জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং পরোক্ষ ধূমপানের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে অধূমপায়ীদের রক্ষায় পাট অধিদপ্তরের অধীনস্থ দেশের সব কার্যালয়কে ‘শতভাগ তামাকমুক্ত এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অধিদপ্তরের সব অফিসের দৃশ্যমান স্থানে ‘নো-স্মোকিং’ সাইনেজ স্থাপন এবং তামাকমুক্ত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক নির্দেশনা জারি করা হবে।
মঙ্গলবার পাট অধিদপ্তরের সভাকক্ষে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের উদ্যোগে আয়োজিত “তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন (সংশোধন) ২০২৬ অনুযায়ী পাট অধিদপ্তরের অফিসসমূহে শতভাগ তামাকমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে করণীয়” শীর্ষক মতবিনিময় সভায় সভাপতির বক্তব্যে এসব কথা বলেন পাট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) সৈয়দ মো. নূরুল বাসির।
তিনি বলেন, পাট অধিদপ্তরের সব অধীনস্থ অফিসকে তামাকমুক্ত এলাকা ঘোষণা করে অফিস আদেশ জারি করা হবে। পাশাপাশি কর্মস্থলে ধূমপান নিরুৎসাহিত করতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হবে এবং দৃশ্যমান স্থানে তামাকবিরোধী সাইনেজ স্থাপন করা হবে।
মহাপরিচালক বলেন, তামাকের কোনো ইতিবাচক দিক নেই। এটি শুধু ব্যবহারকারীর জন্য নয়, বরং পরিবারের সদস্য, সহকর্মী এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও ক্ষতিকর। তাই কর্মস্থলে ধূমপান নিরুৎসাহিত করার পাশাপাশি তামাকের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো এবং তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন যথাযথভাবে বাস্তবায়নে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সক্রিয় সহযোগিতা প্রয়োজন। জনস্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার স্বার্থে প্রতিটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে তামাকমুক্ত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সভায় ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা দেশের তামাক ব্যবহারের বর্তমান চিত্র তুলে ধরে জানান, দেশে প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর ৩৫ দশমিক ৩ শতাংশ কোনো না কোনো ধরনের তামাক ব্যবহার করে। টোব্যাকো এটলাস-এর তথ্য অনুযায়ী, তামাকজনিত রোগে প্রতিবছর দেশে প্রায় দুই লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। হৃদরোগ, ক্যান্সার, স্ট্রোক এবং দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের অন্যতম প্রধান ঝুঁকির কারণ তামাক ব্যবহার।
এছাড়া দেশে প্রায় চার কোটি অধূমপায়ী পরোক্ষ ধূমপানের কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন। সংগঠনটির তথ্যমতে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে তামাক ব্যবহার ও উৎপাদনের কারণে স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ ছিল প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা, যেখানে একই সময়ে সরকার রাজস্ব পেয়েছে মাত্র ৪১ হাজার কোটি টাকা।
সভায় ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী বলেন, সরকারের লক্ষ্য একটি তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে বিদ্যমান তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের আওতায় সরকারি-বেসরকারি অফিসসহ সব জনসমাগমস্থল শতভাগ ধূমপানমুক্ত রাখতে হবে। এতে একদিকে অধূমপায়ীরা পরোক্ষ ধূমপানের ক্ষতি থেকে সুরক্ষা পাবেন, অন্যদিকে ধূমপায়ীদের মধ্যেও তামাক ছাড়ার প্রবণতা বাড়বে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে অকাল মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ অসংক্রামক রোগ। হৃদরোগ, স্ট্রোক, ক্যান্সার ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বৃদ্ধিতে তামাকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে ধূমপান ত্যাগের মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই শরীরে ইতিবাচক পরিবর্তন শুরু হয় এবং কয়েক বছরের মধ্যে হৃদরোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। তাই ধূমপায়ীদের তামাক ছাড়তে উৎসাহিত করার পাশাপাশি অধূমপায়ীদের সুরক্ষায় প্রতিটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে শতভাগ তামাকমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সভায় অংশগ্রহণকারীরা বলেন, ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৫ (সংশোধন ২০২৬) কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি তামাকজনিত রোগ ও মৃত্যুর হারও কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। এ লক্ষ্য অর্জনে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর উদ্যোগ ও আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতার ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়।





