একসময় আয়কর রিটার্ন জমা দিতে করদাতাদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াতে হতো। এখন ঘরে বসেই কয়েক মিনিটে রিটার্ন দাখিল, কর সনদ ও প্রাপ্তিস্বীকারপত্র পাওয়া যাচ্ছে। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দেশীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান সিনেসিস আইটি লিমিটেডের তৈরি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ই-রিটার্ন প্ল্যাটফর্ম।
২০২৫-২৬ করবর্ষ থেকে ব্যক্তি করদাতাদের জন্য অনলাইন রিটার্ন বাধ্যতামূলক হওয়ার পর প্রথমবারের মতো ব্যক্তি শ্রেণির শতভাগ রিটার্ন ডিজিটালভাবে সম্পন্ন হয়েছে। ২০২৬ সালে ই-রিটার্ন সিস্টেমে ৫০ লাখের বেশি রিটার্ন জমা পড়ে, যার মাধ্যমে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা কর আদায় হয়েছে।
একসময় বিদেশি প্রতিষ্ঠানের একাধিক ব্যয়বহুল প্রকল্প প্রত্যাশিত ফল দিতে ব্যর্থ হলেও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তায় মাত্র প্রায় ১০ কোটি টাকার প্রকল্পে সিনেসিস আইটি দেশীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি কার্যকর, ব্যবহারবান্ধব ও স্কেলেবল ই-রিটার্ন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে।
২০১৩ সালে ই-টিন চালুর পর প্রতিষ্ঠানটি ই-রিটার্ন ও ইএফডিএমএসসহ এনবিআরের একাধিক ডিজিটাল সেবা বাস্তবায়ন করেছে। এছাড়া স্বাস্থ্য বাতায়ন, ৩৩৩ কল সেন্টার, জাতীয় জব পোর্টাল ও বিটিআরসির বায়োমেট্রিক ভেরিফিকেশন প্ল্যাটফর্মসহ বিভিন্ন জাতীয় ডিজিটাল সেবাও প্রতিষ্ঠানটির তৈরি।
ই-রিটার্ন প্ল্যাটফর্মে করদাতারা মোবাইল বা কম্পিউটার থেকেই সহজে তথ্য পূরণ করে রিটার্ন জমা দিতে পারছেন। রয়েছে তাৎক্ষণিক কর সনদ, মোবাইল-রেসপন্সিভ সেবা, অফলাইন তথ্য পূরণের সুবিধা, হেল্পডেস্ক এবং প্রশাসনের জন্য রিয়েল-টাইম ড্যাশবোর্ড।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ করবর্ষে যেখানে অনলাইনে রিটার্ন জমা পড়েছিল ৫ লাখ ২৭ হাজার, সেখানে পরের বছর তা বেড়ে ১৭ লাখ ১২ হাজারে পৌঁছে। বর্তমানে প্ল্যাটফর্মটির মাধ্যমে ৬৫ লাখের বেশি মানুষ উপকৃত হয়েছেন।
সিনেসিস আইটির চিফ সলিউশন অফিসার আমিনুল বারি শুভ্র বলেন, ই-রিটার্নের সাফল্য প্রমাণ করেছে স্থানীয় বাস্তবতা, আইন ও ব্যবহারকারীর চাহিদা সবচেয়ে ভালোভাবে বুঝতে পারে দেশীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান। একই সঙ্গে জাতীয় ডেটার নিরাপত্তা ও ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতেও দেশীয় প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ।
ইইউ ডেলিগেশনের প্রোগ্রাম ম্যানেজার কিশোয়ার আমিন বলেন, ই-রিটার্ন ব্যবস্থা কর প্রশাসনে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও রাজস্ব আদায় বাড়াতে ভূমিকা রাখছে। ভবিষ্যতে কর্পোরেট রিটার্ন ও কর ব্যবস্থার আরও ডিজিটাল রূপান্তরে ইউরোপীয় ইউনিয়ন সহযোগিতা করবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএর অধ্যাপক খালেদ মাহমুদ বলেন, বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারেনি। সেখানে দেশীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সফলতা প্রশংসনীয়।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বলেন, বিদেশি প্রকল্পে শত শত কোটি টাকা ব্যয়ের পরও যে ফল পাওয়া যায়নি, দেশীয় প্রযুক্তি তা সম্ভব করেছে। ই-রিটার্ন ব্যবস্থায় দ্রুত রক্ষণাবেক্ষণ, স্বচ্ছতা, ফাইল টেম্পারিং রোধ এবং কর ফাঁকি শনাক্তকরণ অনেক সহজ হয়েছে। আগামীতে কর্পোরেট রিটার্ন, ডিজিটাল অডিট ও স্মার্ট অফিস ব্যবস্থাপনা যুক্ত হলে বাংলাদেশের কর প্রশাসন পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ইকোসিস্টেমে রূপ নেবে।





