
ছবি: সংগৃহীত
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই মানুষের কাজ সহজ করছে, উৎপাদন বাড়াচ্ছে, ব্যবসার খরচ কমানোর সম্ভাবনাও তৈরি করছে। কিন্তু একই এআই এখন বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন এক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে: এটি কি মূল্যস্ফীতিও বাড়াচ্ছে? অর্থনীতিবিদদের উত্তর, স্বল্প মেয়াদে কিছু ক্ষেত্রে ‘হ্যাঁ’। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এখনো মূল্যস্ফীতির মূল কারণ এআই নয়।
চ্যাটজিপিটি থেকে শুরু করে নানা ধরনের এআই সেবা চালাতে প্রয়োজন বিশাল ডেটা সেন্টার। এসব ডেটা সেন্টারে হাজার হাজার শক্তিশালী কম্পিউটার দিনরাত কাজ করে। ফলে প্রয়োজন হয় বিপুল বিদ্যুৎ।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, আইএমএফের গবেষণায় বলা হয়েছে, এআইয়ের বিস্তারের সঙ্গে ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। এর ফলে কোনো কোনো দেশে বিদ্যুতের দাম এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানির ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।
সহজ করে বললে, একই পরিমাণ বিদ্যুৎ যখন বাড়ি, কারখানা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং বিশাল ডেটা সেন্টার; সবাই বেশি করে চাইছে, তখন বিদ্যুতের সরবরাহ দ্রুত বাড়ানো না গেলে দাম বাড়ার আশঙ্কা থাকে।
যুক্তরাষ্ট্রে এরই মধ্যে এআই ও ডেটা সেন্টারের কারণে বিদ্যুতের ব্যবহার রেকর্ড পর্যায়ে যাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। কিছু অঞ্চলে ডেটা সেন্টারের বাড়তি চাহিদা বিদ্যুৎ অবকাঠামোর ওপরও চাপ সৃষ্টি করছে।
এআই তৈরির জন্য দরকার অত্যাধুনিক কম্পিউটার চিপ, সার্ভার, কুলিং ব্যবস্থা এবং ডেটা সেন্টার নির্মাণের বিপুল অবকাঠামো। ফলে চিপ, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি, নির্মাণসামগ্রী এবং দক্ষ প্রযুক্তিকর্মীর চাহিদাও বাড়ছে।
চাহিদা হঠাৎ বেড়ে গেলে কিন্তু সরবরাহ একই গতিতে না বাড়লে দাম বাড়ে। অর্থনীতির খুব সাধারণ এই নিয়মই এখন এআই বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন নীতিনির্ধারকও সম্প্রতি বলেছেন, এআই-সংশ্লিষ্ট বিপুল বিনিয়োগ ইলেকট্রনিকস ও নির্মাণসহ কয়েকটি খাতে দামের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
এআইয়ের আরেকটি প্রভাব আসে বিনিয়োগ থেকে। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো ডেটা সেন্টার ও এআই অবকাঠামোয় শত শত বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে। এতে অর্থনীতিতে নতুন চাহিদা তৈরি হয়।
আইএমএফ বলছে, স্বল্প মেয়াদে এই ‘এআই বিল্ডিং বুম’ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে পারে, আবার একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতির চাপও বাড়াতে পারে।
তবে এআই আবার দাম কমাতেও পারে। এখানেই বিষয়টি কিছুটা জটিল।
স্বল্প মেয়াদে এআইয়ের জন্য বিদ্যুৎ, চিপ ও অবকাঠামোর চাহিদা বাড়লে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে এআই যদি মানুষের উৎপাদনশীলতা বাড়ায়, একই সময়ে বেশি পণ্য ও সেবা উৎপাদন সম্ভব হয় এবং ব্যবসার খরচ কমে; তাহলে উল্টো দাম কমার চাপ তৈরি হতে পারে।
অর্থাৎ এআই একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতির কারণও হতে পারে, আবার ভবিষ্যতে মূল্যস্ফীতি কমানোর শক্তিও হতে পারে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ছবিটা অন্তত এখন পর্যন্ত ভিন্ন।
দেশে বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রধান কারণ এআই নয়। এখানে মূল্যস্ফীতির কারণ জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, খাদ্যের দাম, সরবরাহ পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারের চাপ।
আইএমএফও বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় এবং মূল্যস্ফীতির চাপ বেড়েছে।
তবে এআইয়ের পরোক্ষ প্রভাব বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্বজুড়ে এআইয়ের কারণে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির চাহিদা বাড়লে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে চাপ তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশ যেহেতু জ্বালানি ও বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তিপণ্য আমদানি করে, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে সেই বাড়তি খরচ শেষ পর্যন্ত দেশের ব্যবসা ও ভোক্তার ওপরও পড়তে পারে।
একইভাবে এআই চিপ, সার্ভার এবং ডেটা সেন্টারের যন্ত্রপাতির বৈশ্বিক চাহিদা বাড়লে বাংলাদেশের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এসব পণ্য কেনার খরচও বাড়তে পারে।
আবার বাংলাদেশের জন্য সুযোগও আছে। এআইকে শুধু মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি হিসেবে দেখলে ছবির অর্ধেকটাই দেখা হবে।
ব্যাংক, পোশাকশিল্প, গণমাধ্যম, কলসেন্টার, হিসাবরক্ষণ, পরিবহন কিংবা সরকারি সেবায় এআই ব্যবহারের মাধ্যমে যদি একই কাজ কম সময়ে এবং কম খরচে করা যায়, তাহলে উৎপাদন ব্যয় কমতে পারে।
কৃষিতে আবহাওয়ার পূর্বাভাস, রোগ শনাক্তকরণ কিংবা বাজার ব্যবস্থাপনায় এআই কার্যকরভাবে ব্যবহার করা গেলে অপচয় কমানো সম্ভব। সরবরাহব্যবস্থাও আরও দক্ষ হতে পারে।
সেক্ষেত্রে এআই দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশের জন্য মূল্যস্ফীতি কমানোর সহায়ক শক্তিও হতে পারে।
এআই তাই শুধু প্রযুক্তির গল্প নয়। ধীরে ধীরে এটি হয়ে উঠছে জ্বালানি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়েরও গল্প।
আরও পড়ুন
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…





