সারাদেশের ন্যায় মানিকগঞ্জেও বইছে নির্বাচনী হাওয়া। উন্নয়নের ফিরিস্তি তুলে ধরে ভোটারদের দ্বারপ্রান্তে এখন প্রার্থী ও তাদের কর্মী সমর্থকেরা। কোর্ট চত্তর থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লার সর্বত্র আলাপ-আলোচনা এখন নির্বাচন কেন্দ্রিক। তবে এমন সময়েও তৃতীয় লিঙ্গের ভোটারদের মাঝে নেই কোন ভোটের আমেজ।
রাজধানীর পাশের জেলা মানিকগঞ্জে সংসদীয় আসন রয়েছে মোট তিনটি। তিনটি আসনের বিপরীতে এখানে প্রার্থী রয়েছে মোট ২০ জন। জেলার মোট ভোটার সংখ্যা ১২ লাখ ৬২ হাজার ৪৪৫ জন। যার মধ্যে পুরুষ ভোটার সংখ্যা ৬ লাখ ৩২ হাজার ৯০৮ এবং নারী ভোটার সংখ্যা ৬ লাখ ২৯ হাজার ৫৩২ জন। আর তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার সংখ্যা মাত্র ৫।
বিশাল ভোটার জনগোষ্ঠীর মধ্যে তৃতীয় লিঙ্গের এতো কম ভোটারের কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে তাদের আগ্রহ এবং ভাসমান জীবনকে দায়ী করলেন প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং সুশীল সমাজের ব্যক্তিরা। তবে এসব বিষয় পাত্তা না দিয়ে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিগত কারণে ভোটার সংখ্যা কম বলে দাবি তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তিদের।
মানিকগঞ্জ হাসপাতাল গেট এলাকায় আলাপ হলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তি বলেন, জন্মগতভাবে তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তি তিনি। জন্মের পর হতেই পরিবার-সমাজ এবং আত্মীয় স্বজনদের নিকট থেকে ঘৃনা আর অবহেলা ছাড়া কিছুই পাননি তিনি। ইচ্ছা থাকলেও তাদের নেই কোন স্থায়ী ঠিকানা এবং কর্মস্থল। মুখে মুখে অনেকেই অনেক কিছু বললেও অবহেলা ছাড়া তাদের ভাগ্যে ভালো কিছু নেই বলে জানান তিনি।
একই সময়ে তারই সঙ্গে থাকা তৃতীয় লিঙ্গের আরেক ব্যক্তি বলেন, মানুষের কাছে হাত পেতে চলতে ভালো লাগে না। নির্দিষ্ট একটা কর্ম করে পরিবারের সঙ্গে বেঁচে থাকার চেয়ে পৃথিবীতে বড় সুখ আর নেই। কিন্তু তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তিদের সেই সুযোগটি কে বা কারা করে দিচ্ছে বলে উল্টো প্রশ্ন করেন তিনি।
এসময় তিনি আরও বলেন, যেখানে তৃতীয় লিঙ্গে ভোটারদের স্থায়ী ঠিকানা নেই, কর্ম নেই, সামাজিক মান-সম্মান নেই সেখানে তাঁরা ভোটার হয়েই কি হবে। এছাড়াও অনেক ভালো মানুষ এখন তৃতীয় লিঙ্গে পরিণত হয়ে আয়-উর্পাজন করে যাচ্ছে। এসব বিষয়েও সরকার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নজর দেওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে মানিকগঞ্জের প্রবীণ সাংবাদিক সাব্বিরুল ইসলাম সাবু বলেন, তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তিদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে নির্বাচন অফিসের বা সরকারের একটি বিশেষ টিম থাকা প্রয়োজন। তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তিদের খুঁজে ভোটার তালিকায় নাম অর্ন্তভুক্তির বিষয়ে সচেতন করার জন্য কাজ করবে তারা।
এছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, এনজিও এবং সাংবাদিকদের উচিত তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তিদের ভোটার হতে উৎসাহ দেওয়া ও ভোটার হতে প্রয়োজনে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া। সামাজিকভাবে তাদেরকে অবহেলার পাত্র মনে না করে তাদের প্রতি সহযোগীতার হাত বাড়িয়ে দিলে অবশ্যই তারাও ভোটার হয়ে স্বাধীনভাবে বাঁচতে শিখবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সুশাসনের জন্য নাগরিক মানিকগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম বিশ্বাস বলেন, ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তি করতে নির্দিষ্ট কিছু আইন রয়েছে। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটারদের স্থায়ী ঠিাকানা নেই বেশিরভাগ ব্যক্তিদের। যে কারণে ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও তৃতীয় লিঙ্গের অনেকেই ভোটার হতে পারেনি।
এই জনগোষ্ঠীকে ভোটার তালিকার আওতায় আনতে সরকারিভাবে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। যাতে করে তারা সহজেই ভোটার হতে পারে। তাহলে হয়তো এক সময়ে সব তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তিরাই ভোটার হতে আগ্রহী হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মানিকগঞ্জ জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মুহাম্মদ আমিনুর রহমান মিজ্ঞা বলেন, তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তিদেরকে ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি নতুন আইনে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। আগে তৃতীয় লিঙ্গের ভোটারদেরকে নারী ভোটার হিসেবে অন্তর্ভুক্তি করা হতো।
কিন্তু তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তিরা এখন তাদের নিজস্ব পরিচয়ে ভোটার হতে পারছে। এই বিষয়ে এখনো অনেকেই অবগত নয়। তবে ধীরে ধীরে তৃতীয় লিঙ্গের সব ব্যক্তিরাই ভোটার তালিকার আওতায় আসবে বলে মনে করেন তিনি।
উল্লেখ্য, তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার তালিকায় অর্ন্তভুক্তি ব্যক্তিদের মধ্যে মানিকগঞ্জ ১ আসনের ঘিওর উপজেলায় রয়েছে দুই জন, মানিকগঞ্জ ২ আসনের সিংগাইর উপজেলায় রয়েছে ২ জন এবং হরিরামপুর উপজেলায় ১ জনসহ জেলায় মোট ৫ জন ভোটার রয়েছে।



