এই খবরটি পডকাস্টে শুনুনঃ
মধ্যপ্রাচ্যে যখন যুদ্ধের আশঙ্কা চরমে, ঠিক তখনই নাটকীয়ভাবে ইরানের ওপর সম্ভাব্য সামরিক হামলা থেকে সরে দাঁড়াল যুক্তরাষ্ট্র। হামলার কয়েক ঘণ্টা আগেই হোয়াইট হাউস থেকে নির্দেশ আসে-হামলা স্থগিত। এতে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বিশ্ববাসী। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়-কেন শেষ মুহূর্তে এই সিদ্ধান্ত?
গত ১৪ জানুয়ারির এই ঘটনা কেন ঘটল? কেন হোয়াইট হাউস একেবারে শেষ মুহূর্তে পিছু হটল? কূটনৈতিক ও সামরিক সূত্রগুলো বলছে, এই সিদ্ধান্তের পেছনে একাধিক কৌশলগত, রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক বাস্তবতা কাজ করেছে।
হামলা বাতিলের প্রকাশ্য কারণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সংবাদ সম্মেলনে জানান, ইরান সরকার সরকারবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত শত শত বিক্ষোভকারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার সিদ্ধান্ত থেকে আপাতত সরে এসেছে।
কূটনৈতিক সূত্রের দাবি, গোপন আলোচনার মাধ্যমে ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে আশ্বস্ত করেছে যে, তারা অবিলম্বে আটশতাধিক বিক্ষোভকারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করছে না। এই বার্তা পাওয়ার পরই ওয়াশিংটন একে উত্তেজনা কমানোর একটি সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে। মার্কিন প্রশাসন জানায়, যেহেতু হামলার মূল কারণটি (মানবাধিকার লঙ্ঘন ও হত্যা) আপাতত স্থগিত করা হয়েছে, তাই এই মুহূর্তে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
তবে পর্দার আড়ালে সবচেয়ে বড় প্রভাব এসেছে মধ্যপ্রাচ্যের যুক্তরাষ্ট্রঘনিষ্ঠ মিত্র দেশগুলো থেকে। সৌদি আরব, কাতার, ওমান ও তুরস্ক একযোগে সম্ভাব্য হামলার বিরোধিতা করে।
এই দেশগুলো ওয়াশিংটনকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়, তারা তাদের আকাশসীমা বা নিজ নিজ ভূখণ্ডে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহারের অনুমতি দেবে না। তাদের আশঙ্কা ছিল, যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে ইরান পাল্টা আঘাত হানবে এবং সেই আঘাতের মূল লক্ষ্য হবে উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল স্থাপনা ও জনবসতি। সম্ভাব্য অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় তারা ওয়াশিংটনের ওপর কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েলও এই মুহূর্তে বড় কোনো যুদ্ধ চায়নি। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ব্যক্তিগতভাবে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে হামলা স্থগিত রাখার অনুরোধ জানান।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৫ সালের জুনে সংঘটিত কথিত ‘১২ দিনের যুদ্ধ’-এর ধকল এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি ইসরায়েল। ইরানের সম্ভাব্য ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা মোকাবিলার মতো পর্যাপ্ত ইন্টারসেপ্টর ও আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বর্তমানে তাদের হাতে নেই। সে কারণে নতুন সংঘাতে জড়াতে অনাগ্রহী ছিল তেল আবিব।
পেন্টাগনের অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নেও মধ্যপ্রাচ্যে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর ঝুঁকি নিয়ে সতর্কতা ছিল। মার্কিন সামরিক বাহিনীর একটি বড় অংশ বর্তমানে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে মোতায়েন রয়েছে। এই অবস্থায় পর্যাপ্ত রসদ ও প্রস্তুতি ছাড়া ইরানের বিরুদ্ধে বড় হামলা চালালে তা কৌশলগতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে—এমন আশঙ্কাই শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে।
বিশ্লেষকদের মতে, আপাতত যুদ্ধের আশঙ্কা কমলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। এটি একটি সাময়িক বিরতি মাত্র। তবে ইরানের কৌশলগত নমনীয়তা, আরব দেশগুলোর ঐক্যবদ্ধ অবস্থান এবং মিত্রদের সতর্ক পরামর্শ—সব মিলিয়ে এবার অন্তত একটি বড় সংঘাত এড়ানো সম্ভব হয়েছে।







