বাংলাদেশে প্রতিবছর হাজার হাজার শিশু পানিতে ডুবে মারা যাচ্ছে। অথচ অধিকাংশ ঘটনাই ঘটে বাড়ির পাশের পুকুর, ডোবা কিংবা সামান্য জলাবদ্ধতায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অধিকাংশ ঘটনাই প্রতিরোধযোগ্য হলেও সচেতনতার অভাব, নিরাপদ তদারকির ঘাটতি, শিশু যত্নকেন্দ্রের সংকট এবং স্থানীয় পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগের অভাবে ঝরে যাচ্ছে কোমল প্রাণ।
প্রশ্ন উঠছে—এ মৃত্যু কি শুধু পারিবারিক অবহেলার ফল, নাকি এটি দীর্ঘদিনের ব্যবস্থাগত ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর ১৪ হাজারের বেশি শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়। ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ এখন পানিতে ডুবে মৃত্যু।
২০২৪ সালের ন্যাশনাল হেলথ অ্যান্ড ইনজুরি সার্ভে অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন পানিতে ডুবে ৫১ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হচ্ছে, যার ৭৫ শতাংশেরও বেশি শিশু। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো সহযোগিতায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহায়তায় জরিপটি পরিচালনা করে সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ বাংলাদেশ।
জরিপে দেখা গেছে, দেশে বছরে প্রায় ১৮ হাজার ৬৬৫ জন পানিতে ডুবে মারা যান। এর মধ্যে ১৪ হাজার ২৬৯ জনই শিশু। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে এক থেকে চার বছর বয়সী শিশুরা এবং প্রায় ৭০ শতাংশ ঘটনা ঘটে বাড়ির পাশের পুকুরে।
নীরব এক জনস্বাস্থ্য সংকট
দেশে প্রতিবছর পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর ঘটনাগুলোকে অনেকাংশেই প্রতিরোধযোগ্য হলেও কার্যকর উদ্যোগের অভাব, সামাজিক অসচেতনতা এবং রাষ্ট্রীয় উদাসীনতার কারণে এ ট্র্যাজেডি বারবার ঘটছে। তাদের ভাষায়, এ ধরনের মৃত্যু অনেক ক্ষেত্রেই ‘অবহেলাজনিত হত্যাকাণ্ডের’ শামিল।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. আহমদ পারভেজ জাবীন চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, পানিতে ডুবে মারা যাওয়া অনেক শিশুর মধ্যেই খিঁচুনি বা মৃগীরোগের সমস্যা থাকে। এ ধরনের শিশুদের পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঝুঁকি সাধারণ মানুষের তুলনায় বেশি। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই স্বাস্থ্যঝুঁকি প্রায়ই চিহ্নিত হয় না, ফলে মৃগীরোগে আক্রান্ত শিশুদের গোসলের সময় বা পানির আশপাশে থাকার সময় বাড়তি সতর্কতা নেওয়া হয় না। রাষ্ট্রকে বিষয়টিকে জাতীয় জনস্বাস্থ্য অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি।
থামবে কবে এই নীরব বিপর্যয়?
২০১৯ সালে জনস হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত এক গবেষণায় বলা হয়, কার্যকর উদ্যোগ নিলে পানিতে ডুবে মৃত্যু ৮৮ শতাংশের বেশি কমানো সম্ভব।
এর আগে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০১৪ সালের এক প্রতিবেদনে তিনটি কার্যকর কৌশলের কথা উল্লেখ করে—পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য নিরাপদ শিশুযত্ন কেন্দ্র, ছয় থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের সাঁতার ও নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ এবং অভিভাবক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি।
সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ বাংলাদেশের (সিআইপিআরবি) উপনির্বাহী পরিচালক ডা. আমিনুর রহমান চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘটে যখন শিশুরা পরিবারের নজরদারির বাইরে থাকে। জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ জোরদার করা গেলে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
জাতীয় পরিকল্পনা কতটা কার্যকর হবে?
প্রতিরোধযোগ্য এই মৃত্যু ও অসুস্থতা কমাতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আওতাধীন নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ কন্ট্রোল প্রোগ্রাম (এনসিডিসি) এর উদ্যোগে পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে জাতীয় কর্মকৌশল ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে।
পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে প্রণীত জাতীয় কর্মকৌশলের মূল লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে এ ধরনের মৃত্যুর হার ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনা বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. সৈয়দ জাকির হোসেন।
তিনি বলেন, মৃত্যু প্রতিরোধে কার্যকর ও টেকসই ব্যবস্থা নির্ধারণের জন্য গবেষণাভিত্তিক উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ কাজে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার সহযোগিতা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সম্ভাবনাময় গবেষণাক্ষেত্র চিহ্নিত, গবেষণা পরিচালনা, ফলাফল প্রচার ও সুপারিশ বাস্তবায়নের মাধ্যমে সমন্বিত কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
দায় কার?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দায় এককভাবে কারও নয়। পরিবারকে সচেতন হতে হবে, স্থানীয় প্রশাসনকে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ বাংলাদেশের (সিআইপিআরবি) গবেষক মো. আল আমিন ভূইয়া চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, এই প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুর পেছনে অবহেলা ও ব্যবস্থাগত ব্যর্থতা—দুইয়েরই প্রভাব রয়েছে। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধীরগতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। বিশেষ করে সরকারি কেনাকাটার দীর্ঘসূত্রতা ও বিভিন্ন দপ্তরের সমন্বয়হীনতার কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য বিলম্ব ঘটে। পাশাপাশি হাতে পর্যাপ্ত সময় না থাকায় অনেক কার্যক্রমও পরিকল্পনা অনুযায়ী এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি।
কী বলছে সরকার
পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু ও দুর্ঘটনা প্রতিরোধে জাতীয় পর্যায়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।
চ্যানেল আই অনলাইনকে তিনি বলেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, শুধু সরকারি উদ্যোগ নয়, এ ধরনের দুর্ঘটনা রোধে সামাজিক সচেতনতাও বাড়াতে হবে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় পুকুর বা জলাশয়ের চারপাশে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা। যেখানে পুকুর রয়েছে সেখানে বেড়া দেওয়ার ব্যবস্থা করা উচিত। পাশাপাশি শিশুদের একটি নির্দিষ্ট বয়সের পর সাঁতার শেখা বাধ্যতামূলক করার বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকার শিশু-বান্ধব সরকার। কোনো শিশুর মৃত্যুই আমাদের কাম্য নয়। এমন প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুর ঘটনায় সৃষ্টিকর্তার পর দায় সরকারের ওপরই বর্তায়।
পানিতে ডুবে মৃত্যু কমাতে এবং জনসচেতনতা বাড়াতে মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করবে বলেও জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব পদ মর্যাদার এক কর্মকর্তা চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, আইসিসিবি প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায় বাস্তবায়নে কার্যক্রমের সুষ্ঠু তদারকি নিশ্চিত করতে সকল অংশীজনের সম্পৃক্ততায় একটি মনিটরিং সেল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। বাংলাদেশে যে কেউ যেকোনো সময় পানিতে ডুবে যাওয়ার মতো ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারে। তাই শিশু বয়স থেকেই সাঁতার শেখাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণ এবং সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, পুকুর, ডোবা বা ঝরনার উৎসে বাঁশ বা টিনের ঘেরা দেওয়া। সেখানে সতর্কতা বোর্ড রাখা, স্থানীয় নজরদারি ব্যবস্থা চালু করা। এসব সহজ কাঠামোগত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। শিশুমৃত্যু রোধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালানো দরকার।
পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু শুধু পারিবারিক অসতর্কতার বিষয় নয়, এটি জনস্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ব্যবস্থারও বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কার্যকর তদারকি, নিরাপদ শিশুযত্ন, সাঁতার প্রশিক্ষণ ও স্থানীয় পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ জোরদার করা গেলে প্রতিবছর হাজারো শিশুর প্রাণহানি রোধ করা সম্ভব।





