খুব আড্ডাবাজ ছিলেন বাবা, ছিলেন গল্পবাজ। ভক্তরা তাঁর কাছে আসত গল্প শোনার জন্য। চমৎকার করে কথা বলতেন তিনি, আবেশে জড়িয়ে পড়ত শ্রোতারা। রাতভর গল্প বললেও বাবার গল্প বলা শেষ হতো না। শ্রোতারা বাড়ি ফিরতে ভুলে যেতেন। বেশ কতগুলো ভাষা জানতেন তিনি। প্রচুর পড়ারও অভিজ্ঞতা ছিল। তাঁর ভান্ডার থেকে তিনি একটার পর একটা গল্প বলে যেতেন। একটার পর একটা খেই ধরে, এক বিষয় থেকে অন্য বিষয়ে দর্শন, ইতিহাস, ধর্ম, সাহিত্য কিছুই বাদ পড়ত না। তাঁর প্রতিটি গল্পে রস থাকত। হয়তো কোনো গুরুগম্ভীর বিষয় উপস্থাপনা করলেন, তা থেকেও রস বের হতো। সবার ওই একটাই কথা—সৈয়দদা রসিক বটে। তাঁর মধ্যে একটা মজলিশি ভাব ছিল, সহজে যেকোনো আড্ডা জমিয়ে ফেলতে পারতেন। একবার উসকে দিলেই শুধু হতো। বাবা আমাদের একবার সিলেটে নিয়ে গিয়েছিলেন। সিলেটে আমার দাদার বাড়ি। সেবারই প্রথম বাবার সঙ্গে আমাদের সিলেটে যাওয়া। মা, আমার অন্য চাচাতো ভাইবোনসহ সবাইকে নিয়ে বাবার সঙ্গে আমরা আমাদের পৈতৃক বাড়ি মৌলভীবাজারে গেলাম। চার দিন ছিলাম। হইচই করেছি খুব। আমার তিন চাচা। বড় চাচা সৈয়দ মুস্তফা আলীর সঙ্গে বাবার খুব জমত। আমার বাবা-চাচাদের মধুর সম্পর্কের কথা আমার খুব মনে আছে। তাঁরা তিন ভাই মিলে চুটিয়ে আড্ডা দিতেন। তিন ভাই-ই লিখতেন। বড় চাচা আত্মকথা লিখেছিলেন। আর ছোট চাচা সৈয়দ মুরতজা আলী লিখেছেন আমাদের কালের কথা। সেই সময়ের ওপর লেখা বই দুটি তখন বেশ আলোচিত ছিল।
বাবা মনেপ্রাণে বাঙালি ছিলেন। কিন্তু যখন তিনি বাইরে বের হতেন, বিদেশে যেতেন, তখন তাঁকে মনে হতো ইউরোপিয়ান। তাঁর গায়ের রং খুব ফরসা ছিল। একবার বাবা কলকাতার নিউমার্কেটে ঘুরে ঘুরে কেনাকাটা করছিলেন, তখন এক ভদ্রমহিলা বাবাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আর ইউ অ্যান আমেরিকান?’
বাবা বললেন, ‘নো।’
‘আর ইউ অ্যান ইউরোপিয়ান?’
বাবা বললেন, ‘নো।’
তৃতীয়বার প্রশ্ন করার আগেই বাবা পরিষ্কার বাংলায় বললেন, ‘ম্যাডাম, আপনি কি লেখক সৈয়দ মুজতবা আলীর নাম শুনেছেন?’
সচকিত ভদ্রমহিলা ভীষণ বিড়ম্বনায় পড়ে বললেন, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ।’
বাবা বললেন, ‘আমিই সৈয়দ মুজতবা আলী!’
ভদ্রমহিলা তো বিস্ময়ে হতবাক! আরও বিস্ময়ে ভেঙে পড়বার আগেই বাবা সটকে পড়লেন।





