বাংলার নৃত্যাঙ্গনে নজরুলসঙ্গীতের প্রভাব ও প্রাসঙ্গিকতা – Sarabangla

বাংলা সাহিত্য ও সঙ্গীত আকাশের দুরন্ত ধুমকেতু কাজী নজরুল ইসলাম। তার সৃষ্টিতে যে প্রাণপ্রাচুর্য, সুরের বহুমাত্রিকতা এবং তালের বৈচিত্র্য রয়েছে, তা বাংলা নৃত্যাঙ্গনকে দিয়েছে এক অনন্য গতি ও মাত্রা। নজরুল কেবল দ্রোহের কবি বা প্রেমের গায়ক নন; তিনি সুরের এমন এক ভাস্কর যার প্রতিটি সুরতরঙ্গে লুকিয়ে রয়েছে দৈহিক অভিব্যক্তির ব্যাকরণ। বাংলা নাচের শৈল্পিকতায় নজরুলের গান আজ কেবল আনুষঙ্গিক সুর নয়, বরং নাচের আত্মার সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যাওয়া এক প্রেরণা।

সুর ও তালের দৈহিক অভিব্যক্তি

নজরুলসঙ্গীতের গতিশীলতা ও বৈচিত্র্যময় তালই একে নৃত্যশিল্পীদের জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয় করে তুলেছে। তার রচিত ধ্রুপদী রাগভিত্তিক গান, লোকজ সুরের মূর্ছনা, কিংবা গাজল ও বাউলের ভাবধারা, প্রতিটি ধারাই নৃত্যের আলাদা মুদ্রা ও ভাব প্রকাশে অনন্য ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে তার তবলার দাদরা, কাহারবা, কিংবা তিওড়া ও রূপক তালের বৈচিত্র্য নাচের পায়ে এনে দেয় এক প্রদেয় স্পন্দন। বীররসের উদ্দীপনা থেকে শুরু করে শৃঙ্গার রসের মাধুর্য, নজরুলের সুরে যা প্রকাশিত হয়, তা শারীরিক ভাষায় রূপ দেওয়ার জন্য এক অপূর্ব সৃজনভূমি তৈরি করে।

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক ও কবি শেখ রেজাউদ্দিন আহমেদ স্টালিন-এর ভাষায়, ‘নজরুলের কবিতা ও গানে সৃষ্টির বহুমাত্রিকতাই তাকে আমাদের সাংস্কৃতিক জীবনে চিরপ্রাসঙ্গিক করে রেখেছে। নজরুলের সৃষ্টির একটি বড় শক্তি হলো এর ছন্দ ও গতি। তার গান ও কবিতার অন্তর্নিহিত ছন্দ যেন নৃত্যের জন্য স্বাভাবিকভাবেই একটি সৃজনভূমি তৈরি করে। সেই ছন্দ, সেই আবেগ এবং সেই চেতনাকে শরীরী ভাষায় প্রকাশ করেছেন আমাদের নৃত্যশিল্পীরা। ফলে মঞ্চে আমরা শুধু নৃত্য দেখিনি; আমরা অনুভব করেছি নজরুলের চিন্তা, তার স্বপ্ন এবং তার মানবিক দর্শনের এক নান্দনিক প্রকাশ।’

শাস্ত্রীয় ও লোকজ নাচে নজরুলের রাগাশ্রিত গান

বাঙালি সংস্কৃতিতে নৃত্যের মূলধারাকে সমৃদ্ধ করতে নজরুলসঙ্গীতের অবদান অসামান্য। নজরুলের গানে একদিকে যেমন রয়েছে ‘মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী, আর হাতে রণতূর্য’ । যেখানে ধ্রুপদী বা কথক নাচের গতি ও তালব্যাপ্তির মাধ্যমে দ্রোহ ও তেজ ফুটিয়ে তোলা যায়, অন্যদিকে তেমনি রয়েছে ‘রুমঝুম ঝুম ঝুম’ যেখানে মণিপুরী বা ভরতনাট্যমের সুকোমল মুদ্রা ও প্রেমাবেগ মূর্ত হয়ে ওঠে।

নজরুল যে মানবিক সমাজ ও বৈষম্যহীন পৃথিবীর স্বপ্ন দেখেছিলেন, শরীরী ভাষায় সেই স্বপ্নকে রূপ দেওয়া নাচিয়েদের জন্য এক পরম দায়িত্ব। একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী ও নৃত্য গবেষক আমানুল হক’এর ভাষায় – ‘নজরুলের মানবতা ও দ্রোহের জায়গাগুলোকে নাচের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য। তার গানের ছন্দে যে প্রতিবাদের কম্পন রয়েছে, নৃত্যশিল্পীরা যখন তাদের মুদ্রা ও অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে তা মঞ্চে উপস্থাপন করেন, তখন সেই দ্রোহের চেতনা দর্শকরূপী সমাজকে নতুন করে জাগ্রত ও অনুপ্রাণিত করে।’

বর্ষার প্রেম, বিরহ ও প্রকৃতির নৃত্য রূপকল্প

কাজী নজরুলের প্রকৃতিপর্যায়ের গানগুলোর মধ্যে বর্ষার গানগুলো নৃত্য পরিবেশনার জন্য অত্যন্ত সমৃদ্ধ উপাদান প্রদান করে। বর্ষার মেঘের ঘনঘটা, বিদ্যুতের চমক এবং বৃষ্টির রিমঝিম শব্দমালা নর্তকের পায়ে সৃষ্টি করে নতুন ছন্দের হিল্লোল।

নজরুল ক্যানভাসে বর্ষার গানগুলোর গভীরতা নিয়ে বিশিষ্ট নজরুল গবেষক ড. হাফিজ রহমান তার বিশ্লেষণে উপস্থাপন করেছেন- ‘কাজী নজরুল ইসলামের বর্ষার গানগুলোতে প্রেমের ব্যাপ্তি সুবিস্তৃত ও সমন্বিত শিল্পের রূপ। কবির কাছে বর্ষা প্রেম, বিরহ, আকাঙ্ক্ষা, সৌন্দর্য, আবেগ ও মিলনের প্রতীক। প্রকৃতির রূপের সঙ্গে মানবমনের অনুভূতিকে মিলিয়ে তিনি বর্ষাকে এক অনন্য রোমান্টিক আবহে উপস্থাপন করেছেন। প্রকৃতি ও প্রেমের মেলবন্ধন, নজরুল গানের অতিসাধারণ ও পরিচিত একটি রূপ। নজরুল কাব্যসংগীতে আষাঢ়-শ্রাবণের মেঘ, বৃষ্টি, বিদ্যুৎ, কদমফুল, নদী ও বাতাস, প্রেমিক-প্রেমিকার অনুভূতির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। তার গানে প্রকৃতি যেন মানুষের মতো করে মানুষের হৃদয়ের ভাষায় কথা বলে। অন্যপক্ষে বিরহ ও অপেক্ষার আবেগ, বর্ষার দিনে প্রিয়জনের অনুপস্থিতি, তার গানে গভীর বেদনার সৃষ্টি করে। বৃষ্টিধারা বিরহের অশ্রুর প্রতীক হয়ে ওঠে, আর মেঘলা আকাশ প্রতীক্ষার দীর্ঘশ্বাস বহন করে।’

এই বিরহ ও প্রেমের অনুভূতি যখন নজরুলের বর্ষার গানে সুর হয়ে ঝরে পড়ে, তখন নৃত্যশিল্পী তার নয়নের ভাষা ও দেহাভিনয়ের মাধ্যমে বৃষ্টির ফোঁটা ও মেঘের প্রবাহকে মঞ্চে সজীব করে তোলেন। ‘মেঘমেদুর বরষায়’ বা ‘শাওন রাতে যদি’র মতো গানগুলোতে বর্ষার সেই বেদনাময় সৌন্দর্য শারীরিক বাচনভঙ্গিতে এক কাব্যিক মাত্রা পায়।

তরুণ প্রজন্ম ও সাংস্কৃতিক পুনরুজ্জীবন

নজরুলকে শুধু স্মরণের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না রেখে, নতুন প্রজন্মের কাছে তার কালজয়ী চেতনাকে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে শিল্পকলা ও নাচের মাধ্যমটি অত্যন্ত শক্তিশালী। ভাষা যেখানে কখনো সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, নাচের মুদ্রা ও শারীরিক অভিব্যক্তি সেখানে কোনো সীমান্ত না মেনে হৃদয়ে পৌঁছে যায় অনায়াসে।

শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক তরুণ প্রজন্মের ক্ষেত্রে নজরুলের গানে নাচের গুরুত্ব তুলে ধরে আরো বলেন, ‘তরুণ প্রজন্মের কাছে নজরুলকে নতুনভাবে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে নৃত্য একটি অত্যন্ত শক্তিশালী মাধ্যম। কারণ শিল্পের ভাষা অনেক সময় এমন হৃদয়ের দরজা খুলে দেয়, যেখানে কেবল বক্তব্য পৌঁছাতে পারে না।’

একই সুর ধ্বনিত হয় সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ইয়াসমিন বেগমের কণ্ঠেও। তিনি নজরুলচেতনার পুনরুজ্জীবন নিয়ে বলেন,

‘নজরুল সবসময় অসহায় নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং আমাদের সমগ্র সমাজকে পুনরুজ্জীবীত করেছেন। নৃত্য, গান, নাটক শিল্পের প্রতিটি ক্ষেত্রে নানা মাধ্যমে আমরা তাকে এভাবেই স্মরণ করতে চাই।’

নৃত্যে, ছন্দে ও গানে নজরুল অনন্য ও প্রাসঙ্গিক

কাজী নজরুল ইসলামের গান বাংলা নৃত্যশিল্পকে দিয়েছে এক বিস্তৃত আকাশ ও নতুন দিগন্ত। নজরুলের সুরের ঝর্ণাধারা, ভাবের গভীরতা আর নাচের ছন্দ যখন একীভূত হয়, তখন মঞ্চে কেবল কোনো পরিবেশনা তৈরি হয় না, বরং জন্ম নেয় এক কাব্যিক ও দর্শনগত নান্দনিকতা। সুরের আবেশে শরীরী ভাষার এই চিরন্তন কথকতা বাংলা সংস্কৃতিকে যুগ যুগ ধরে রিদ্ধ করে চলেছে এবং অনাগত দিনগুলোতেও তরুণ নৃত্যশিল্পীদের নতুন নতুন সৃষ্টির প্রেরণা জুগিয়ে যাবে।

Scroll to Top