
তুরস্কের ইস্তাম্বুলের এক গলির রেস্তোরাঁয় ধরুন আপনি বসে আছেন, মেনুর তুর্কি লেখার একটা শব্দও বুঝতে পারছেন না। ফোন বের করে গুগল ট্রান্সলেটের ক্যামেরা মেনুর দিকে ধরলেন, আর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে পর্দায় নিজের ভাষায় খাবারের নাম ভেসে উঠল। এই কাজের জন্য চ্যাটজিপিটি বা ক্লডে ঢুকে ছবি আপলোড করার কথা অনেকের মাথায়ই আসে না, কারণ গুগল ট্রান্সলেট অ্যাপটা হাতের কাছেই আছে।
২০০৬ সালের ২৮ এপ্রিল গুগল ট্রান্সলেট যখন চালু হয়, তখন সেটা শুধু আরবি আর ইংরেজি ভাষা সামলাতে পারত। ২০ বছর পূর্তির সময় গুগল জানিয়েছে, এখন প্রতি মাসে ১০০ কোটির বেশি মানুষ এই সেবা ব্যবহার করেন। ট্রান্সলেট, সার্চ, লেন্স আর সার্কল টু সার্চ মিলিয়ে প্রতি মাসে অনুবাদ হয় প্রায় এক ট্রিলিয়ন, অর্থাৎ ১ লাখ কোটি শব্দ।
চ্যাটজিপিটি আর ক্লডের মতো বড় ভাষা মডেল আসার পর প্রশ্ন উঠেছে, গুগল ট্রান্সলেটের জায়গা কি দখল হচ্ছে? ব্যবহারকারীর সংখ্যা দেখে তেমন কিছু বোঝা যায় না, তবে কোন কাজে কোনটা বেছে নেওয়া হচ্ছে সেখানে বদল শুরু হয়েছে।
যেখানে এআই এগিয়ে
পুরোনো ধাঁচের মেশিন অনুবাদ বাক্য ভেঙে ভেঙে শব্দের অর্থ বসাত, তাই ফল অনেক সময় আক্ষরিক আর রুক্ষ হতো। বড় ভাষা মডেল পুরো অনুচ্ছেদটা একসঙ্গে পড়ে নেয়, ফলে লেখাটা আনুষ্ঠানিক নাকি ঘরোয়া, কে কাকে কী বলছে, এসব ধরে অনুবাদ করতে পারে।
আরেকটা সুবিধা হলো, অনুবাদ পছন্দ না হলে আপনি মডেলকে বলে দিতে পারেন ‘আরও একটু আনুষ্ঠানিক করো’ বা ‘সহজ ভাষায় লেখো’, আর সে সেই অনুযায়ী লেখাটা নতুন করে সাজিয়ে দেয়। প্রথাগত অনুবাদ অ্যাপে এভাবে কথা বলে ফল বদলানো যেত না।

গবেষণার ফল অবশ্য মিশ্র। চীনা ভাষার পর্যটন বিষয়ক লেখা নিয়ে ২০২৫ সালের একটি তুলনামূলক গবেষণায় দেখা গেছে, মূল লেখার প্রতি বিশ্বস্ততা, সাবলীলতা আর সংস্কৃতি বোঝার দিক থেকে চ্যাটজিপিটি গুগল ট্রান্সলেট ও ডিপএল দুটোকেই ছাড়িয়ে গেছে, বিশেষ করে যখন নির্দেশনায় সংস্কৃতির কথা আলাদা করে বলে দেওয়া হয়েছিল।
ইউরোপীয় ভাষায় এখনো সুনাম ডিপএলের। জার্মান প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের পরীক্ষার ভিত্তিতে দাবি করে, একই মানে পৌঁছাতে গুগলের অনুবাদে দ্বিগুণ আর চ্যাটজিপিটি-৪-এর অনুবাদে তিনগুণ সম্পাদনা লাগে। এটা ডিপএলের নিজের দাবি, স্বাধীন কোনো যাচাই নয়। ইউরোপের বাইরের ভাষায় তাদের এগিয়ে থাকার ব্যবধান কমে আসে, কখনো কখনো থাকেই না।
যেখানে গুগল এখনো সামনে
ভাষার সংখ্যায় গুগলের ধারেকাছে কেউ নেই। গুগল ট্রান্সলেট এখন প্রায় ২৫০টি ভাষা সমর্থন করে, আর ডিপএলের তালিকায় আছে ৩৩টির মতো। ২০২৪ সালে গুগল একসঙ্গে ১১০টি নতুন ভাষা যোগ করেছিল, যার মধ্যে ক্যান্টনিজ, ম্যাঙ্কস আর টক পিসিনের মতো ভাষা ছিল, আর এই ভাষাগুলো মিলিয়ে বক্তার সংখ্যা প্রায় ৬১ কোটি।
ভাষা যত কম প্রচলিত, অনুবাদের মান তত নড়বড়ে হয়, গুগলের বেলাতেও।
ভ্রমণের সময় সাইনবোর্ডের ছবি তুলে অনুবাদ, ইন্টারনেট ছাড়া ভাষা ডাউনলোড করে রাখা, অন্য কেউ কথা বললে সঙ্গে সঙ্গে শুনে বোঝা, ক্রোম ব্রাউজারে পুরো ওয়েবপেজ এক ক্লিকে অনুবাদ করে ফেলা, এই কাজগুলোয় চ্যাটবটের চেয়ে ট্রান্সলেট অ্যাপ বেশি সহজ ঠেকে। গুগল সার্চ আর অ্যান্ড্রয়েডের ভেতরে ট্রান্সলেট এমনভাবে বসানো, যে আলাদা কোনো অ্যাপে যাওয়ার দরকারই পড়ে না।
গুগলের নিজের জবাব
গুগল বসে নেই। ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর তারা জানায়, ট্রান্সলেটের টেক্সট অনুবাদে এখন নিজেদের জেমিনি মডেল কাজ করছে। উদাহরণ হিসেবে তারা ইংরেজি বাগধারা ‘stealing my thunder’ দেখিয়েছে, যেটা আগে শব্দে শব্দে অনুবাদ হয়ে অর্থহীন শোনাত, আর এখন প্রসঙ্গ দেখে আসল মানেটা ধরার চেষ্টা করা হয়। একই ঘোষণায় এসেছে হেডফোনে বাস্তব সময়ে কথা থেকে কথায় অনুবাদ শোনার একটা পরীক্ষামূলক সুবিধা, যেখানে বক্তার সুর আর থেমে থেমে বলার ধরনও ধরে রাখার কথা বলা হয়েছে।

তবে সবাই এখনই এর স্বাদ পাচ্ছেন না। জেমিনির নতুন টেক্সট অনুবাদ প্রথমে যুক্তরাষ্ট্র আর ভারতে চালু হয়েছে, আর সেটা ইংরেজি থেকে এবং ইংরেজিতে প্রায় ২০টি ভাষার জন্য, যেমন স্প্যানিশ, হিন্দি, চীনা, জাপানি আর জার্মান।
কোন কাজে কোনটা
দ্রুত একটা শব্দের মানে জানা, ভ্রমণে মেনু বা সাইনবোর্ড বোঝা কিংবা কম প্রচলিত কোনো ভাষার লেখা মোটামুটি ধরে নেওয়ার জন্য গুগল ট্রান্সলেটই এখনো সবচেয়ে হাতের কাছের পথ। ইমেইল, আবেদনপত্র বা লম্বা প্রবন্ধের মতো লেখায় সুর আর ভাব ঠিক রাখা জরুরি হলে চ্যাটজিপিটি, ক্লড বা ডিপএলের মতো টুলে অনুবাদ করিয়ে নিয়ে নির্দেশনা দিয়ে ঘষামাজা করে নেওয়া সুবিধার।
আইনি কাগজ, চিকিৎসার তথ্য বা চুক্তির মতো কাজে কোনো যন্ত্রের অনুবাদই একা ভরসা করার মতো নয়, ছাপা বা পাঠানোর আগে দুই ভাষা জানা একজন মানুষকে একবার দেখিয়ে নেওয়াই নিরাপদ।
আরও পড়ুন
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…




