সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে এতোদিনে বাংলাদেশ-ভারত সিরিজের তোড়জোড় শুরু হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। ক্রিকেট মাঠে দুই দেশের সাম্প্রতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লড়াই এবং রাজনৈতিক জলঘোলার পর বাংলাদেশ-ভারত সিরিজ এখন আলাদা আগ্রহের জন্ম দেয়। আগ্রহের সেই সিরিজের তোড়জোড় এতোদিনে শুরু হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। ২০২৫ সালে স্থগিত হওয়া তিন ম্যাচের ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি সিরিজ খেলতে চলতি মাসেই বাংলাদেশ সফরে আসার কথা ছিল ভারতীয় ক্রিকেট দলের। তবে রোহিত শর্মা, বিরাট কোহলিদের যে চলতি মাসে ঢাকা আসা হচ্ছে না তা এখন দিনের আলোর মতো পরিস্কার।
ক্রিকেটীয় কারণের চেয়ে এখানে রাজনৈতিক কারণই বড়। গণঅভ্যাত্থানে বাংলাদেশে সরকার পতন অর্থাৎ শেখ হাসিনার সরকার পতন হওয়ার পর থেকেই ভারত-বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়। তারপর নিরাপত্তার কারণে বাংলাদেশ দল ভারতে অনুষ্ঠিত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে নাম প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর ক্রিকেটীয় সম্পর্কে তিক্ততা বেড়েছে। তামিম ইকবাল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সভাপতি হওয়ার পর থেকে ভারতের সঙ্গে ক্রিকেটীয় সম্পর্ক উন্নয়নে অবশ্য কাজ করে যাচ্ছেন। তবে সেটা দুই দেশের মধ্যে পূর্বনির্ধারিত সিরিজটা ঠিক সময়ে মাঠে গড়ানোর মতো পরিস্থিতি তৈরি করতে পারেনি। তামিম ইকবাল জানিয়েছেন, সেপ্টেম্বরে সিরিজটি হচ্ছে না; সিরিজ আয়োজনে দুই বোর্ড এখন নতুন সময় খুঁজছে।
ভারতীয় দলের বাংলাদেশ সফরটি আইসিসির ফিউচার ট্যুরস প্রোগ্রাম (এফটিপি) অনুযায়ী ২০২৫ সালের আগস্টে নির্ধারিত ছিল। ১৩ আগস্ট বাংলাদেশে এসে ১৭ আগস্ট থেকে ৩১ আগস্টের মধ্যে তিনটি ওয়ানডে ও তিনটি টি-টোয়েন্টি খেলার কথা ছিল ভারতীয় দলের। ঢাকার পাশাপাশি চট্টগ্রামেও ম্যাচ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ততদিনে দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের অবনতি ঘটে।
পরে দুই দেশের ক্রিকেট বোর্ড যৌথভাবে সফরটি স্থগিত করে। তখন অবশ্য প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কারণকে সামনে না এনে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ব্যস্ততা ও দুই দলের সূচির সুবিধার কথা বলা হয়েছিল। বিসিসিআইয়ের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বলা হয়, দুই বোর্ডের আলোচনার পর আগস্ট ২০২৫-এর সিরিজটি সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। নতুন সূচি পরে ঘোষণা করার কথা জানানো হয়েছিল।
কিন্তু ক্রিকেটীয় সূচির আড়ালে রাজনৈতিক বাস্তবতাই যে বড় ভূমিকা রেখেছিল, পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে সেটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর তিনি ভারতে চলে যান। এরপর ঢাকা ও নয়াদিল্লির সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়। সেই রাজনৈতিক অস্বস্তির প্রভাব ক্রিকেটীয় সম্পর্কেও পড়ে। সেই প্রভাবেই যে বাংলাদেশ-ভারত সিরিজ স্থগিত সেটা উঠে এসেছে নানান প্রতিবেদনে।
২০২৬-এ নতুন আশা, তারপর হতাশা
২০২৬ সালের শুরুতে অবশ্য পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার আভাস মিলেছিল। বিসিবি তাদের ঘরের মাঠের আন্তর্জাতিক সূচিতে সেপ্টেম্বরে ভারতকে আতিথ্য দেওয়ার পরিকল্পনা করে। ছয় ম্যাচের সিরিজের জন্য সেপ্টেম্বরের শুরুর ভাগে সময়ও নির্ধারিত ছিল বলে পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত সূচিতে দেখা যায়।
বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল নিজের বেশ কিছু বক্তব্যে সিরিজটি নিয়ে আশাবাদ দেখিয়েছিলেন। কিন্তু আগস্ট যত গড়িয়েছে, ততই সেই সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়েছে। একদিকে দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েন পুরোপুরি কাটেনি, অন্যদিকে ভারতের আন্তর্জাতিক সূচিও জটিল হয়ে উঠেছে। আগস্টে আফগানিস্তানের বিপক্ষে তিন ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজ খেলার ঘোষণা দেয় ভারত। পরে ঘরের মাঠে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষেও সিরিজ রয়েছে ভারতের। যাতে সেপ্টেম্বরে ভারত যে বাংলাদেশ সফরে আসছে না সেটা অনেক আগেই নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল, বাকি ছিল কেবল আনুষ্ঠানিক ঘোষণার।
গত ৩১ আগস্ট এসে বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল বিষয়টি পরিষ্কার করেন, সেপ্টেম্বরের নির্ধারিত সময়ে তিন ওয়ানডে ও তিন টি-টোয়েন্টির সিরিজ আর হচ্ছে না। তবে এটিকে বাতিল না বলে নতুন সময়ের সন্ধান করছে দুই বোর্ড। তামিম জানিয়েছেন, বিসিবি ও বিসিসিআই নিয়মিত যোগাযোগ করছে এবং নতুন সময় নির্ধারণের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে।
বাংলাদেশ বিশ্বকাপ থেকে সড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল
এদিকে শুধু দুই দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটই নয়, ২০২৬ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ নিয়েও বাংলাদেশ-ভারত বোর্ডের মধ্যে বড় ধরনের অস্বস্তি তৈরি হয়। ভারত ও শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত সেই বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিয়ে বাংলাদেশ আপত্তি তোলে এবং শেষ পর্যন্ত টুর্নামেন্টে অংশ নেয়নি। এর আগে আইপিএলে কলকাতা নাইট রাইডার্সের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ থাকা বাংলাদেশের পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে বিসিসিআইয়ের সিদ্ধান্তে দল থেকে সরিয়ে দেওয়া নিয়ে বাংলাদেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। এসব ঘটনা দুই দেশের ক্রিকেট সম্পর্ককে আরও খারাপের দিকে নিয়ে যায়।
জানুয়ারিতে কি সিরিজ হবে?
২০২৬-২৭ মৌসুমের শুরুর দিক, বিশেষ করে ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে সিরিজটি আয়োজনের বিষয়ে সম্প্রতি কথা বলা হচ্ছে। ক্রিকেটভিত্তিক ওয়েবসাইট ক্রিকবাজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই বোর্ডের আলোচনায় নতুন উইন্ডো খোঁজা হচ্ছে এবং জানুয়ারি মাসকে সিরিজ আয়োজনের সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে ভাবা হচ্ছে। তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত সূচি ঘোষণা হয়নি। অনিশ্চয়তা কাটিয়ে জানুয়ারিতে কি মাঠে গড়াবে প্রতিক্ষিতি সিরিজটি?
ছয় ম্যাচের এই সিরিজটি এখন শুধু একটি দ্বিপক্ষীয় ক্রিকেট সিরিজ নয়; দুই প্রতিবেশী দেশের ক্রিকেট সম্পর্ক কতটা দ্রুত স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে পারে, তারও একটি পরীক্ষা। আপাতত বল দুই বোর্ডের কোর্টে—রাজনীতি ও সূচির জট খুলে কবে মাঠে গড়াবে বাংলাদেশ-ভারত ক্রিকেটের বহুল প্রতীক্ষিত লড়াই, সেটিই এখন দেখার।
