বাংলাদেশ গত এক দশকে প্রযুক্তির ছোঁয়ায় আমূল পরিবর্তিত হয়েছে। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ এখন আর কেবল একটি স্লোগান নয়, বরং এটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত, ইন্টারনেট এবং স্মার্টফোন মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করেছে। মোবাইল ব্যাংকিং, ই-কমার্স, এবং অনলাইন শিক্ষার প্রসার আমাদের জীবনকে সহজ ও গতিশীল করেছে।
২০২৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা এবং স্মার্টফোন ব্যবহারের হার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে, এই ডিজিটাল বিপ্লবের সাথে সাথে কিছু নতুন চ্যালেঞ্জও সামনে এসেছে। অনলাইনে তথ্যের অবাধ প্রবাহের মধ্যে কোনটি সঠিক এবং কোনটি ভুয়া, তা যাচাই করা সাধারণ মানুষের জন্য অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। তাই প্রযুক্তির সুবিধা উপভোগ করার পাশাপাশি ডিজিটাল নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন থাকা অত্যন্ত জরুরি।
অ্যাপ ও ওয়েবসাইটের জোয়ার: সঠিকটি বেছে নেবেন কীভাবে?
গুগল প্লে স্টোর বা অ্যাপ স্টোরে লক্ষ লক্ষ অ্যাপ রয়েছে। এর মধ্যে কোনটি আপনার জন্য প্রয়োজনীয় এবং নিরাপদ, তা বোঝা সবসময় সহজ নয়। অনেক সময় আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপনের ফাঁদে পড়ে আমরা এমন অ্যাপ ডাউনলোড করি যা আমাদের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে পারে।
একটি ভালো এবং বিশ্বস্ত প্ল্যাটফর্ম খুঁজে পাওয়া ডিজিটাল সাক্ষরতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যেমন আপনি খবরের জন্য বিশ্বস্ত পত্রিকার ওপর নির্ভর করেন, তেমনি ডিজিটাল পরিষেবার ক্ষেত্রেও সঠিক মাধ্যমটি বেছে নেওয়া প্রয়োজন। ইন্টারনেটে এমন অনেক রিসোর্স বা ডিরেক্টরি রয়েছে যা ব্যবহারকারীদের সেরা এবং নিরাপদ সাইটগুলো খুঁজে পেতে সাহায্য করে। আপনি যদি বিভিন্ন ক্যাটাগরির সেরা অনলাইন প্ল্যাটফর্ম বা অ্যাপ সম্পর্কে জানতে চান এবং তাদের রেটিং যাচাই করতে চান, তবে topx এর মতো নির্ভরযোগ্য মাধ্যমের সাহায্য নিতে পারেন। এটি আপনাকে ইন্টারনেটের বিশাল ভাণ্ডার থেকে মানসম্মত এবং যাচাইকৃত প্ল্যাটফর্মগুলো খুঁজে পেতে সহায়তা করবে।
নিরাপদ অ্যাপ চেনার উপায়
- ডেভেলপার তথ্য: অ্যাপটি কোন কোম্পানি তৈরি করেছে তা যাচাই করুন। পরিচিত এবং বিশ্বাসযোগ্য ডেভেলপারদের অ্যাপ ব্যবহার করা নিরাপদ।
- পারমিশন বা অনুমতি: একটি সাধারণ ক্যালকুলেটর অ্যাপ যদি আপনার কন্টাক্ট লিস্ট বা গ্যালারির অ্যাক্সেস চায়, তবে সতর্ক হোন। অপ্রয়োজনীয় পারমিশন দেবেন না।
- রিভিউ ও রেটিং: ডাউনলোডের আগে অন্য ব্যবহারকারীদের মতামত বা রিভিউ পড়ে দেখুন।
ডিজিটাল হাইজিন: অনলাইনে সুস্থ ও নিরাপদ থাকার কৌশল
যেমন আমরা আমাদের শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্য পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকি, তেমনি ডিজিটাল জগতেও ‘ডিজিটাল হাইজিন’ মেনে চলা জরুরি। সাইবার অপরাধীরা প্রতিনিয়ত নতুন নতুন উপায়ে প্রতারণার ফাঁদ পাতছে। ফিশিং লিংক, ভুয়া লটারি জেতার মেসেজ বা সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়ার ঘটনা এখন অহরহ ঘটছে।
বাংলাদেশের সাধারণ ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের মধ্যে অনেকেই পাসওয়ার্ড এবং ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা নিয়ে তেমন সচেতন নন। একটি দুর্বল পাসওয়ার্ড আপনার ডিজিটাল জীবনের জন্য বড় হুমকির কারণ হতে পারে।
ডিজিটাল নিরাপত্তার কিছু জরুরি টিপস
১. শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার করুন: আপনার নাম, জন্মসাল বা ‘123456’-এর মতো সহজ পাসওয়ার্ড ব্যবহার করবেন না। অক্ষর, সংখ্যা এবং চিহ্নের সংমিশ্রণে পাসওয়ার্ড তৈরি করুন।
২. টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন (2FA): ফেসবুক, জিমেইল বা ব্যাংকিং অ্যাপে টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন চালু রাখুন। এটি আপনার অ্যাকাউন্টের সুরক্ষার একটি অতিরিক্ত স্তর হিসেবে কাজ করে।
৩. অজানা লিংকে ক্লিক করবেন না: অপরিচিত নম্বর বা ইমেইল থেকে আসা কোনো লিংকে ক্লিক করার আগে দুবার ভাবুন। লোভনীয় অফার বা পুরস্কারের প্রলোভন দেখিয়ে হ্যাকাররা তথ্য চুরি করতে পারে।
নিজের ভাষায় প্রযুক্তির ব্যবহার
বাংলাদেশে ইন্টারনেটের প্রসারের একটি বড় কারণ হলো বাংলা ভাষায় কন্টেন্টের প্রাপ্যতা। এখন মানুষ তাদের মাতৃভাষায় তথ্য অনুসন্ধান করতে পারছে, যা প্রযুক্তিকে আরও গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। নিউজ পোর্টাল থেকে শুরু করে সরকারি সেবা—সবই এখন বাংলায় সহজলভ্য।
স্থানীয় ভাষায় প্রযুক্তির ব্যবহার শুধুমাত্র সুবিধার বিষয় নয়, এটি ক্ষমতায়নেরও একটি মাধ্যম। গ্রামের একজন কৃষক এখন ইউটিউবে ভিডিও দেখে আধুনিক চাষাবাদ শিখতে পারছেন, কিংবা একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ফেসবুকে বাংলায় পেজ খুলে তার পণ্য বিক্রি করছেন। তবে, বাংলা কন্টেন্টের ক্ষেত্রেও তথ্যের সত্যতা যাচাই করা জরুরি। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া গুজবে কান না দিয়ে সবসময় মূলধারার সংবাদমাধ্যম বা সরকারি ওয়েবসাইট থেকে তথ্য যাচাই করে নেওয়া উচিত।
আগামীর সম্ভাবনা ও সতর্কতা
ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রবেশ করবে। চ্যাটবট, অটোমেশন এবং স্মার্ট ডিভাইসের ব্যবহার বাড়বে। এই প্রযুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হলে আমাদের নতুন নতুন দক্ষতা অর্জন করতে হবে। তবে প্রযুক্তির এই অগ্রগতির সাথে সাথে আমাদের নৈতিক দায়িত্ববোধও বাড়াতে হবে। অনলাইনে কাউকে হেয় প্রতিপন্ন করা বা মিথ্যা তথ্য ছড়ানো সাইবার অপরাধের শামিল।
পরিশেষে বলা যায়, স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে আমাদের প্রত্যেককে ‘স্মার্ট নাগরিক’ হতে হবে। এর অর্থ হলো প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার জানা এবং এর অপব্যবহার থেকে নিজেকে ও অন্যকে রক্ষা করা। ইন্টারনেট একটি অসীম সম্ভাবনার জগত, সঠিক জ্ঞান এবং সচেতনতার মাধ্যমে আমরা এই জগত থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা আদায় করে নিতে পারি। মনে রাখবেন, আপনার ডিজিটাল নিরাপত্তা আপনার হাতেই।


