২২৬ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে ইতিহাস গড়লেন সাজিয়া – DesheBideshe

২২৬ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে ইতিহাস গড়লেন সাজিয়া – DesheBideshe

২২৬ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে ইতিহাস গড়লেন সাজিয়া – DesheBideshe


২২৬ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে ইতিহাস গড়লেন সাজিয়া – DesheBideshe

সিউল, ১৯ অক্টোবর – ২০২৬ সালের ৪ অক্টোবর। দক্ষিণ কোরিয়ার গুর্যে কাউন্টিতে চলছে বিশ্বের অন্যতম কঠিন ক্রীড়া প্রতিযোগিতা আয়রনম্যান। ৩ দশমিক ৮ কিলোমিটার সাঁতার শেষ করে সাইকেল চালাচ্ছিলেন বাংলাদেশের এক নারী। সামনে পাহাড়ি পথ, কোথাও চড়াই, কোথাও উতরাই। প্রায় ৪০ কিলোমিটার যাওয়ার পর হঠাৎ এবড়োখেবড়ো রাস্তায় সাইকেলের সামনের চাকা পিছলে গেল। মুহূর্তেই ছিটকে পড়লেন তিনি। বাঁ হাতের বৃদ্ধাঙ্গুল ভেঙে গেছে, হাঁটু ও হাত থেকে রক্ত ঝরছে, মাথায়ও আঘাত লেগেছে। তাঁর অবস্থা দেখে একজন স্বেচ্ছাসেবক কেঁদে ফেলেন। অ্যাম্বুলেন্স ডেকে হাসপাতালে নেওয়ার কথাও ওঠে। কিন্তু নারীটি তখনো হার মানেননি। প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েই আবার সাইকেলে উঠলেন। সামনে তখনো অনেক পথ। সাইকেল শেষ করে তাঁকে দৌড়াতে হবে আরও ৪২ দশমিক ২ কিলোমিটার।

সেই নারী শেষ পর্যন্ত থামেননি। দুর্ঘটনার যন্ত্রণা নিয়েই সাঁতার, সাইক্লিং ও দৌড় মিলিয়ে প্রায় ২২৬ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেন ১৫ ঘণ্টা ১৬ মিনিট ৩৪ সেকেন্ডে। তাঁর নাম সাজিয়া সুলতানা হ্যাপি। পেশায় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ প্রিন্সিপাল অফিসার, ব্যক্তিগত জীবনে দুই সন্তানের মা। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রথম নারী হিসেবে পূর্ণ দূরত্বের আয়রনম্যান শেষ করার কৃতিত্ব এখন তাঁর। অথচ মাত্র এক বছর আগেও আন্তর্জাতিক ট্রায়াথলনের প্রতিযোগী হওয়ার কথা তিনি ভাবেননি।

সাজিয়ার জন্ম ও বেড়ে ওঠা চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে। সমুদ্রের কাছাকাছি বড় হলেও সাঁতার, সাইক্লিং আর দৌড় মিলিয়ে বিশ্বের কঠিনতম প্রতিযোগিতাগুলোর একটিতে নামবেন, এমন স্বপ্ন তখন ছিল না। পড়াশোনাতেই মনোযোগী ছিলেন তিনি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবসায় প্রশাসনে বিবিএ ও এমবিএ করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ সম্পন্ন করেন। পড়াশোনা শেষে কর্মজীবনে ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠিত হন। এরপর জীবন এগিয়েছে চাকরি, সংসার আর সন্তানদের ঘিরে, আর দশজন কর্মজীবী মায়ের মতোই।

স্বামী মো. সাইফুল ইসলাম ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির কর্মকর্তা। সংসারে তাঁদের দুই ছেলে। চাকরি, সন্তানের পড়াশোনা, পরিবারের নানান দায়িত্ব মিলিয়ে ব্যস্ততার শেষ ছিল না। কিন্তু এই ব্যস্ততার মধ্যেই খেলাধুলার প্রতি তাঁর টান তৈরি হয়। শুরুটা ছিল একটু অন্যরকম। অফিসে পুরুষ সহকর্মীদের ফুটবল ও ক্রিকেট দলের সংগঠক ও ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করতেন তিনি। খেলোয়াড়দের উৎসাহ দিতেন, নানা কাজে পাশে থাকতেন। সেই পরিবেশের মধ্যেই খেলাধুলার সঙ্গে এক ধরনের আত্মীয়তা তৈরি হয়।

পরিবর্তন আসে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে। অফিসের এক সহকর্মী ফারুক প্রায়ই নিজের দৌড়ের অভিজ্ঞতার কথা বলতেন। একদিন তাঁর দৌড় দেখতে গিয়ে সাজিয়ারও মনে হলো, তিনিও চেষ্টা করে দেখতে পারেন। সেখান থেকেই শুরু। নিয়মিত অনুশীলনে নেমে পড়েন। ডিসেম্বর থেকে সাঁতার ও সাইক্লিং শেখার পাশাপাশি শরীরকে দীর্ঘ প্রতিযোগিতার উপযোগী করে তোলার প্রস্তুতি নিতে থাকেন। অল্প সময়ের মধ্যেই উন্নতি চোখে পড়ে। ২০২৬ সালের জাতীয় সাইক্লিং প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে সপ্তম স্থান অর্জন করেন। এরপর বড় প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার ইচ্ছা আরও দৃঢ় হয়ে ওঠে।

তবে এই পথ মোটেও সহজ ছিল না। পূর্ণকালীন চাকরিজীবী একজন নারীর জন্য প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা কঠোর অনুশীলন চালিয়ে যাওয়া সহজ কথা নয়। সকাল ছয়টা থেকে আটটা পর্যন্ত অনুশীলন করতেন। তারপর বাড়ি ফিরে সন্তানদের স্কুলের প্রস্তুতি, সেখান থেকে অফিস। সারাদিন কাজ শেষে সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে সংসারের দায়িত্ব সামলে আবার রাতের বেলা ঘরের ভেতরে সাইক্লিংসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণ নিতেন। অনেক দিন রাত এগারোটা পর্যন্ত অনুশীলন চলেছে। এই কঠিন রুটিন টিকিয়ে রাখতে সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর পরিবার। স্বামী, মা-বাবা এবং দুই ছেলে তাঁকে ভরসা দিয়েছেন। কখনো কখনো ছেলেদেরও অনুশীলনের সঙ্গী করতেন। ঘরে গান বাজিয়ে মা ও দুই ছেলে মিলে ব্যায়াম করতেন। তাতেই ক্লান্তির মধ্যেও আনন্দ খুঁজে পেতেন তিনি।

সাজিয়া যে খেলায় নেমেছেন, সেটি ট্রায়াথলন। একই প্রতিযোগিতায় পর্যায়ক্রমে সাঁতার, সাইকেল চালানো ও দৌড় শেষ করতে হয়। এর সবচেয়ে কঠিন আয়োজনগুলোর একটি পূর্ণ দূরত্বের আয়রনম্যান। এখানে ৩ দশমিক ৮ কিলোমিটার সাঁতার, ১৮০ কিলোমিটার সাইক্লিং এবং ৪২ দশমিক ২ কিলোমিটার পূর্ণ ম্যারাথন শেষ করতে হয় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে। বাংলাদেশে এই প্রস্তুতির সুযোগও সীমিত। দীর্ঘ দূরত্বে নিরাপদে সাইকেল চালানোর রাস্তা কম, পর্যাপ্ত সাঁতার প্রশিক্ষণকেন্দ্রও সহজলভ্য নয়। তার ওপর রয়েছে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার বিপুল ব্যয়। তবু এসব বাধা তাঁকে থামাতে পারেনি।

২০২৬ সালের ১৭ মে চীনের সাংহাইয়ের চংমিং দ্বীপে আয়োজিত আয়রনম্যান ৭০.৩ প্রতিযোগিতায় অংশ নেন সাজিয়া। এটি পূর্ণ দূরত্বের অর্ধেক। সেখানে সফলভাবে প্রতিযোগিতা শেষ করে ফ্রান্সে আয়রনম্যান ৭০.৩ বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান। ১২ সেপ্টেম্বর নিস শহরে নারীদের ৪০ থেকে ৪৪ বছর বয়স বিভাগে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন তিনি। উত্তাল পানিতে সাঁতার, পাহাড়ি পথে সাইক্লিং, তারপর দৌড়, সব মিলিয়ে ৭ ঘণ্টা ৫১ মিনিট ৭ সেকেন্ডে প্রতিযোগিতা শেষ করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এই বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ শেষ করা প্রথম বাংলাদেশি নারীও তিনি।

ফ্রান্স থেকে ফেরার মাত্র তিন সপ্তাহ পরই সামনে আসে আরও বড় পরীক্ষা, দক্ষিণ কোরিয়ায় পূর্ণ দূরত্বের আয়রনম্যান। সেখানেই ঘটে সেই দুর্ঘটনা। কিন্তু প্রাথমিক চিকিৎসার পরও তিনি প্রতিযোগিতা ছেড়ে দেননি। ১৮০ কিলোমিটার সাইক্লিং শেষ করে দৌড় শুরু করেন। তখন শরীরে ক্লান্তি, আঘাতের যন্ত্রণা, সামনে পূর্ণ ম্যারাথনের পথ। তবু ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে পৌঁছে যান ফিনিশ লাইনে।

সাজিয়ার এই অর্জনের গুরুত্ব শুধু দূরত্বে নয়, মানসিক শক্তিতেও। তিনি কোনো প্রতিযোগিতায় প্রথম হননি, কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এমন এক প্রতিযোগিতা শেষ করেছেন, যেখানে বড় লড়াইটা আসলে নিজের সঙ্গেই। তাঁর সাফল্য বাংলাদেশের অন্য নারীদের জন্যও অনুপ্রেরণা। তিনি চান, মেয়েরা বুঝুক, সংসার, সন্তান ও চাকরির দায়িত্বের মাঝেও নিজের জন্য সময় বের করা যায়, শরীরচর্চা শুরু করা যায়, নতুন চ্যালেঞ্জ নেওয়া যায়।

সাজিয়া সুলতানা দেখিয়ে দিয়েছেন, নতুন করে শুরু করার জন্য নির্দিষ্ট বয়স লাগে না। চল্লিশের কোঠায় পৌঁছেও কঠিন স্বপ্নকে সত্যি করা যায়। দক্ষিণ কোরিয়ার সেই আহত নারী তাই শুধু একটি প্রতিযোগিতা শেষ করেননি, অনেক নারীর সামনে সম্ভাবনার একটি নতুন দরজাও খুলে দিয়েছেন।

তথ্যসূত্র: IRONMAN, Tri-Mag (Germany), SportStats ও Professional Triathletes Organisation (PTO)।

Scroll to Top