অসংক্রামক রোগ (এনসিডি) প্রতিরোধে তামাক নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দিয়ে আসন্ন ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে তামাকপণ্যের ওপর কার্যকর করারোপ ও মূল্য বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
আজ বুধবার ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের উদ্যোগে আয়োজিত ‘অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে তামাক কর বৃদ্ধি: ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রেক্ষিত’ শীর্ষক সেমিনারে এ দাবি জানানো হয়।
সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন সংগঠনের মহাসচিব অধ্যাপক ফজিলা-তুন-নেসা মালিক। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল ও রিসার্চ ইন্সটিটিউটের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী।
মূল প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে তামাক ব্যবহারের হার সর্বোচ্চ (৩৫.৩ শতাংশ)। তামাকজনিত রোগে দেশে প্রতিবছর প্রায় ২ লাখ মানুষের অকাল মৃত্যু ঘটে।
২০২৪ সালে তামাক ব্যবহারজনিত স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা, যা থেকে প্রাপ্ত রাজস্বের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।সেমিনারে বক্তারা বলেন, তামাক ব্যবহার নিরুৎসাহিত করার সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হলো কর বৃদ্ধি করে মূল্য বাড়ানো।
তবে বাংলাদেশের বর্তমান বহুস্তরবিশিষ্ট তামাক কর কাঠামো জটিল হওয়ায় এটি তামাক ব্যবহার কমাতে কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা রাখতে পারছে না; বরং তামাকপণ্য সস্তা ও সহজলভ্য রয়ে গেছে।সেমিনারে প্রস্তাব করা হয়, নিম্ন ও মধ্যম স্তরের সিগারেট একত্র করে প্রতি ১০ শলাকার প্যাকেটের খুচরা মূল্য ন্যূনতম ১০০ টাকা নির্ধারণ করা। পাশাপাশি উচ্চ স্তরে ১৫০ টাকা এবং প্রিমিয়াম স্তরে ২০০ টাকা নির্ধারণ এবং সব স্তরে প্যাকেটপ্রতি ৪ টাকা সুনির্দিষ্ট কর আরোপের সুপারিশ করা হয়।
বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. গোলাম মহিউদ্দিন ফারুক বলেন, বিদ্যমান কর কাঠামোর কারণে ব্যবহারকারীরা সহজেই এক স্তর থেকে অন্য স্তরে সরে গিয়ে ধূমপান চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রস্তাবিত সংস্কার বাস্তবায়িত হলে তামাক ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে এবং তরুণদের মধ্যে ধূমপান শুরু করার প্রবণতা হ্রাস পাবে।
জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, তামাকপণ্যে কর বৃদ্ধি জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও টেকসই অর্থায়নের জন্য একটি কার্যকর নীতি। এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে তামাকের ক্ষতি থেকে রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ।
তিনি আরও জানান, প্রস্তাবিত কর সংস্কার বাস্তবায়িত হলে প্রায় ৫ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক ধূমপান ত্যাগে উদ্বুদ্ধ হবে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে প্রায় ১ লক্ষ ৮৫ হাজার ৪০৮ প্রাপ্তবয়স্ক এবং ১ লক্ষ ৮৫ হাজার ৩৩৫ তরুণের অকাল মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে তামাক খাত থেকে প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আয় হতে পারে।
ডক্টরস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) মহাসচিব ডা. মো. জাহিরুল ইসলাম শাকিল বলেন, তামাক ব্যবহারের কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসকষ্ট, ফুসফুসের ক্যান্সারসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের প্রকোপ উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। এসব রোগ প্রতিরোধে তামাক ব্যবহার কমাতে কার্যকর করারোপ অপরিহার্য। তিনি আরও বলেন, এখনই কঠোর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তামাকের মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে।
জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেলের (এনটিসিসি) মহাপরিচালক মো. আখতারউজ-জামান বলেন, বর্তমান সরকার তামাক নিয়ন্ত্রণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তরুণদের নাগালের বাইরে রাখতে তামাকপণ্যের ওপর কার্যকর করারোপের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের তুলনায় তামাকজাত দ্রব্যের মূল্য বেশি থাকে। তিনি জানান, চলতি অর্থবছরে তামাকপণ্যে সুনির্দিষ্ট কর আরোপের বিষয়ে এনটিসিসি কাজ করছে।
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) অধ্যাপক মো. ইউনুছুর রহমানের সভাপতিত্বে সেমিনারে আরও উপস্থিত ছিলেন ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী, বিএমইউ জার্নালের নির্বাহী সম্পাদক অধ্যাপক ডা. এম মোস্তফা জামান, অর্থনীতিবিদ তাইফুর রহমান, বাংলাদেশ লাং ফাউন্ডেশনের যুগ্ম সচিব ডা. কাজী সাইফুদ্দিন বেননুর, বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আকরাম হোসেন।
সেমিনারে বক্তারা জোর দিয়ে বলেন, প্রস্তাবিত তামাক কর কাঠামো বাস্তবায়িত হলে একদিকে যেমন রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে, অন্যদিকে তামাক ব্যবহার কমে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত হবে।






