ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি আবাসিক হলের দুইজন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে সমকামিতার অভিযোগ ওঠায় তাদের সিট বাতিল করেছে প্রশাসন।
বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট বিবিসি বাংলার সূত্রে জানা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির আরো দুটি হলে এরকম দুটি অভিযোগ ওঠেছিল।
একটি ঘটনায় হল ছাত্র সংসদের একজন নেতার হলের সিট সাময়িকভাবে বাতিলও করেছিল প্রশাসন, যদিও অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন তিনি। ব্যবস্থা নেওয়া হলেও এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির শৃঙ্খলাবিধিতে সমকামিতা সংক্রান্ত বিষয়ে সুনির্দিষ্ট করে কিছু বলা নেই বলে এরইমধ্যে জানিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
বাংলাদেশের আইনে ‘সমকামিতা’ নিয়ে আইনে কী আছে
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, বাংলাদেশের আইনে ‘সমকামিতা’কে সংজ্ঞায়িত করা হয়নি। তবে, বাংলাদেশে ব্রিটিশ আমলের প্রচলিত আইনে দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারায় ‘প্রকৃতির নিয়মের বিরুদ্ধে গিয়ে’ করা যৌন মিলনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন আইনজীবী কাজী জাহেদ ইকবাল।
দণ্ডবিধির এই ধারায় অনাকাক্ষিত বা প্রকৃতির নিয়মবিরুদ্ধ অপরাধের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি স্বেচ্ছায় কোনো পুরুষ, নারী বা পশুর সঙ্গে প্রকৃতির নিয়মের বিরুদ্ধে গিয়ে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেন, তবে তিনি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে, অথবা সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত যে কোনো মেয়াদের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। একইসঙ্গে, ওই ব্যক্তি অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হতে পারেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি বলেন, দ্য পেনাল কোড, ১৮৬০, আইনে ৩৭৭ এ ‘আন-ন্যাচারাল অফেন্সেস’ এর বিষয়ে বলা আছে। এখানে সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের কথাও বলা হয়েছে। এই ধারার ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, এই অপরাধটি সংগঠিত হওয়ার জন্য শারীরিক মিলনের ক্ষেত্রে পেনিট্রেশন বা অনুপ্রবেশই যথেষ্ট হিসেবে গণ্য হবে।
বিষয়টি ব্যাখ্যা করে সুপ্রিম কোর্টের এই আইনজীবী বলেন, ফ্যাক্টের ওপরে আদালত বিচার করবে শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হবে নাকি ১০ বছর হবে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে আইনিভাবে শারীরিক সম্পর্কের এই ধারণাটিকে স্বীকৃতি বা অস্বীকৃতি কোনোটিই দেওয়া হয়নি। আলটিমেটলি আইনের জায়গায়, এক্সাক্টলি বাংলাদেশের কোনো আইনেই সমকামিতাকে স্বীকৃতি, অস্বীকৃতি বা কাভার করা হয়নি। সেই কারণে ভুল ধারাগুলোতে বিচারগুলো করা হয়। মূলত, সমকামিতার বিষয়ে আমাদের এখানে কোনো আইন নাই। এটার সংজ্ঞাও দেওয়া হয় নাই। এই টার্মটাই নাই। আমাদের এখানে আছে ‘আন-ন্যাচারাল’ এই বিষয়টা। সমকামিতার বিষয়ে কোনো মামলা বা শাস্তির ঘটনা বাংলাদেশে রয়েছে কি না – এমন প্রশ্নে তিনি জানান, তার জানা মতে এমন কোনো মামলা হয়নি।
আইনজীবী কাজী জাহেদ ইকবাল বলেন, তবে ৩৭৭ এ খুঁজলে হয়তো দু-একটা মামলা পাওয়া যেতে পারে। তবে তার বেশিরভাগই বলাৎকার বিষয়ক। কনসেন্টিং পানিশমেন্টের খবর আমার জানা মতে হয় নাই। তিনি জানান, আগে বেশিরভাগ বলাৎকারের মামলাই এই ৩৭৭ ধারায় দায়ের করা হতো। যদিও বলাৎকারের কোনো সংজ্ঞা ছিল না। তবে পরবর্তীতে দেশের আইনে বলাৎকারকে সংজ্ঞায়িত করে নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের আওতায় আনা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি জানান, দেশের আইনে সমকামিতা না থাকার কারণেই এমন অভিযোগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাউকে গ্রেফতার করলেও অন্য ধারার প্রয়োগ করে থাকে। কখনো কখনো কাউকে পুলিশ ধরলেও অশ্লীলতার কোনো আইনে জরিমানা বা কোর্টে চালান দিয়ে ওই ধরনের ধারায় দিয়ে দেয়। মেট্রোপলিটনের বাইরে হলে ২৯০ এ রকম একটি ধারায় হয়তো ওদের শাস্তি দুই-এক মাস জেল বা অনেক সময় ১০০ বা ২০০ টাকা জরিমানা করে, বলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী কাজী জাহেদ ইকবাল।
এশিয়ার কোন কোন দেশে কী অবস্থা?
ব্রিটিশ আমলের আইনে প্রকৃতির নিয়মবিরুদ্ধ যে অপরাধের কথা বলা হয়েছে, সেটি কেবল বাংলাদেশেই নয়, এশিয়ার আরো কয়েকটি দেশেও রয়েছে। এর মধ্যে, পাকিস্তান, মিয়ানমার, মালয়েশিয়া, ব্রুনাই, শ্রীলঙ্কায় ব্রিটিশ আমলের এই দণ্ডবিধিই প্রযোজ্য। এসব দেশগুলো সমকামিতাকে পৃথক করে সংজ্ঞায়িত করেনি এবং ৩৭৭ ধারা এখনো অনুসরণ করে থাকে।
২০২১ সালের ২৯শে জুন, বিবিসিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের ৬৯টি দেশে সমকামিতা অবৈধ। তবে, বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ব্রিটিশ আমলের দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা বাতিল করেছে। ২০১৮ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের এক রায়ের মাধ্যমে ঔপনিবেশিক আমলের ৩৭৭ ধারা বাতিল করে সমকামিতাকে বৈধ করে। তবে, সমলিঙ্গের বিয়ে ভারতে বৈধ নয়। এছাড়া, তাইওয়ান ও থাইল্যান্ডেও সমলিঙ্গের বিয়ের বৈধতা দেওয়া হয়েছে।
নেপালেও সমকামিতাকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে। এই দেশটিই এশিয়ার প্রথম দেশ যারা ‘গে’ বিয়েকে বৈধতা দিয়েছিল।


