পার্থ, ৯ মার্চ – চীন ও উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষের ম্যাচের মতো এই লড়াইটি একপেশে ছিল না। পিছিয়ে পড়ার পরও ঘুরে দাঁড়ানোর মরিয়া চেষ্টা করেছিল বাংলাদেশ। তারা সাহসী ও উজ্জীবিত ফুটবল খেলেছে। ঋতুপর্ণা চাকমা এবং কোহাতি কিসকুরা সুযোগ তৈরি করলেও কোনোভাবেই জালের দেখা পাননি।
দ্বিতীয়ার্ধে দলের পারফরম্যান্স ভেঙে পড়ে। শক্তিশালী উজবেকিস্তানের বিপক্ষে আকাশছোঁয়া স্বপ্ন থাকলেও বড় ব্যবধানে হারতে হয়েছে বাংলাদেশকে। প্রথমবারের মতো এএফসি নারী এশিয়ান কাপে খেলার রোমাঞ্চটুকু সঙ্গী করে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিল পিটার বাটলারের দল। পার্থের রেকট্যাঙ্গুলার স্টেডিয়ামে সোমবার গ্রুপ পর্বে নিজেদের তৃতীয় ও শেষ ম্যাচে উজবেকিস্তানের কাছে চার শূন্য গোলে হেরেছে বাংলাদেশ।
তিন ম্যাচের সবগুলোতে হেরে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার সমীকরণ মেলাতে ব্যর্থ হয়েছে তারা। গ্রুপে চার দলের মধ্যে একেবারে তলানিতে থেকে আসর শেষ করতে হলো বাংলাদেশকে। নিয়ম অনুযায়ী তিন গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন ও রানার্সআপ এবং তৃতীয় হওয়া তিন দলের মধ্যে সেরা দুই দল কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট পাবে। সেরা দুই তৃতীয় দলের একটি হওয়ার সম্ভাবনা বাঁচিয়ে রাখতে উজবেকিস্তান ও বাংলাদেশ উভয় দলেরই জয়ের কোনো বিকল্প ছিল না। দারুণ জয়ে উজবেকিস্তান সেই আশা বাঁচিয়ে রাখলেও বাংলাদেশ তা পারেনি।
এবারের আসরে অংশ নেওয়া ১২টি দলের মধ্যে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে সবচেয়ে নিচে থাকা বাংলাদেশ তিন ম্যাচে মোট ১১টি গোল হজম করে থামল। কোনো ম্যাচেই প্রতিপক্ষের জালে বল জড়াতে পারেননি বাংলাদেশের মেয়েরা। প্রতিযোগিতার নয়বারের চ্যাম্পিয়ন চীনের বিপক্ষে দুই শূন্য গোলের ব্যবধানে হারের পর তিনবারের চ্যাম্পিয়ন উত্তর কোরিয়ার কাছে পাঁচ শূন্য গোলে হেরেছিল দলটি।
লম্বা শারীরিক গড়ন ও শক্তি সামর্থ্যের দিক থেকে উজবেকিস্তান এগিয়ে থাকলেও তাদের বিপক্ষে ম্যাচ নিয়ে বাংলাদেশের প্রত্যাশা বেশি ছিল। কোচ পিটার বাটলার একাদশে দুটি পরিবর্তন এনেছিলেন। উত্তর কোরিয়া ম্যাচে খেলা নবীরন খাতুন ও শামসুন্নাহার জুনিয়রের পরিবর্তে আনিকা রানিয়া সিদ্দিকী ও শিউলি আজিমকে মূল একাদশে রাখা হয়। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের চেয়ে ৬৩ ধাপ এগিয়ে থাকা উজবেকিস্তান শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে।
দুই উইং দিয়ে বাংলাদেশের রক্ষণে ভীতি ছড়াতে থাকে তারা। পঞ্চম মিনিটে ডিফেন্ডারদের কাটিয়ে বক্সে ঢুকে পড়েন লুদমিলা কারাচিক কিন্তু উজবেকিস্তান অধিনায়কের নেওয়া শট দারুণভাবে আটকে দেন বাংলাদেশের গোলরক্ষক মিলি আক্তার। পরের মিনিটেই বক্সের বাইরে থেকে লুদমিলার নেওয়া একটি ফ্রি কিক মাঠের বাইরে চলে যায়। রক্ষণে চাপ ধরে রেখে দশম মিনিটেই প্রথম গোল তুলে নেয় উজবেকিস্তান। নিলুফার কুদরাতোভার থ্রু পাস অফসাইডের ফাঁদ ভেঙে নিজের নিয়ন্ত্রণে নেন দিয়োরাখোন খাবিবুল্লায়েভা।
দারুণ এক কোণাকুণি শটে দূরের পোস্ট দিয়ে তিনি লক্ষ্যভেদ করেন। গোলরক্ষক মিলি ঝাঁপিয়ে পড়লেও বলের গতির সাথে পেরে ওঠেননি। পিছিয়ে পড়ার পর বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতে থাকে। ত্রিশ মিনিটে গায়ের সঙ্গে সেঁটে থাকা ডিফেন্ডারকে গতিতে পরাস্ত করে বাম পায়ে জোরালো শট নেন ঋতুপর্ণা চাকমা। তবে উজবেকিস্তানের গোলরক্ষক ক্ষিপ্রতার সাথে লাফিয়ে এক হাতের থাবায় বল সেভ করেন। চীনের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের হেরে যাওয়া ম্যাচেও গোলরক্ষকের অসামান্য দৃঢ়তায় গোল পাওয়া হয়নি ঋতুপর্ণার। বিয়াল্লিশ মিনিটে একটি সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছিল বাংলাদেশ।
ডান দিক থেকে আসা একটি ক্রস ক্লিয়ার করতে গিয়ে উজবেকিস্তানের এক খেলোয়াড়ের পা থেকে বল চলে যায় তহুরা খাতুনের কাছে। বিপদ বুঝতে পেরে দ্রুত পোস্ট ছেড়ে বেরিয়ে তহুরার পথ আটকে দাঁড়ান উজবেকিস্তানের গোলরক্ষক। শট নেওয়ার জায়গা সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় তিনি ব্যাক পাস দেন কোহাতি কিসকুকে। এই ডিফেন্ডারের শট একজনের গায়ে লেগে কর্নার হয়। কর্নারের পর মারিয়া মান্দার শট ক্রসবারের ওপর দিয়ে চলে যায়। এর কিছুক্ষণ পর সুইডেন প্রবাসী মিডফিল্ডার আনিকার একটি শটও বাইরে গেলে পিছিয়ে থাকার অস্বস্তি নিয়েই বিরতিতে যায় বাংলাদেশ। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে মাঝমাঠের কিছুটা ওপর থেকে একাধিক ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে গোলরক্ষক বরাবর দুর্বল শট নেন ঋতুপর্ণা।
এর পরপরই পাল্টা আক্রমণ থেকে সুযোগ তৈরি করেছিলেন উজবেকিস্তানের কুদরাতোভা। মিলি দ্রুত পোস্ট ছেড়ে বেরিয়ে এসে পথ আটকে দেওয়ায় তিনি শট নিতে পারেননি। তিপ্পান্ন মিনিটে সতীর্থের আড়াআড়ি ক্রসে বক্সে ভালো জায়গায় থেকেও পোস্টে শট রাখতে ব্যর্থ হন দিয়োরাখোন। হতাশায় মুখ ঢাকতে দেখা যায় উজবেকিস্তানের এই ফরোয়ার্ডকে। তবে বাষট্টি মিনিটে ঠিকই ব্যবধান দ্বিগুণ করে নেয় উজবেকিস্তান। সতীর্থের পাস অফসাইডের ফাঁদ ভেঙে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে গোলমুখে আড়াআড়ি ক্রস বাড়ান উদিমা জইরোভা।
নিখুঁত এক টোকায় বল জালে জড়ান দিলদোরা নজিমোভা। চার মিনিট পর দিয়োরাখোনের ক্রস থেকে প্লেসিং শটে ব্যবধান আরও বাড়ান দিলদোরা। ফলে বাংলাদেশের ঘুরে দাঁড়ানোর পথ আরও বেশি কঠিন হয়ে যায়। সত্তর মিনিটে বাংলাদেশের জালে আসালখোন আমিনজনোভা বল জড়ালেও ভিএআর চেকে গোলটি বাতিল হয়। ডান দিক থেকে উড়ে আসা বল ক্লিয়ার করতে বক্সের বাইরে চলে গিয়েছিলেন মিলি।
বলটি তিনি আলতো টোকায় বক্সের ভেতরে এনে ধরেছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তেই আমিনজনোভা শট নিয়ে বল জালে জড়ান। ভিএআর চেকে দেখা যায় যে বল মিলির গ্লাভসের নিচে থাকা অবস্থায় শট করেছিলেন আমিনজনোভা।
ম্যাচের একেবারে শেষ দিকে উড়ে আসা একটি বল বাংলাদেশের এক ডিফেন্ডার হেডে ক্লিয়ার করতে ব্যর্থ হন। বলটি গিয়ে পড়ে নিলুফারের সামনে। প্রথম প্রচেষ্টায় নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিখুঁত শটে ব্যবধান আরও বাড়িয়ে দেন এই ফরোয়ার্ড।
এম ম/ ৯ মার্চ ২০২৬






