চিকিৎসক থেকে টিকটকে মানসিক স্বাস্থ্য চর্চা: সমাধান নাকি নতুন সংকট? | চ্যানেল আই অনলাইন

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা ও সহমর্মিতা বাড়াতে পারে। তবে এটি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত চিকিৎসা বা পেশাদার মানসিক স্বাস্থ্যসেবার বিকল্প নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

শুক্রবার (২১ অগাস্ট) সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানায়।

টিকটক বা ইনস্টাগ্রামে গিয়ে ‘উদ্বেগ’, ‘এডিএইচডি’ বা ‘মানসিক আঘাত’ লিখে খুঁজলেই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সামনে আসছে মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক নানা ভিডিও। লাইসেন্সধারী মনোবিজ্ঞানী ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা সহজ ভাষায় বিভিন্ন মানসিক সমস্যার ব্যাখ্যা দিচ্ছেন, ভুল ধারণা দূর করছেন এবং করণীয় সম্পর্কে পরামর্শ দিচ্ছেন।

শুধু সচেতনতা তৈরিই নয়, অনেক অ্যাকাউন্ট থেকে ব্যক্তিগত চিকিৎসাসেবা, অর্থের বিনিময়ে কোর্স, বই এবং অন্যান্য পেশাদার সেবার প্রচারও করা হচ্ছে।

মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কনটেন্ট এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। এসব কনটেন্টের দর্শকসংখ্যা অনেক সময় লাখ থেকে কোটি ছাড়িয়ে যাচ্ছে। পেশাদার চিকিৎসকেরা যখন পরামর্শকক্ষের বাইরে সামাজিক মাধ্যমে নিজেদের তথ্য ও মতামত তুলে ধরছেন, তখন মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় এর প্রভাব এবং বাণিজ্যিক দিক নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠছে।

মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় বড় ঘাটতি

খরচ, সামাজিক সংকোচ এবং প্রশিক্ষিত পেশাজীবীর অভাবের কারণে বিশ্বজুড়েই অনেক মানুষ প্রয়োজনীয় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ২০২৫ সালের ‘ওয়ার্ল্ড মেন্টাল হেলথ রিপোর্ট’ অনুযায়ী, বিশ্বের দুই-তৃতীয়াংশ দেশে প্রতি ২ লাখ মানুষের জন্য মাত্র একজন করে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ রয়েছেন। আর বিষণ্নতায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের মাত্র ৯ শতাংশ পর্যাপ্ত চিকিৎসা পান।

যুক্তরাজ্যে এডিএইচডি শনাক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষার অপেক্ষার তালিকাও অনেক ক্ষেত্রে কয়েক বছর পর্যন্ত দীর্ঘ হচ্ছে।

সামাজিক মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক কনটেন্টের ব্যাপকতা বিভিন্ন হ্যাশট্যাগের ব্যবহারেও দেখা যায়।

আমেরিকান মনোবিজ্ঞানী ও গবেষক ড. জোনাথন শেডলার আল জাজিরাকে বলেন, সামাজিক মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক কনটেন্ট যে ব্যাপকভাবে বেড়েছে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। বড় বড় থেরাপি ও মনোবিজ্ঞানভিত্তিক অ্যাকাউন্টগুলোর অনেকেরই লাখ বা কোটি অনুসারী রয়েছে।

মানুষ কী খুঁজছে?

কিল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. কেটি রোজ সন্ডার্স ২০২১, ২০২২ ও ২০২৩ সালের বিভিন্ন সময়ে টিকটকের মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক কনটেন্ট বিশ্লেষণ করেন।

তিনি দেখতে পান, ব্যবহারকারীরা এসব প্ল্যাটফর্মে একে অন্যকে সহায়তা করছেন, সহমর্মিতা প্রকাশ করছেন এবং নিজেদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে কনটেন্ট নির্মাতাদের অভিজ্ঞতার মিল খুঁজছেন। অনেকে সাহায্য চাইছেন এবং নিজে নিজে কোনো মানসিক রোগ শনাক্ত করা ঠিক কি না, তা নিয়েও আলোচনা করছেন।

কেউ কেউ কেন আনুষ্ঠানিকভাবে রোগ শনাক্ত করার পরীক্ষা করান না, সেটিও ব্যাখ্যা করছেন। আবার অনেকে নিজে নিজে রোগ নির্ণয়ের প্রবণতার বিরোধিতা করছেন।

ডিজিটাল মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মনোরোগ চিকিৎসক জানাগান আলাগারাজাহ বলেন, তরুণদের উপযোগী সহজ ভাষা, একই ধরনের অভিজ্ঞতার মানুষের কমিউনিটি এবং পরিচয় গোপন রাখার সুযোগ সামাজিক মাধ্যমকে অনেকের কাছে প্রচলিত চিকিৎসার চেয়ে সহজ ও নিরাপদ মনে করাতে পারে।

তিনি বলেন, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম একটি কমিউনিটি। অনেক মানুষ সেখানে একাকিত্ব ও বিচ্ছিন্নতা থেকে বের হওয়ার জায়গা খুঁজে পান।”

তবে তিনি মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে তথ্য দেওয়া এবং চিকিৎসার মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য করেন।

তার মতে, তথ্য পাওয়া এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসার পথ খুঁজে পেতে সামাজিক মাধ্যম কাজে আসতে পারে। কিন্তু চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন নির্দিষ্ট পরিকল্পনা, বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত পদ্ধতি এবং নিরাপত্তার ব্যবস্থা।

সামাজিক মাধ্যম কি মনোবিজ্ঞানকে সবার কাছে পৌঁছে দিচ্ছে?

ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট রবার্ট রূপা ইনস্টাগ্রামে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কনটেন্ট প্রকাশ করেন। পাশাপাশি নিজের ওয়েবসাইটে বিস্তারিত লেখাও প্রকাশ করেন।

তার মতে, সাধারণ মানুষের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর বড় সুযোগ তৈরি করেছে সামাজিক মাধ্যম।

তিনি বলেন, সামাজিক মাধ্যম পেশাজীবীদের প্রচলিত বই ও গবেষণাপত্রের বাইরেও অনেক মানুষের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ দিয়েছে।

তবে এর সঙ্গে পেশাগত ও আর্থিক সুবিধার বিষয়টিও রয়েছে। সামাজিক মাধ্যমের মাধ্যমে চিকিৎসকেরা সম্ভাব্য রোগী, অন্য পেশাজীবী এবং বিভিন্ন কাজের সুযোগ পেতে পারেন। এতে ব্যক্তিগত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান বা অন্য পেশাগত কার্যক্রমও বাড়তে পারে।

তবু রূপার মতে, সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো মানুষের কাছে তথ্য সহজলভ্য হওয়া এবং মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সামাজিক সংকোচ কমানো।

তার ভাষায়, সামাজিক মাধ্যম অনেক ক্ষেত্রে মনোবিজ্ঞানকে মানুষের কাছে আরও সহজলভ্য করেছে। মানুষ কোথায় থাকেন বা থেরাপির খরচ বহন করতে পারেন কি না—এসবের ওপর নির্ভর না করেই তারা মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে জানতে পারছেন।

তবে এখানেও সমস্যা আছে। অনেক অনুসারী সামাজিক মাধ্যমে সরাসরি চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত বার্তা পাঠিয়ে নিজেদের সমস্যা বা গুরুতর মানসিক সংকটের কথা জানান।

চিকিৎসকেরা সাহায্য করতে চাইলেও একজন অপরিচিত অনুসারীকে শুধু ইনস্টাগ্রামের মাধ্যমে সঠিকভাবে মূল্যায়ন বা চিকিৎসা করা সম্ভব নয়। তাই পেশাগত সীমারেখা ও জরুরি পরিস্থিতিতে কীভাবে সাড়া দেওয়া হবে, সে বিষয়ে আরও স্পষ্ট নিয়ম প্রয়োজন বলে মনে করেন রূপা।

অনলাইনে আছেন, কিন্তু ‘ইনফ্লুয়েন্সার’ হতে চান না

মনোবিজ্ঞানী ড. শেডলার অনলাইনে মনোবিজ্ঞান ও সাইকোথেরাপি নিয়ে আলোচনা করেন। তবে তার দাবি, বড় অনুসারী তৈরি করা কখনোই তার উদ্দেশ্য ছিল না।

তিনি জানান, করোনা মহামারি ও লকডাউনের সময় তিনি নতুন একটি শহরে ছিলেন এবং একাকিত্ব অনুভব করছিলেন। তখন সামাজিক মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে পোস্ট করা শুরু করেন। এর মধ্যে মনোবিজ্ঞান ও সাইকোথেরাপিও ছিল। পরে অবাক হয়ে দেখেন, মানুষ তার লেখা অনুসরণ করতে শুরু করেছে।

তবে তিনি এই জনপ্রিয়তাকে রোগী সংগ্রহের জন্য ব্যবহার করার বিরোধী।

তার মতে, অনেক মানুষ সামাজিক মাধ্যমে জনপ্রিয়তাকে জ্ঞান বা যোগ্যতার প্রমাণ হিসেবে ধরে নেন। কিন্তু বেশি অনুসারী থাকা মানেই বেশি জ্ঞান থাকা নয়।

তিনি বলেন, কিছু মানুষ চিকিৎসক হওয়ার চেয়ে সামাজিক মাধ্যমের ‘ইনফ্লুয়েন্সার’ হতে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠছেন।

সামাজিক মাধ্যমের জনপ্রিয়তার চাপ পেশাজীবীদেরও পরিবর্তন করতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি। তার মতে, অনেক সম্মানিত পেশাজীবীও বেশি লাইক ও অনুসারী পাওয়ার জন্য অতিরিক্ত সরল বা আকর্ষণীয় কনটেন্ট তৈরির দিকে ঝুঁকছেন।

সামাজিক মাধ্যমে তথ্যের নতুন ধরনের ‘কর্তৃত্ব’

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ড. গোরকেম ইয়িলমাজ সামাজিক মাধ্যমে নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক কনটেন্ট তৈরি না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে তিনি এ ধরনের কনটেন্ট তৈরি করা অন্য চিকিৎসকদের সমালোচনা করছেন না।

তার মতে, চিকিৎসা প্রতিটি মানুষের জন্য আলাদা এবং ব্যক্তির পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে সামাজিক মাধ্যমের দর্শক নির্দিষ্ট নয় এবং সেখানে সংক্ষিপ্ত, সহজ ও দ্রুত বোঝা যায়—এমন বক্তব্য বেশি জনপ্রিয় হয়।

তিনি সামাজিক মাধ্যমে তথ্য সহজলভ্য হওয়াকে সরাসরি ‘মনোবিজ্ঞানের গণতন্ত্রীকরণ’ বলতে রাজি নন।

তার মতে, অনলাইনে বিশেষজ্ঞের গুরুত্ব শেষ হয়ে যায়নি। বরং তার রূপ বদলে গেছে। শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পেশাগত পরিচয়ের পাশাপাশি অনুসারীর সংখ্যা, জনপ্রিয়তা এবং একটি নির্দিষ্ট ধরনের বিশ্বাসযোগ্য চেহারাও মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

তবে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সাধারণ মানুষকে শিক্ষিত করার গুরুত্ব তিনিও স্বীকার করেন।

এ ধরনের কনটেন্ট মানুষকে নিজেদের অনুভূতি বোঝার ভাষা দিতে পারে, লজ্জা ও একাকিত্ব কমাতে পারে এবং প্রয়োজনে চিকিৎসা নেওয়ার উৎসাহ দিতে পারে। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় এর পরের ধাপে।

ইয়িলমাজ বলেন, “মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান বাড়ছে। কিন্তু একই গতিতে প্রকৃত চিকিৎসাসেবা ও সরকারি স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী হচ্ছে না।”

অ্যালগরিদম ও বাণিজ্যের প্রভাব

ড. আলাগারাজাহ সতর্ক করে বলেন, সামাজিক মাধ্যমের অ্যালগরিদম ভুল তথ্যকে দ্রুত ছড়িয়ে দিতে পারে। একই সঙ্গে মানুষকে নিজে নিজে রোগ শনাক্ত করার দিকে ঠেলে দিতে পারে এবং একই ধরনের মতামতের মধ্যে আটকে ফেলতে পারে।

সামাজিক মাধ্যমের সুপারিশ ব্যবস্থা সাধারণত মানুষের আগ্রহ ও বেশি সময় ধরে প্ল্যাটফর্মে রাখার বিষয়কে গুরুত্ব দেয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের দিক থেকে কোন তথ্য সবচেয়ে নিরাপদ বা উপযুক্ত—তা সবসময় অগ্রাধিকার পায় না।

ফলে জনস্বাস্থ্য এবং সামাজিক মাধ্যমের ব্যবসায়িক কাঠামোর মধ্যে একটি দ্বন্দ্ব তৈরি হতে পারে।

মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক কনটেন্ট থেকে আয় করার বিষয়টিও জটিল।

ড. ইয়িলমাজের মতে, বিনামূল্যের কনটেন্ট থেকেও মানুষের মধ্যে বিশ্বাস ও পরিচিতি তৈরি হতে পারে, যা পরে অর্থের বিনিময়ে দেওয়া সেবার গ্রাহকে পরিণত হতে পারে।

তবে ড. আলাগারাজাহ মনে করেন, শুধু অর্থ উপার্জন করাটাকেই নৈতিকতার মাপকাঠি বানানো ঠিক নয়। চিকিৎসকেরা বহুদিন ধরেই বই লিখে বা বক্তব্য দিয়ে আয় করছেন। আসল বিষয় হলো তথ্যটি সঠিক, দায়িত্বশীল ও নিরাপদ কি না।

তিনি বলেন, “সামাজিক মাধ্যম ভালোভাবে ব্যবহার করা গেলে এটি কম খরচে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার একটি বাড়তি মাধ্যম হতে পারে। এটি মানুষকে মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে শিক্ষা দিতে পারে, সহায়তার কমিউনিটি তৈরি করতে পারে এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসার পথ দেখাতে পারে।”

তার মতে, আসল প্রশ্ন হওয়া উচিত সামাজিক মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্য থাকবে কি না—তা নয়। বরং কীভাবে নিশ্চিত করা যায় যে এসব তথ্য বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ভরযোগ্য, সঠিকভাবে পরিচালিত এবং নিরাপদ ও যোগ্য চিকিৎসাসেবার সঙ্গে যুক্ত।

Scroll to Top