নোবেল পুরস্কার—বিশেষ করে নোবেল শান্তি পুরস্কার—বিশ্বের সর্বোচ্চ সম্মানগুলোর একটি। এই পুরস্কারের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে দুটি প্রতীক: স্বর্ণপদক ও ডিপ্লোমা। এগুলোই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রমাণ করে যে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নোবেল পুরস্কার লাভ করেছে।
রোববার ১৮ জানুয়ারি, প্রকাশিত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম নোবেল পিস প্রাইজ এর এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানা যায়।
নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটির মতে, নোবেল পুরস্কার মূলত একটি সম্মান ও স্বীকৃতি, যা নির্দিষ্ট সময়ে বিজয়ীর অবদানের ভিত্তিতে প্রদান করা হয়। বিজয়ীর পরবর্তী রাজনৈতিক অবস্থান, বক্তব্য বা কার্যক্রমকে পুরস্কারের সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হয় না।
নোবেল কমিটি স্পষ্ট করে জানান, পুরস্কার প্রদানের পর বিজয়ীদের ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত, বক্তব্য বা কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তারা কোনো মন্তব্য করে না। পুরস্কার পাওয়ার পর বিজয়ীরা যে পথ বেছে নেন, তার দায় সম্পূর্ণভাবে তাদের নিজের (বিজয়ীদের)।
নোবেল ফাউন্ডেশনের আইন অনুযায়ী, কোনো বিজয়ী তার নোবেল পদক, ডিপ্লোমা কিংবা পুরস্কারের অর্থ কীভাবে ব্যবহার করবেন—সে বিষয়ে কোনো ধরনের বিধিনিষেধ নেই। একজন বিজয়ী চাইলে এগুলো রাখতে পারেন, দান করতে পারেন, এমনকি বিক্রিও করতে পারেন।
বিশ্বের বিভিন্ন জাদুঘরে বর্তমানে বহু নোবেল পদক প্রদর্শিত হচ্ছে। আবার ইতিহাসে এমন বহু উদাহরণ রয়েছে, যেখানে বিজয়ীরা মানবিক বা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে তাদের পদক দান বা বিক্রি করেছেন।
উল্লেখযোগ্য কয়েকটি উদাহরণের মধ্যে রয়েছে-
কফি আনান (শান্তি পুরস্কার, ২০০১): ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তার স্ত্রী ন্যান আনান জেনেভায় জাতিসংঘের কার্যালয়ে পদক ও ডিপ্লোমা দান করেন। এগুলো এখন স্থায়ীভাবে প্রদর্শিত হচ্ছে।
ক্রিশ্চিয়ান লুস ল্যাঞ্জ (শান্তি পুরস্কার, ১৯২১): নরওয়ের প্রথম নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ীর পদকটি ২০০৫ সাল থেকে অসলোর নোবেল শান্তি কেন্দ্রে ধার হিসেবে প্রদর্শিত হচ্ছে।
দিমিত্রি মুরাতভ (শান্তি পুরস্কার, ২০২১): ২০২২ সালে তিনি তার পদক ১০৩.৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে বিক্রি করেন। পুরো অর্থই ইউক্রেনীয় শরণার্থী শিশুদের জন্য ইউনিসেফে দান করা হয়—যা নোবেল পদকের ইতিহাসে সর্বোচ্চ মূল্য।
ডেভিড থুলেস (পদার্থবিদ্যা পুরস্কার, ২০১৬): তার পরিবার পদকটি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রিনিটি হলে দান করে।
জেমস ওয়াটসন (মেডিসিন পুরস্কার, ১৯৬২): ২০১৪ সালে তার পদক ৪.৭৬ মিলিয়ন ডলারে বিক্রি হয়। পরে ক্রেতা আলিশার উসমানভ পদকটি তাকে ফিরিয়ে দেন।
লিওন লেডারম্যান (পদার্থবিদ্যা পুরস্কার, ১৯৮৮): চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে ২০১৫ সালে পদক বিক্রি করেন।
নট হ্যামসুন (সাহিত্য পুরস্কার, ১৯২০): দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি নেতা জোসেফ গোয়েবলসকে নিজের নোবেল পদক উপহার দেন। পদকটির বর্তমান অবস্থান অজানা।
নোবেল শান্তি পুরস্কারের স্বর্ণপদকের কিছু তথ্য:
নোবেল শান্তি পুরস্কারের পদকটি তৈরি হয় ১৮ ক্যারেট সোনা দিয়ে। ওজন: ১৯৬ গ্রাম, ব্যাস: ৬.৬ সেন্টিমিটার, নকশা: নরওয়েজিয়ান ভাস্কর গুস্তাভ ভিগল্যান্ড (১৯০১) পদকের এক পাশে রয়েছে আলফ্রেড নোবেলের প্রতিকৃতি, আর অন্য পাশে তিনজন নগ্ন পুরুষ একে অপরের কাঁধে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে—যা ভ্রাতৃত্বের প্রতীক। ল্যাটিন শিলালিপি ‘শান্তি ও জাতিসমূহের ভ্রাতৃত্বের জন্য’।
বিশ্লেষকদের মতে, নোবেল পুরস্কারের মর্যাদা পদক বা অর্থে সীমাবদ্ধ নয়। এটি মূলত মানবসভ্যতার জন্য অবদানের স্বীকৃতি। পদক কোথায় আছে বা কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে—তা নয়, বরং বিজয়ীর কাজই ইতিহাসে নোবেল পুরস্কারকে অমর করে রাখে।







