স্টোরেজে নতুন সম্ভাবনা: হার্ডড্রাইভের বিকল্প হতে পারে আলো! | চ্যানেল আই অনলাইন

ডিজিটাল যুগে প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে বিপুল পরিমাণ তথ্য। ছবি, ভিডিও, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ডেটা—সবকিছু সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজন হচ্ছে আরও বেশি স্টোরেজ। এই বাড়তে থাকা চাহিদার মধ্যে চীনের Fujian Normal University-এর গবেষকরা এমন একটি নতুন হলোগ্রাফিক ডেটা স্টোরেজ পদ্ধতি তৈরি করেছেন, যেখানে আলোর তিনটি বৈশিষ্ট্য—অ্যামপ্লিটিউড, ফেজ পোলারাইজেশন—একসঙ্গে ব্যবহার করে একই জায়গায় আরও বেশি তথ্য সংরক্ষণের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। গবেষক দলের নেতৃত্বে ছিলেন Xiaodi Tan

প্রচলিত ডেটা স্টোরেজ কীভাবে কাজ করে?
একটি সাধারণ হার্ডড্রাইভের কথা ভাবুন। সেখানে তথ্য একটি নির্দিষ্ট পৃষ্ঠে সংরক্ষণ করা হয়। অনেকটা বইয়ের তাকের মতো—তাকের যতটুকু জায়গা আছে, সেখানে ততটুকুই বই রাখা যাবে।

অপটিক্যাল ডিস্কেও একই ধরনের ধারণা কাজ করে। তথ্য মূলত একটি সমতল পৃষ্ঠে নির্দিষ্ট প্যাটার্ন হিসেবে লেখা হয়। কিন্তু সমস্যা হলো, ডেটার পরিমাণ যত বাড়ছে, তত বেশি স্টোরেজ ডিভাইস ও ডেটা সেন্টারের প্রয়োজন হচ্ছে।

হলোগ্রাফিক স্টোরেজের ধারণা কী?
হলোগ্রাফিক স্টোরেজে শুধু কোনো উপাদানের ওপরের পৃষ্ঠ ব্যবহার করা হয় না। উপাদানের ভেতরের আয়তন বা volume-ও তথ্য সংরক্ষণের কাজে ব্যবহার করা হয়।

এটি বোঝার জন্য একটি বাক্সের উদাহরণ দেওয়া যায়।

ধরুন, একটি বাক্সে শুধু নিচের পৃষ্ঠে জিনিস রাখছেন। জায়গা দ্রুত শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু যদি বাক্সটির পুরো ভেতরের জায়গা ব্যবহার করা যায়, তাহলে একই বাক্সে অনেক বেশি জিনিস রাখা সম্ভব।

হলোগ্রাফিক ডেটা স্টোরেজও অনেকটা এভাবেই একটি উপাদানের ভেতরের জায়গা কাজে লাগাতে পারে।

এই গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—গবেষকেরা আলোর তিনটি বৈশিষ্ট্য একসঙ্গে ব্যবহার করেছেন:

  • অ্যামপ্লিটিউড — আলোর তীব্রতা বা শক্তির মাত্রার সঙ্গে সম্পর্কিত
  • ফেজ — আলোকতরঙ্গের পর্যায় বা অবস্থান
  • পোলারাইজেশন — আলোর বৈদ্যুতিক ক্ষেত্রের দিকনির্দেশ

গবেষকেরা এই তিন বৈশিষ্ট্যকে আলাদা তথ্য বহনের মাধ্যম হিসেবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছেন।

সহজ উদাহরণে বিষয়টি হলো
ধরুন, আপনার কাছে একটি আলোক সংকেত রয়েছে।

সাধারণ পদ্ধতিতে আপনি শুধু আলোর উজ্জ্বলতা পরিবর্তন করে তথ্য পাঠালেন।

এখন একই আলোর ক্ষেত্রে যদি উজ্জ্বলতার পাশাপাশি তার ফেজ পরিবর্তন করে দ্বিতীয় তথ্য এবং পোলারাইজেশন পরিবর্তন করে তৃতীয় তথ্য রাখা যায়, তাহলে একই আলোকক্ষেত্রে তিন ধরনের তথ্য বহন করা সম্ভব হবে।

একটি কাল্পনিক উদাহরণ:

অ্যামপ্লিটিউড → “A”
ফেজ → “B”
পোলারাইজেশন → “C”

বাস্তব প্রযুক্তিতে অবশ্য তথ্য এভাবে সরাসরি A, B, C হিসেবে রাখা হয় না। কিন্তু ধারণাটি বোঝার জন্য উদাহরণটি গুরুত্বপূর্ণ—একটি আলোকক্ষেত্রের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যকে ব্যবহার করে একাধিক তথ্য চ্যানেল তৈরি করা যায়।

পোলারাইজেশন কেন গুরুত্বপূর্ণ?
আগের হলোগ্রাফিক স্টোরেজ পদ্ধতিতে সাধারণত আলোর একটি বৈশিষ্ট্য, যেমন অ্যামপ্লিটিউড বা ফেজ ব্যবহার করা হতো। কখনো দুটি বৈশিষ্ট্যও একসঙ্গে ব্যবহার করা হয়েছে।

গবেষকেরা এবার পোলারাইজেশনকে একটি স্বাধীন তথ্যের মাত্রা হিসেবে ব্যবহার করেছেন।

এতে একই আলোকক্ষেত্রে আরও একটি তথ্য চ্যানেল যোগ করার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জতথ্য উদ্ধার করা
তথ্য সংরক্ষণ করলেই হবে না; পরে সেটি নির্ভুলভাবে উদ্ধার করতে হবে।

এখানেই বড় সমস্যা। সাধারণ সেন্সর আলোর তীব্রতা মাপতে পারে। কিন্তু আলোর ফেজ ও পোলারাইজেশনের তথ্য সরাসরি শনাক্ত করা কঠিন।

অর্থাৎ, একটি ছবির মধ্যে যদি তিন ধরনের তথ্য লুকিয়ে থাকে, সাধারণ ক্যামেরা হয়তো তার সবটা বুঝতে পারবে না।

এই সমস্যা সমাধানে গবেষকেরা Convolutional Neural Network বা CNN ব্যবহার করেছেন।

সহজ উদাহরণে বলা যায়, ধরুন একটি ছবিতে কয়েকটি রঙের লেখা একসঙ্গে মিশে গেছে। একজন মানুষ হয়তো সব লেখা আলাদা করতে পারবে না। কিন্তু নির্দিষ্ট উদাহরণ দিয়ে প্রশিক্ষিত একটি AI মডেল ছবির সূক্ষ্ম প্যাটার্ন বিশ্লেষণ করে আলাদা সংকেত শনাক্ত করতে পারে।

এই গবেষণাতেও AI-কে আলোর diffraction image বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন তথ্য শনাক্ত করার জন্য প্রশিক্ষিত করা হয়েছে।

AI কীভাবে তথ্য উদ্ধার করে?
গবেষকেরা দুটি পরিপূরক diffraction image ব্যবহার করেছেন।

একটি ছবি উল্লম্ব polarizer ব্যবহার করে এবং অন্যটি polarizer ছাড়া নেওয়া হয়।

AI এই ছবিগুলোর বিভিন্ন আলোক-প্যাটার্ন বিশ্লেষণ করে তথ্য শেখে কোন পরিবর্তনটি অ্যামপ্লিটিউডের সঙ্গে সম্পর্কিত, কোনটি ফেজের সঙ্গে এবং কোনটি পোলারাইজেশনের সঙ্গে সম্পর্কিত।

এরপর তিন ধরনের তথ্য একসঙ্গে পুনর্গঠন করা সম্ভব হয়।

একটি সহজ তুলনা
বিষয়টি অনেকটা এমন—

ধরুন, একটি ঘরে তিনজন মানুষ একসঙ্গে কথা বলছেন। আপনি শুধু সাধারণ একটি মাইক্রোফোন দিয়ে রেকর্ড করলে তিনজনের কণ্ঠ মিশে যেতে পারে।

কিন্তু যদি এমন একটি AI ব্যবস্থা থাকে, যা কণ্ঠের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে তিনজনের কথা আলাদা করতে পারে, তাহলে একই রেকর্ডিং থেকে আলাদা তথ্য উদ্ধার করা সম্ভব।

এই গবেষণায় আলোকে ঘিরে AI-এর কাজটিও ধারণাগতভাবে এমন—একই আলোকক্ষেত্রের মধ্যে থাকা বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে আলাদা তথ্য উদ্ধার করা

স্টোরেজ ক্ষমতা কেন বাড়তে পারে?

ধরুন, একটি স্টোরেজ পদ্ধতিতে একটি জায়গায় শুধু একটি তথ্য চ্যানেল ব্যবহার করা হচ্ছে।

এখন একই জায়গায় তিনটি স্বাধীন বৈশিষ্ট্য ব্যবহার করা গেলে তথ্য বহনের সুযোগ বাড়বে।

অর্থাৎ—

একটি তথ্যের মাত্রাসীমিত তথ্য

এর বদলে

অ্যামপ্লিটিউড + ফেজ + পোলারাইজেশনবহুমাত্রিক তথ্য

এই ধারণাই নতুন প্রযুক্তির মূল শক্তি।

গবেষকেরা জানিয়েছেন, তাদের বহুমাত্রিক যৌথ এনকোডিং একটি হলোগ্রাফিক ডেটা পেজে বহন করা তথ্যের পরিমাণ বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে নিউরাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ডিকোডিং প্রক্রিয়াও আরও কার্যকর হয়েছে।

ভবিষ্যতে কোথায় ব্যবহার হতে পারে?

প্রযুক্তিটি সফলভাবে উন্নত করা গেলে সম্ভাব্য ব্যবহার হতে পারে—

  • বড় ডেটা সেন্টারে বিপুল তথ্য সংরক্ষণ
  • ভিডিও ও ছবি আর্কাইভ
  • বৈজ্ঞানিক গবেষণার বিশাল ডেটা সংরক্ষণ
  • দীর্ঘমেয়াদি ডিজিটাল আর্কাইভ
  • দ্রুত ডেটা স্থানান্তর
  • অপটিক্যাল এনক্রিপশন
  • নিরাপদ তথ্য আদান-প্রদান
  • উন্নত ইমেজিং প্রযুক্তি

গবেষকেরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে এটি ছোট আকারের ডেটা সেন্টার তৈরিতেও সহায়ক হতে পারে।

তবে এখনই কি বাজারে আসছে?

না। এটি এখনো গবেষণার পর্যায়ে রয়েছে।

বাস্তবে ব্যবহারের আগে আরও কয়েকটি বিষয় উন্নত করতে হবে। যেমন—

  • আরও বেশি তথ্য ধারণক্ষমতা
  • রেকর্ডিং উপাদানের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব
  • তথ্য সংরক্ষণের মানের সমতা
  • বারবার তথ্য লেখা ও পড়ার নির্ভরযোগ্যতা
  • দ্রুত ডেটা পুনরুদ্ধার
  • বাস্তব পরিবেশে AI ডিকোডিংয়ের কার্যকারিতা

গবেষকেরা ভবিষ্যতে একসঙ্গে আরও বেশি ডেটা পেজ ও চ্যানেল সংরক্ষণের জন্য volumetric holographic multiplexing-এর সঙ্গে এই প্রযুক্তি যুক্ত করার পরিকল্পনা করছেন।

কেন এই আবিষ্কার গুরুত্বপূর্ণ?

বিশ্বে ডেটার পরিমাণ যেভাবে বাড়ছে, ভবিষ্যতে শুধু আরও বেশি হার্ডড্রাইভ তৈরি করাই যথেষ্ট নাও হতে পারে। প্রয়োজন হবে কম জায়গায় বেশি তথ্য সংরক্ষণের প্রযুক্তি

এই গবেষণা সেই দিকেই একটি সম্ভাবনাময় পদক্ষেপ।

আজ আমরা ডেটা সংরক্ষণে মূলত হার্ডড্রাইভ, SSD বা অপটিক্যাল স্টোরেজের মতো প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করি। ভবিষ্যতে হয়তো আলোর ভেতরের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য ব্যবহার করে একই জায়গায় আরও অনেক তথ্য সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।

তবে মনে রাখতে হবে, এটি এখনো পরীক্ষামূলক গবেষণা। তাই বিজ্ঞানীরা সীমাহীন ডেটা সংরক্ষণের প্রযুক্তি আবিষ্কার করেছেন বলা ঠিক হবে না। বরং বলা যায়, আলোর তিনটি বৈশিষ্ট্য একসঙ্গে ব্যবহার করে উচ্চক্ষমতার ডেটা স্টোরেজের একটি নতুন সম্ভাবনাময় পথ দেখানো হয়েছে

Scroll to Top