক্ষম হচ্ছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. আহমদ পারভেজ জাবীন বলেন, বাংলাদেশে যক্ষ্ণা রোগে এআই সাপোর্টেড পোর্টেবল এক্সরে মেশিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এই এক্সরে যক্ষ্না রোগের স্কিনিং করছে, যা পরবর্তী ধাপের অন্যান্য পরীক্ষার মাধ্যমে ‍যক্ষ্না রোগ হিসেবে নিশ্চিত হয়ে চিকিৎসার আওতায় আসছে। আগে যেখানে প্রত্যন্ত এলাকার মানুষকে এক্স-রে করাতে জেলা বা শহরে যেতে হতো, সেখানে এখন অনেক ক্ষেত্রে তাদের এলাকাতেই স্ক্রিনিং সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। এতে সময় ও অর্থ সাশ্রয়ের পাশাপাশি রোগ শনাক্তের হারও বাড়ছে।

 এআই কীভাবে সহায়তা করতে পারে?

বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্য খাতে এআইয়ের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। এআইভিত্তিক প্রযুক্তি রোগীর উপসর্গ বিশ্লেষণ, স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে সতর্কতা, ওষুধ গ্রহণের স্মরণ করিয়ে দেওয়া এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরামর্শ প্রদানে সহায়তা করতে পারে।

স্মার্টফোনভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি নিজের উপসর্গ সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পেতে পারেন এবং জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হলে দ্রুত স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা চিকিৎসকের কাছে যেতে পারেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের প্রযুক্তি গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষভাবে উপকারী হতে পারে, যেখানে চিকিৎসকের সরাসরি উপস্থিতি তুলনামূলক কম।

সিটিজেন কেয়ার বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইকবাল বাহার আহমেদ চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, জনসাধারণের বড় ধরণের স্বাস্থ্য ঝুঁকি এড়াতে ও সুস্থ জীবন-যাপনের সহায়ক হিসেবে ডাক্তার, নার্স ও নিউট্রিশনিস্টের সহায়তায় আমরা সশরীরে বাসায় গিয়ে নিয়মিত হেলথ মনিটরিং করে থাকি। প্রযুক্তি ও চিকিৎসকের সমন্বয়ই ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যসেবার সবচেয়ে কার্যকর মডেল। কারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তথ্য বিশ্লেষণে দ্রুত ও দক্ষ হলেও মানবিক অনুভূতি, অভিজ্ঞতা এবং চিকিৎসাগত বিচক্ষণতার বিকল্প নয়। তাই এআইকে সহায়ক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেই স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন সম্ভব, চিকিৎসকের বিকল্প হিসেবে নয়।

তথ্য নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ

তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, প্রযুক্তিনির্ভর স্বাস্থ্যসেবার বিস্তারের সঙ্গে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিটি (তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি) সেলের পরিচালক অধ্যাপক ড.মোসাদ্দেক হোসেন কামাল চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্য অ্যাপ ও এআইভিত্তিক প্ল্যাটফর্মে রোগীর রোগের ইতিহাস, পরীক্ষার ফলাফল ও ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষিত থাকে। তাই তথ্য ফাঁস বা অপব্যবহার ঠেকাতে শক্তিশালী ডেটা সুরক্ষা ব্যবস্থা, স্পষ্ট গোপনীয়তা নীতিমালা এবং রোগীর সম্মতির ভিত্তিতে তথ্য ব্যবহারের বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি। এতে প্রযুক্তিনির্ভর স্বাস্থ্যসেবার প্রতি মানুষের আস্থা আরও বাড়বে।

গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবায় বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা

জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে যদি এআইভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা কমিউনিটি ক্লিনিক, ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং সরকারি টেলিমেডিসিন ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বিত করা যায়, তাহলে দেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় একটি বড় ধরনের পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে। এর ফলে ঢাকামুখী রোগীর চাপ কমতে পারে, চিকিৎসা ব্যয় সাশ্রয় হতে পারে এবং স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়তে পারে। বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক প্রযুক্তি হয়ে উঠতে পারে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. আহমদ পারভেজ জাবীন বলেন, এআইকে চিকিৎসকের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং একটি ‘ডিজিটাল সহকারী’ হিসেবে দেখা উচিত। বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রান্তিক এলাকায় প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরামর্শ, রোগ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, নিয়মিত স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ এবং রোগীদের সঠিক সময়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা চিকিৎসকের কাছে পৌঁছে দিতে এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবার বৈষম্য কমাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। সঠিক নীতিমালা ও তথ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে এআই প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে এবং রাজধানীকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যসেবার চাপ কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।

Scroll to Top