
চট্টগ্রাম, ১৩ জুন – “ওরা না থাকলে ঘটনাটা অন্য রকম হতে পারত। যখন আমাকে হেনস্থা করছিল, নিয়ে যাচ্ছিল, তখন আমি বলেছি—ভাইয়া আপনারা আসেন। ওরা আমার সঙ্গে গেছে বিধায় অন্য কিছু করার চেষ্টা করলেও পারে নাই।”— ঠিক এই ভাষাতেই শুক্রবার রাতের সেই ভয়াবহ ও নির্মম অভিজ্ঞতার কথা গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরলেন জাতীয় ক্রিকেট দলের অফ-স্পিনার নাঈম হাসান।
শনিবার (১৩ জুন) বিকেলে চট্টগ্রাম নগরীর বহদ্দারহাটের ফরিদারপাড়া এলাকায় নিজ বাসায় সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন এই ক্রিকেটার। কথা বলার সময় তাঁর চোখে-মুখে ছিল স্পষ্ট আতঙ্ক ও ক্লান্তি। দুয়েক মিনিট কথা বলার পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়া নাঈম বলেন, “আমি এখন চাই একটু একা থাকতে। কালকে সারারাত ঘুমাই নাই। এখন আমাকে একটু স্পেস দিলে ভালো হয়।”
ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের ম্যাচ শেষ করে শুক্রবার রাত ১০টা ২০ মিনিটে বিমানে করে চট্টগ্রামে পৌঁছান নাঈম। এরপর শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে নিজ বাড়ির দিকে রওনা দেন। নগরীর লালখান বাজার মোড়ের এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের টোল প্লাজা এলাকায় আসতেই পুলিশ তাঁর অটোরিকশাটি থামায়।
নাঈমের অভিযোগ, গাড়ি থামানোর পরপরই কোনো কিছু জিজ্ঞেস না করেই তাঁকে জোরপূর্বক নামানোর চেষ্টা করা হয়। তিনি বলেন, “মেইনলি হলো উনি (পুলিশ) আমাকে সিএনজির ভেতর তুলতে চাইছে, তাই আমি অনেক ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। উনি যদি আমাকে বলতেন, আমি ব্যাগ চেক করতে দিতাম। উনি চেক করেন নাই। আমি সিএনজি থেকে নামার পর আমাকে বললেন সিএনজিতে ওঠো। আমি মনে করছি, চলে যাওয়ার জন্য উঠতে বলছেন। আমি উঠার সঙ্গে সঙ্গে উনি ঢুকে আমার গলা চেপে ধরবেন, এটা আমি জানতাম না।”
ঘটনাস্থলে উপস্থিত খুলশী থানার এসআই শফিকুল ইসলাম ও পুলিশের সোর্স সোহেল লাঠি এবং পাইপ দিয়ে নাঈমকে নির্মমভাবে মারধর করতে থাকে। নিজেকে জাতীয় দলের ক্রিকেটার পরিচয় দেওয়ার পরও পুলিশের মারধর থামেনি। উল্টো তাঁকে হুমকি দিয়ে বলা হয়, “তুই আসামি, চুপ থাক, একটা কথাও বলবি না।”
মারধরের একপর্যায়ে সেখানে প্রায় ১০০ থেকে ১২০ জন স্থানীয় মানুষ জড়ো হয়ে যান। তাঁরা চিৎকার করে পুলিশকে জানাতে থাকেন যে তিনি জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাঈম হাসান। স্থানীয়রা প্রতিরোধ গড়ে তোলায় পুলিশ তাঁকে অজ্ঞাত স্থানে গুম বা অন্য কোনো বড় ক্ষতি করতে পারেনি বলে ধারণা করা হচ্ছে। এরপর তাঁকে খুলশী থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।
থানায় ওসির কক্ষেও নাঈমের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয় এবং চোখ নিচু করে কথা বলতে বলা হয়। পরে ফোন ফেরত পেয়ে নাঈম হাসান তাৎক্ষণিকভাবে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) সভাপতি তামিম ইকবালকে বিষয়টি জানান। তামিম ইকবাল এবং বিসিবি পরিচালক ইসরাফিল খসরুর জরুরি ফোনের পর টনক নড়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের। এরপরই মুক্ত হন এই ক্রিকেটার।
স্বর্ণ চোরাচালানের একটি ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পুলিশ এই বর্বর অভিযান চালিয়েছিল বলে জানা গেছে। তবে এই ঘটনার পর দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় উঠেছে। বিসিবি এবং ক্রিকেটারদের সংগঠন কোয়াব এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)। অভিযুক্ত খুলশী থানার এসআই শফিকুল ইসলাম এবং কনস্টেবল রাসেল চৌধুরীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে এবং সিএমপির পক্ষ থেকে ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এছাড়া ক্রিকেটার নাঈমের ভাইয়ের দায়ের করা মামলায় পুলিশের সোর্স সোহেলকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আজ বিকেলে সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী সশরীরে নাঈমের বাসায় গিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
বিমর্ষ হলেও নিজের অধিকার ও সাধারণ মানুষের সুরক্ষায় অনড় নাঈম হাসান। জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করে তিনি বলেন, “আজকে যদি আমি স্টেপটা না নিই, কালকে সাধারণ মানুষের সঙ্গে হলে কেউ জানবে না। আজকে যদি স্টেপটা নিই, হয়ত ১০টা মানুষের উপকার হবে; দেশের জন্য ভালো হবে।”
এনএন/ ১৩ জুন ২০২৬







