ফেসবুকে সহজে ঋণের নামে নানা প্রলোভন দেখিয়ে একাধিক পেজ থেকে চালানো হচ্ছে বিজ্ঞাপন। এসব বিজ্ঞাপনে ব্যবহারকারীদের বিভিন্ন ওয়েবসাইটে গিয়ে নিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র আপলোড এবং আগাম টাকা পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। এমনকি সরকারি ব্যাংক সোনালি ব্যাংকের নামেও পেজ খুলে ঋণের ফাঁদ পাতা হয়েছে।
ফ্যাক্টচেকারদের ডিজিটাল অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এসব কার্যক্রমে একাধিক অসঙ্গতি ও প্রতারণার লক্ষণ রয়েছে। অনুসন্ধানে অন্তত ৬টি সক্রিয় ফেসবুক পেজের সন্ধান পাওয়া গেছে, যেগুলো বর্তমানে মেটার বিজ্ঞাপন ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রচার চালাচ্ছে।
ওইসব পেজের মধ্যে রয়েছে “Sohoz loan city 2”, “খুব সহজে অনলাইন লোন নিন”, “Loacity 24”, “অনলাইন নেনো লোন”, “Sonali Bank Online Loan” এবং “Sonali Online Digital Loan”। এসব পেজে প্রচারিত ভিডিওতে খুব সহজে কয়েক হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত অনলাইন লোন পাওয়ার দাবি করা হয়।
ভিডিওগুলোতে ব্যবহারকারীদের বিভিন্ন ওয়েবসাইটে প্রবেশ করতে বলা হয়। যেমন bracloan66.com, nanoloan999.com, nanoloan9.com এবং loancity24.com। সেখানে নাম ও মোবাইল নম্বর দিয়ে নিবন্ধনের পর দাবি করা হয়, সোনালী ব্যাংক ও ব্র্যাক ব্যাংক থেকে লোন নেওয়া যাবে। এরপর লোন আবেদন ফরম পূরণ এবং নির্দিষ্ট পরিমাণ ‘অগ্রিম জমা’ দেওয়ার কথা বলা হয়।
যেমন, ১০ হাজার টাকা লোন নিতে ১ হাজার টাকা আগে বিকাশ নম্বরে পাঠাতে বলা হয়। দাবি করা হয়, টাকা পাঠানোর ১ থেকে ৫ মিনিটের মধ্যে লোনের অর্থ পাওয়া যাবে।
তবে অনুসন্ধানে এসব দাবির সঙ্গে বাস্তব তথ্যের মিল পাওয়া যায়নি।
ব্র্যাক ব্যাংক এর অফিসিয়াল তথ্য অনুযায়ী, ইনস্ট্যান্ট লোন নিতে হলে তাদের নিজস্ব “সুবিধা” অ্যাপ ব্যবহার করতে হয় এবং গ্রাহককে নির্দিষ্ট যোগ্যতা যাচাই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। কোনো তৃতীয় পক্ষের বেনামী ওয়েবসাইট থেকে লোন নেওয়ার তথ্য সেখানে নেই।
একইভাবে সোনালি ব্যাংক এর অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে ডিজিটাল ন্যানো লোন সংক্রান্ত যে তথ্য রয়েছে, তার সঙ্গে বিজ্ঞাপনগুলোর একাধিক অমিল পাওয়া যায়।
ব্যাংকের তথ্যমতে, ডিজিটাল ন্যানো লোনের পরিমাণ ৫০০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত এবং এর জন্য ব্যাংক হিসাব থাকা প্রয়োজন। অথচ বিজ্ঞাপনগুলোতে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত লোনের দাবি করা হচ্ছে।
অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে bracloan66.com ওয়েবসাইটে পরীক্ষামূলকভাবে নিবন্ধন করলে দেখা যায়, যেকোনো ভুয়া নাম বা এলোমেলো মোবাইল নম্বর ব্যবহার করেও অ্যাকাউন্ট খোলা যাচ্ছে। কোনো ওটিপি বা পরিচয় যাচাই ব্যবস্থা নেই। এমনকি জাতীয় পরিচয়পত্রের জায়গায় এলোমেলো ছবি আপলোড করলেও সেটি গ্রহণ করছে ওয়েবসাইটটি।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, আর্থিক লেনদেনভিত্তিক বৈধ প্ল্যাটফর্মে পরিচয় যাচাই ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক। কিন্তু এসব ওয়েবসাইটে তা অনুপস্থিত, যা প্রতারণার বড় ইঙ্গিত।
এছাড়া ScamAdviser এর মতো ওয়েবসাইট বিশ্লেষণ প্ল্যাটফর্মে এসব ডোমেইন যাচাই করলে সেগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ বা অনির্ভরযোগ্য হিসেবে দেখানো হয়। দেখা যায়, ওয়েবসাইটগুলোর মালিকানা তথ্য গোপন রাখা হয়েছে এবং অধিকাংশ ডোমেইন সম্প্রতি নিবন্ধিত।
ফেসবুক পেজগুলোর ট্রান্সপারেন্সি তথ্যেও একই ধরনের অসঙ্গতি দেখা গেছে। অধিকাংশ পেজই নতুন খোলা এবং সেখানে এক বা দুইটির বেশি পোস্ট নেই। ভিডিওর নিচে থাকা ইতিবাচক মন্তব্যগুলোর মধ্যেও অস্বাভাবিকতা পাওয়া যায়।
অনুসন্ধানে এমন প্রায় ২০টি ফেসবুক আইডি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সেগুলোর ফলোয়ার সংখ্যা অত্যন্ত কম এবং পোস্ট কার্যক্রমও সীমিত। ফ্যাক্ট-চেকিং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গ্রুপের সদস্যদের মতে, এগুলো বট বা ভুয়া অ্যাকাউন্ট হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, “আগে টাকা দিন, পরে লোন পাবেন” ধরনের অফার সাধারণত প্রতারণার অন্যতম পরিচিত কৌশল। বৈধ ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান সাধারণত অগ্রিম টাকা নিয়ে লোন অনুমোদন করে না।
এদিকে মেটার নিজস্ব বিজ্ঞাপন নীতিমালায় স্পষ্টভাবে বলা রয়েছে: “We do not allow content that offers loans requiring the user to pay an advance fee to obtain a loan.”
অর্থাৎ, অগ্রিম ফি দিয়ে লোন দেওয়ার প্রস্তাবনামূলক বিজ্ঞাপন মেটার নীতিমালার পরিপন্থী। তারপরও এমন একাধিক বিজ্ঞাপন ফেসবুক ও মেসেঞ্জারে সক্রিয়ভাবে প্রচার হতে দেখা গেছে।
সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও ফ্যাক্ট-চেকারদের পরামর্শ হলো, সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত “সহজে লোন” ধরনের অফারে ব্যক্তিগত তথ্য, এনআইডি বা অগ্রিম অর্থ পাঠানোর আগে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ও গ্রাহকসেবার মাধ্যমে তথ্য যাচাই করা উচিত। বিশেষ করে যেসব ওয়েবসাইট নতুন, অচেনা এবং পরিচয় যাচাই ছাড়া অর্থ দাবি করে, সেগুলোর ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা জরুরি।






