
বুয়েনস আইরেস, ০৭ অক্টোবর – বিশ্ব ফুটবলের ক্যানভাসে মহাকাব্যিক এক যুগের অবসান ঘটল। দীর্ঘ ২১ বছরের আর্ন্তজাতিক পথচলার পর আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় জানালেন সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার লিওনেল আন্দ্রেস মেসি। বুয়েনস আইরেসের ঐতিহাসিক এস্তাদিও মনুমেন্তালে বিদায়ী ম্যাচে নীল-সাদা জার্সি গায়ে শেষবার মাঠে নেমে লাখো ভক্তের ভালোবাসায় সিক্ত হলেন এই ফুটবল জাদুকর।
আর্জেন্টিনা ৩-০ গোলের দাপুটে জয়ে বেনিনের বিরুদ্ধে অধিনায়কের এই ঐতিহাসিক বিদায়কে স্মরণীয় করে রাখে। যদিও মেসি ম্যাচে সরাসরি কোনো গোল পাননি, তবে আর্জেন্টিনার ৩টি গোলেই ছিল ‘এলএমটেন’-এর সরাসরি স্পর্শ—পেনাল্টি আদায় করা ছাড়াও সতীর্থ নিকোলাস ওতামেন্দি ও নিকো পাজকে দিয়ে করিয়েছেন বাকি দুটি গোল।
মুখে হাসি, চোখে জল: বাবার স্মরণে অশ্রুসজল ভাষণ
ম্যাচ শেষে পুরো স্টেডিয়াম যখন ‘মেসি-মেসি’ রবে মুখরিত, তখন মাইক হাতে ইতি টানতে গিয়ে নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারেননি আটবারের ব্যালন ডি’অর বিজয়ী তারকা। চওড়া হাসি দিয়ে বক্তব্য শুরু করলেও একপর্যায়ে অশ্রুসজল হয়ে ওঠে তাঁর চোখ।
মাসখানেক আগে পরলোকগত পিতা হোর্হে মেসিকে স্মরণ করে আবেগময় কণ্ঠে মেসি বলেন, “কী বলব ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। মাথায় অনেক কিছুই ঘুরছে। আজকের এই রাতে সবার আগে যার কথা আমার মনে পড়ছে, তিনি আমার বাবা। আপনারা যারা দীর্ঘ ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই শার্টটির প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ দিয়েছেন, তাদের প্রতি আমি চিরকৃতজ্ঞ।”
তিনি আরও যোগ করেন, “এখানে আর ফিরে আসতে না পারার ভাবনাটা ভীষণ কষ্টের। সারা জীবন আমি এই অ্যালবিসেলেস্তে জার্সিতে খেলে যেতে চেয়েছিলাম, কারণ আর্জেন্টিনার হয়ে খেলার চেয়ে সুন্দর অনুভূতি একজন ফুটবলারের জীবনে হতে পারে না। তবে মনে হচ্ছে, বিদায় বলার এটাই সঠিক সময়।”
‘বীর যোদ্ধাদের সঙ্গ পেয়েছি’ এবং সতীর্থদের জন্য সতর্কবার্তা
দীর্ঘ খরা কাটিয়ে জাতীয় দলকে কোপা আমেরিকা, ফিনালিসিমা এবং ফিফা বিশ্বকাপ উপহার দেওয়া মেসি ড্রেসিংরুমের সতীর্থদের ‘বীর যোদ্ধা’ আখ্যা দেন। তবে আনন্দের মাঝেও তরুণ উত্তরসূরিদের সতর্ক করে দিয়েছেন তিনি।
বিদায়ী বক্তব্যের মূল সুর:
সতীর্থদের প্রতি ভালোবাসা: “আমার সব স্বপ্ন তোমরা সত্যি করেছ—বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা, ফিনালিসিমা। আমি সব সময় বীর যোদ্ধাদের দিয়ে পরিবেষ্টিত ছিলাম। এই পরিবারের মতো ড্রেসিংরুমের পরিবেশটা আমি খুব মিস করব।”
ঐক্যবদ্ধ থাকার বার্তা: “এখন থেকে আমি গ্যালারিতে বসে এই ছেলেদের সমর্থক হয়ে থাকব। সামনে কঠিন সময় আসছে, আর সেই মুহূর্তে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। কারণ কিছু মানুষ সব সময়ই থাকে, যারা জাতীয় দলের ব্যর্থতা দেখতে চায়। বড় কিছু অর্জন করতে হলে দল হিসেবে এক থাকতে হবে।”
এক নজরে লিওনেল মেসির আন্তর্জাতিক ফুটবল ক্যারিয়ার
- আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার ২১ বছর (২০০৫ – ২০২৬)
- প্রধান শিরোপা ১টি ফিফা বিশ্বকাপ, ২টি কোপা আমেরিকা, ১টি ফিনালিসিমা
- ব্যক্তিগত অনন্য রেকর্ড ৮টি ব্যালন ডি’অর
- বিদায়ী ম্যাচের ফলাফল আর্জেন্টিনা ৩-০ (মেসির ৩টি গোলেই অবদান)
ভক্তদের হৃদয় ভেঙে আন্তর্জাতিক আঙিনা ছাড়ার মুহূর্তে জন্মভূমির প্রতি নিজের নিঃশর্ত ভালোবাসা জানিয়ে মেসি শেষ করেন, “আমি এই মাঠ ছেড়ে যেতে চাই না। আপনাদের সবাইকে আমি খুব মিস করব। একজন আর্জেন্টাইন হিসেবে আমি গর্বিত এবং নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে পেরে সত্যিই ধন্য।”
এনএন/ ০৭ অক্টোবর ২০২৬




