ঢাকা, ৮ ফেব্রুয়ারি – ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের প্রচারযুদ্ধ তুঙ্গে থাকার মধ্যেই বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী পরস্পরের প্রতি আক্রমণাত্মক বক্তব্য প্রদান করছে। তবে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ ও তাদের বিগত সরকারের বিরুদ্ধে দল দুটির নেতাদের নিশানা তুলনামূলক কম পরিলক্ষিত হচ্ছে। বরং উভয় দলকেই সতর্কতার সঙ্গে কার্যক্রমে নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের সাধারণ ভোটারদের নিজেদের পক্ষে টানার চেষ্টা করতে দেখা গেছে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগকে বাইরে রেখেই এবারের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তবে ভোটের আলোচনায় ঠিকই থাকছে দলটি এবং তাদের প্রতীক নৌকার ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে যাবে কি না, সেই প্রশ্নও উঠে এসেছে জোরেশোরে।
বিএনপির অভ্যন্তরীণ একটি প্রাথমিক বিশ্লেষণে ধারণা দেওয়া হয়েছে যে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকায় তৃণমূলের একটি বড় অংশ ভোট প্রদান থেকে বিরত থাকতে পারে। তবে কিছু ভোট বিএনপির দিকে ঝুঁকবে এবং রক্ষণশীল ভোটারদের একটি অংশ জামায়াতের বাক্সে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর আগে ইনোভিশন কনসাল্টিং নামক একটি প্রতিষ্ঠানের জরিপেও আওয়ামী লীগ ভোটে না থাকলে তাদের ভোট ভাগ হয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল। সত্তর বছরের বেশি পুরনো দলটির বিশাল সমর্থকগোষ্ঠীকে বাইরে রেখে নির্বাচন কতখানি অংশগ্রহণমূলক হবে, তা নিয়ে দেশ-বিদেশের অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন। ব্যালট পেপারে নৌকা প্রতীক না থাকলেও অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচনে অংশ নেওয়া দলগুলো চায় আওয়ামী লীগের সমর্থকরা ভোটকেন্দ্রে আসুক।
গণঅভ্যুত্থানের পর হত্যা, হামলা ও নির্যাতনের ভয়ে দলটির নেতৃত্বের একটি অংশ দেশ ছেড়েছে এবং অনেকেই আত্মগোপনে বা কারাগারে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ কর্মীদের ভোটকেন্দ্রে আসা নিয়ে সংশয় থাকলেও বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীরা তাদের আশ্বস্ত করতে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। তবে স্থানীয় আওয়ামী লীগ সংগঠকদের দাবি, দলের পক্ষ থেকে ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নির্বাচন বর্জনের প্রচার চলছে।
বিএনপির বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৯১, ৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে আওয়ামী লীগের ৩৫ শতাংশ ভোট অন্যদের বাক্সে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে ৪৫ থেকে ৫৫ শতাংশ ভোট বিএনপির দিকে এবং ১৫ থেকে ২০ শতাংশ ভোট জামায়াতের দিকে ঝুঁকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সিলেট, সাতক্ষীরা, কক্সবাজার ও বগুড়ার মতো এলাকাগুলোতে এমন চিত্র দেখা যেতে পারে। ইনোভিশন কনসাল্টিংয়ের জরিপেও দেখা গেছে, আওয়ামী লীগ ভোটে না থাকলে বিএনপি ও জামায়াত প্রধান সুবিধাভোগী হবে এবং ভোটারদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ভোটদানে বিরত থাকবে।
মাঠপর্যায়ে প্রচারের ক্ষেত্রেও ভিন্ন কৌশল দেখা যাচ্ছে। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঠাকুরগাঁওয়ে প্রচারকালে বলেছেন, তারা আওয়ামী লীগের নির্দোষ কর্মীদের ক্ষতি করবেন না। অন্যদিকে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে তারা কোনো মামলা বাণিজ্য করবেন না এবং যারা অপরাধের সঙ্গে যুক্ত নয় তাদের ভয়ের কিছু নেই। তবে জামায়াতের প্রচার বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের মনে করেন, বিগত নির্বাচনে যারা অন্ধ সমর্থন দিয়েছে তারা বাদে অন্যরা এবার ভোট দেবে।
এদিকে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর কবর জিয়ারত করে ভোটের প্রচার শুরু করেছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হাবিবুর রহমান, যাকে দলীয় নির্দেশ অমান্য করায় বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। অন্যদিকে হবিগঞ্জ ৪ আসনের মতো জায়গাগুলোতে আওয়ামী লীগের ভোট স্বতন্ত্র ও বিএনপির প্রার্থীর মধ্যে ভাগ হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন স্থানীয়রা। সার্বিক পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ কৌশলগত নীরবতা পালন করলেও দলটির ভোট ব্যাংক আসন্ন নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
এসএএস/ ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬






