
আটলান্টা, ১২ জুলাই – ক্রিকেটে যেমন ভারত-পাকিস্তান দ্বৈরথ নিয়ে দুনিয়াজুড়ে উন্মাদনা তৈরি হয়, ফুটবল বিশ্বে ঠিক তেমনই এক বারুদে ম্যাচের নাম ‘আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড’। এটি কেবল সাধারণ কোনো ফুটবল ম্যাচ নয়; এর পেছনে জড়িয়ে আছে ফকল্যান্ড যুদ্ধের রক্তাক্ত ইতিহাস, ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ আর বর্ণবাদী অপমানের এক দীর্ঘ প্রতিশোধের আখ্যান। দীর্ঘ ২৪ বছর পর আবারও বিশ্বকাপের মহামঞ্চে দেখা যাচ্ছে এই ব্লকবাস্টার দ্বৈরথ।
সুইজারল্যান্ডকে ৩-১ গোলে হারিয়ে আর্জেন্টিনার সেমিফাইনাল নিশ্চিত করার পরপরই ফুটবল বিশ্বে শুরু হয়ে গেছে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। আগামী বুধবার আটলান্টায় ফাইনালের টিকিট কাটার লড়াইয়ে মুখোমুখি হবে এই দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী।
“যে লাফাবে না, সে-ই ইংরেজ”— গ্যালারি থেকে ড্রেসিংরুমে স্লোগান
সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ের রুদ্ধশ্বাস জয়ের পর মাঠেই উল্লাসে মাতেন লিওনেল মেসিরা। ওই সময় গ্যালারির হাজার হাজার আলবিসেলেস্তে সমর্থকদের কণ্ঠের সাথে সুর মিলিয়ে ফুটবলারদেরও গাইতে দেখা গেছে ঐতিহাসিক সেই উস্কানিমূলক গান—“কো এল কে নো সালতা, এস উন ইংলেস” (অর্থাৎ, যে লাফাবে না, সে-ই ইংরেজ)। এর আগে শেষ ষোলোতে মিশরকে হারানোর পরও আর্জেন্টিনার ড্রেসিংরুমে ইংল্যান্ড বিরোধী গান গাওয়া হয়েছিল। প্রতিপক্ষ চূড়ান্ত হওয়ার আগেই আর্জেন্টিনা শিবির যে কতটা তেঁতে ছিল, তা পরিষ্কার।
ফকল্যান্ডের ক্ষত ও ম্যারাডোনার ‘ফুটবলীয় প্রতিশোধ’
এই দুই দেশের বৈরিতার মূলে রয়েছে ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধ (মালভিনাস দ্বীপপুঞ্জ)। দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরের এই দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মাত্র ৭৪ দিনের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে আর্জেন্টিনার ৬৪৯ জন এবং ব্রিটেনের ২৫৫ জন সেনা নিহত হন। যুদ্ধে আর্জেন্টিনার পরাজয়ের পর দেশটির মানুষ ফুটবল মাঠকে বেছে নেয় ক্ষোভের আগুন নেভানোর মঞ্চ হিসেবে।
সেই যুদ্ধের ঠিক চার বছর পর, ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হয় দুই দল। ডিয়েগো ম্যারাডোনা প্রথমে হাত দিয়ে বিতর্কিত গোল (হ্যান্ড অব গড) এবং তার চার মিনিট পর মাঝমাঠ থেকে একাই ড্রিবলিং করে ইংলিশ ডিফেন্স চূর্ণ করে ‘শতাব্দীর সেরা গোল’টি করে আর্জেন্টিনাকে ২-১ এ জেতান। ম্যারাডোনা তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছিলেন, “আমি ফকল্যান্ডসের কথা ভাবতে ভাবতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খেলেছিলাম।”
১৯৬৬ বিশ্বকাপের ‘পশু’ বিতর্ক
যুদ্ধের আগেও ফুটবলের মাঠে এই দুই দলের তিক্ততার ইতিহাস ছিল। ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক আন্তোনিও রাতিনকে বিতর্কিত লাল কার্ড দেওয়া হলে মাঠে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। ম্যাচ শেষে ইংল্যান্ডের কোচ আলফ রামসে তাঁর খেলোয়াড়দের নির্দেশ দেন আর্জেন্টিনার সাথে জার্সি বদল না করতে এবং আর্জেন্টাইনদের প্রকাশ্যে ‘পশু’ (Animals) বলে গালি দেন। এই বর্ণবাদী মন্তব্যকে আর্জেন্টাইনরা আজও ভোলেনি।
ম্যারাডোনার পর এবার মেসির কাঁধে ইতিহাস
আরেকটি রোমাঞ্চকর তথ্য হলো, লিওনেল মেসি তাঁর দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে অফিশিয়াল বা প্রীতি ম্যাচ—কোনোটিতেই কখনও ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হননি! ফলে ২০২৬ বিশ্বকাপের এই সেমিফাইনালটি মেসির ক্যারিয়ারে প্রথম। আর্জেন্টিনার মানুষের কাছে এটি মেসির হাত ধরে ম্যারাডোনার ১৯৮৬-এর উত্তরাধিকার বজায় রাখার এবং ব্রিটিশদের স্তব্ধ করার এক সুবর্ণ সুযোগ।
জানেন কি? ফকল্যান্ড যুদ্ধের এই রাজনৈতিক উত্তাপের কারণে ফিফাতে একটি অলিখিত নিয়ম রয়েছে। আর্জেন্টিনার ম্যাচে সাধারণত কোনো ইংলিশ রেফারি এবং ইংল্যান্ডের ম্যাচে কোনো আর্জেন্টাইন রেফারি নিয়োগ দেওয়া হয় না।
বিশ্বকাপে দুই দলের হেড-টু-হেড
বিশ্বকাপের মঞ্চে এখন পর্যন্ত ৫ বার মুখোমুখি হয়েছে এই দুই পরাশক্তি:
- ১৯৬২ ও ১৯৬৬: দুইবারই জিতেছিল ইংল্যান্ড।
- ১৯৮৬: ম্যারাডোনা ম্যাজিকে জেতে আর্জেন্টিনা।
- ১৯৯৮: ডেভিড বেকহ্যাম লাল কার্ড দেখার পর টাইব্রেকারে জেতে আর্জেন্টিনা।
- ২০০২: গ্রুপ পর্বে বেকহ্যামের পেনাল্টি গোলে ১-০ ব্যবধানে জিতে মধুর প্রতিশোধ নেয় ইংল্যান্ড।
২০০৫ সালের পর আন্তর্জাতিক ফুটবলে এই দুই দল আর কোনো ম্যাচ খেলেনি। বুধবারের এই মহাযুদ্ধে কে হাসবে শেষ হাসি? মেসির জাদু নাকি হ্যারি কেনদের হুঙ্কার? কমেন্টে জানান আপনার প্রেডিকশন!
এনএন/ ১২ জুলাই ২০২৬







