
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের দ্রুত উন্নয়ন ভবিষ্যতে মানবতার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে এমন সতর্কবার্তা সাম্প্রতিক সময়ে জোরালো হয়েছে। এ কারণে প্রযুক্তিটির উন্নয়ন ধীর করা এবং আন্তর্জাতিকভাবে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি উঠছে।
শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বিবিসি বাংলা এই তথ্য জানায়।
বর্তমান ও সাবেক কয়েকজন এআই গবেষক আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, ভবিষ্যতে এআই মানুষের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠতে পারে। এমনকি এক গবেষক বলেছেন, আগামী এক দশকের মধ্যে এআইয়ের কারণে সব মানুষ মারা যাওয়ার সম্ভাবনা ১০ শতাংশের বেশি হতে পারে।
অন্যদিকে ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকের মতো বড় এআই প্রতিষ্ঠানগুলোও এআই নিয়ন্ত্রণে আইন করার আহ্বান জানিয়েছে। মাইক্রোসফটের এআই বিভাগের প্রধানও সম্প্রতি সতর্ক করে বলেছেন, ভবিষ্যতে একটি ‘সিলিকন প্রজাতি’ মানবজাতির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামতে পারে।
তবে সমালোচকদের কেউ কেউ মনে করেন, বড় এআই কোম্পানিগুলো নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের সীমিত করতে এসব সতর্কবার্তা ব্যবহার করছে।
তারপরও বিষয়টি নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন হলো এআই আসলে কীভাবে মানবতার জন্য হুমকি হতে পারে এবং এই আশঙ্কা কতটা বাস্তব?
কেন এআইকে হুমকি মনে করছেন কেউ কেউ?
কিছু এআই গবেষকের মতে, এআই সিস্টেমগুলোর ক্ষমতা ও কার্যক্ষমতা উদ্বেগজনক গতিতে বাড়ছে।
এভান হুবিঙ্গার নামে একজন গবেষক সম্প্রতি বলেন, আগামী ১০ বছরের মধ্যে এআইয়ের কারণে সব মানুষ মারা যাওয়ার সম্ভাবনা ১০ শতাংশের বেশি।
তিনি এআই ‘অ্যালাইনমেন্ট’ নিয়ে কাজ করেন। এই গবেষণার লক্ষ্য হলো মানুষের নৈতিক মূল্যবোধ ও নীতিকে এআইয়ের মধ্যে যুক্ত করা, যাতে প্রযুক্তিটি মানুষের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কাজ করে।
তবে হুবিঙ্গার বলেছেন, বর্তমানে ব্যবহৃত এআই সিস্টেম থেকে ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম।
এর মধ্যেই অ্যানথ্রপিকের আরেক গবেষক জ্যাকব কক্সন প্রতিষ্ঠানটি ছেড়ে সতর্ক করেন, এআইয়ের উন্নয়নের গতি নিয়ে তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা সত্যিই ভীত।
বিবিসিকে তিনি বলেন, এআইয়ের দ্রুত অগ্রগতি এবং এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে তারা ‘সত্যিই আতঙ্কিত’ ছিলেন।
এ ধরনের আশঙ্কা অবশ্য নতুন নয়। কয়েক দশক ধরেই মানুষের সমান বা তার চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান যন্ত্র তৈরি হলে কী ঘটতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা চলছে।
১৯৫০-এর দশকেই ব্রিটিশ গণিতবিদ ও কম্পিউটার বিজ্ঞানী অ্যালান টুরিং লিখেছিলেন, বুদ্ধিমান যন্ত্র তৈরি করা সম্ভব হলে একপর্যায়ে সেগুলো মানুষের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো আরও শক্তিশালী এআই তৈরি করতে প্রতিযোগিতায় নেমেছে। তাদের একটি লক্ষ্য হলো ‘সুপারইন্টেলিজেন্স’ তৈরি করা—অর্থাৎ এমন তাত্ত্বিক এআই, যা মানুষের চেয়েও বেশি বুদ্ধিমান হবে।
বর্তমানে মানুষ যে এআই ব্যবহার করে ই-মেইল লেখা বা ভিডিও তৈরি করে, সুপারইন্টেলিজেন্ট এআই তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল কাজ করতে পারবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিক বলছে, তারা এমন প্রযুক্তি তৈরি করতে চায় যা মানুষের উপকার করবে এবং সম্ভাব্য বড় ঝুঁকি থেকে মানুষকে সুরক্ষিত রাখবে।
তবে সমালোচকদের কেউ কেউ মনে করেন, মেশিন কখনোই মানুষের প্রকৃত বুদ্ধিমত্তার সমকক্ষ হতে পারবে না। তাদের অভিযোগ, এআই কোম্পানিগুলো নিজেদের গুরুত্ব ও ব্যবসা বাড়াতে প্রযুক্তির সক্ষমতাকে অতিরঞ্জিত করছে।

কীভাবে এআই মানবতার জন্য হুমকি হতে পারে?
এআই নিয়ে উদ্বিগ্ন গবেষক, বিশেষজ্ঞ ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা কয়েকটি সম্ভাব্য পরিস্থিতির কথা বলেছেন।
অ্যানথ্রপিকের প্রধান দারিও আমোদেই সেপ্টেম্বরে লিখেছেন, এআই প্রত্যাশার তুলনায় ‘অনেক দ্রুত’ উন্নতি করেছে। এর মধ্যে নিজেই পরবর্তী প্রজন্মের এআই তৈরির সক্ষমতাও রয়েছে।
এখান থেকেই একটি বড় আশঙ্কা তৈরি হয়েছে এআই একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে পৌঁছানোর পর যদি মানুষের সরাসরি সহায়তা ছাড়াই নিজেকে আরও উন্নত করতে শুরু করে, তাহলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হতে পারে।
সম্প্রতি এমন একটি ঘটনাও ঘটেছে, যেখানে এআই টুলকে নির্দেশ না দেওয়া হলেও সেটি নিজে থেকে কয়েকটি ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে হ্যাক করার চেষ্টা করে। এ ঘটনায় এআই এজেন্টের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
‘এআই এজেন্ট’ হলো এমন ধরনের এআই টুল, যেগুলোকে নির্দিষ্ট কাজ বা পদক্ষেপ নিজেরাই সম্পন্ন করার ক্ষমতা দেওয়া হয়।
গবেষকদের আশঙ্কা, অত্যন্ত শক্তিশালী এআই ভবিষ্যতে গুপ্তচরবৃত্তি, সাইবার হামলা বা জৈবিক অস্ত্র তৈরিতে সহায়তা করতে পারে। এমনকি ভুলভাবে কাজ করেও অর্থনীতি বা গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থায় বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
তবে এসব আশঙ্কার বেশিরভাগই এখনো সম্ভাব্য ও তাত্ত্বিক পরিস্থিতি। কেউ কেউ এগুলোকে অতিরঞ্জিত বলেও মনে করেন।
কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, ভবিষ্যতে মানবজাতি ধ্বংসের মতো সম্ভাব্য ঝুঁকির দিকে অতিরিক্ত মনোযোগ না দিয়ে বর্তমানে এআইয়ের কারণে যে সমস্যাগুলো তৈরি হচ্ছে, সেগুলোর দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন।
এর মধ্যে রয়েছে এআই দিয়ে নারীদের অনুমতি ছাড়া ভুয়া নগ্ন ছবি বা ‘ডিপফেক’ তৈরি, মানুষকে ভুল তথ্য দেওয়া এবং অনলাইন প্রতারণা বাড়ানো।
বিভিন্ন দলের এমপি ও আইনপ্রণেতাদের একটি জোটও এআইয়ের কারণে মানবাধিকারের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে এসব ঝুঁকির মাত্রা ও গুরুত্ব বিবেচনায় নতুন আইন করার দাবি জানানো হয়েছে।
এআই উন্নয়ন ধীর করার প্রস্তাব কী?
অ্যানথ্রপিকের প্রধান দারিও আমোদেই এবং ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান—দুজনই এআই নিয়ন্ত্রণে আইন এবং প্রযুক্তিটির উন্নয়ন কিছুটা ধীর করার পক্ষে কথা বলেছেন।
স্পেসএক্সের প্রধান ইলন মাস্কসহ প্রযুক্তি খাতের আরও অনেকে এমন পদক্ষেপের পক্ষে মত দিয়েছেন।
তবে ‘ধীর করা’ বলতে আসলে কী বোঝানো হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
আমোদেই বলেছেন, এর অর্থ এআই মডেল তৈরি বা প্রযুক্তিগত অগ্রগতি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া নয়। বরং কোম্পানিগুলোকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত সময় দিতে হবে এবং তৃতীয় পক্ষের মূল্যায়নকারীদের দিয়ে এআই পরীক্ষা করাতে হবে।
অল্টম্যানও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, এআই উন্নয়নের গতি নিয়ন্ত্রণ করা দরকার। তবে এর অর্থ উন্নয়ন বন্ধ করে দেওয়া নয়।
তিনি বলেন, এআইয়ের অগ্রগতি দ্রুত হয়েছে এবং তা অব্যাহত থাকবে। তবে নিরাপত্তা যাচাই ও পর্যবেক্ষণের মতো ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে উন্নয়নের গতি কিছুটা কমানো প্রয়োজন হতে পারে।
অল্টম্যান আরও বলেছেন, এআই কোম্পানিগুলো সরকারের পদক্ষেপের জন্য অপেক্ষা করছে না এবং ভবিষ্যতেও করবে না।

এআই নিয়ে ট্রাম্পের অবস্থান কী?
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগে এআইয়ের সম্ভাব্য সুবিধার প্রশংসা করেছেন এবং এআই উন্নয়নে মার্কিন কোম্পানিগুলোর নেতৃত্ব দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
তাঁর প্রশাসন এআইয়ের ‘কৌশলগত গুরুত্ব’ স্বীকার করে এর উন্নয়ন দ্রুত করার জন্য নির্বাহী আদেশও জারি করেছে।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে মার্কিন প্রশাসনের ক্রিপ্টো বিভাগের প্রধান ডেভিড স্যাকস সাংবাদিকদের বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র এআই প্রতিযোগিতায় রয়েছে এবং তারা চায় যুক্তরাষ্ট্র এই প্রতিযোগিতায় জয়ী হোক।
তবে সম্প্রতি এআইয়ের সম্ভাব্য বিপদ নিয়ে সতর্কবার্তা বাড়ার পর ট্রাম্প এসব ঝুঁকি কম গুরুত্ব দিয়েছেন।
আয়ারল্যান্ড সফরের সময় তিনি বলেন, এআই নিয়ে এমন অনেক নেতিবাচক দাবি করা হচ্ছে, যেগুলো বাস্তবে ঘটবে না।
এআই উন্নয়ন ধীর করার প্রস্তাব নিয়ে সরাসরি মন্তব্য না করলেও ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এআইয়ে চীনের চেয়ে এগিয়ে আছে এবং তিনি সেই অবস্থান ধরে রাখতে চান। তাঁর ভাষায়, যে দেশ এআইয়ে জয়ী হবে, তারাই জয়ী হবে।
পরে ট্রুথ সোশ্যালে এআই নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগকে তিনি ‘ভাঁওতা’ বলেও উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, এআইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় একমাত্র ‘নিরাপত্তা বেষ্টনী’ হলো একজন শক্তিশালী ও বুদ্ধিমান প্রেসিডেন্ট।
চীন কী বলছে?
যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন এআই কোম্পানির গবেষকদের কঠোর সতর্কবার্তার বিষয়ে চীন শুরুতে খুব বেশি মন্তব্য করেনি।
তবে মার্কিন প্রযুক্তি ও চিপ ব্যবহারে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার মধ্যেও চীন নিজস্ব এআই প্রযুক্তি উন্নয়নে জোর দিয়েছে। একই সঙ্গে দেশটি এআইয়ের জন্য আরও শক্তিশালী আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণ ও বৈশ্বিক ব্যবস্থাপনার আহ্বান জানিয়েছে।
চীনের বিভিন্ন গবেষণাগার থেকে শক্তিশালী ওপেন-সোর্স এআই সিস্টেম ও টুল বাজারে আসার পর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পশ্চিমা বাজার ও এআই নির্মাতাদের মধ্যেও তা প্রভাব ফেলেছে।
এআই উন্নয়নের গতি কমানোর পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে আমোদেই সতর্ক করেছিলেন, এআইয়ে চীনের অগ্রগতি ও দক্ষতা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এর জবাবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আমোদেইয়ের বক্তব্যের সমালোচনা করে। তারা এসব বক্তব্যকে হুমকি, সংঘাত ও বিদ্বেষমূলক প্রতিযোগিতার ধারণা ছড়ানোর প্রচেষ্টা হিসেবে উল্লেখ করে এবং বলে, এতে কারও স্বার্থ রক্ষা হবে না।
সব মিলিয়ে, এআই মানবতার জন্য বড় ধরনের ভবিষ্যৎ ঝুঁকি তৈরি করবে কি না—এ নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে এখনো মতভেদ রয়েছে। তবে এআইয়ের দ্রুত উন্নয়ন, স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করতে সক্ষম এজেন্ট এবং বর্তমানের অপব্যবহারের ঘটনাগুলো প্রযুক্তিটির নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা আরও জোরালো করেছে।
প্রতিবেদক
সাদিয়া শারমিন
নিউজরুম এডিটর
আরও পড়ুন
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…





