হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে ওষুধ-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ায় সংক্রমণ, উদ্বেগ গবেষকদের | চ্যানেল আই অনলাইন

হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে ওষুধ-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ায় সংক্রমণ, উদ্বেগ গবেষকদের | চ্যানেল আই অনলাইন

বাংলাদেশের হাসপাতালগুলোর নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে সহজে চিকিৎসা করা যায় না এমন ওষুধ-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার বিস্তার উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) সাম্প্রতিক দুটি গবেষণায় দেখা গেছে, হাসপাতালে ভর্তির সময় এসব ব্যাকটেরিয়ামুক্ত থাকা রোগীদের অর্ধেকেরও বেশি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সংক্রমিত হয়েছেন। গবেষকদের মতে, সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা গেলে এই সংক্রমণ ও মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

গবেষণা দুটি আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী মাইক্রোবায়োলজি স্পেকট্রাম এবং অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স অ্যান্ড ইনফেকশন কন্ট্রোল এ প্রকাশিত হয়েছে। এতে ঢাকার একটি বিশেষায়িত সরকারি হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ভর্তি ৩৭৩ জন গুরুতর অসুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক এবং একই হাসপাতালের নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভর্তি ৩৬৩ জন নবজাতকের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

গবেষণার প্রধান লেখক ও আইসিডিডিআর,বি-এর সহকারী বিজ্ঞানী ড. গাজী মো. সালাহউদ্দীন মামুন বলেন, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে অবস্থানকালীন রোগীদের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষাগার বিশ্লেষণ এবং সম্পূর্ণ জিনোম বিন্যাস বিশ্লেষণ প্রযুক্তির মাধ্যমে গবেষকেরা শনাক্ত করেছেন কীভাবে হাসপাতালে ওষুধ-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া ছড়িয়ে পড়ে এবং শরীরে নীরবে থাকা জীবাণু পরবর্তীতে প্রাণঘাতী সংক্রমণে পরিণত হয়। তাঁর ভাষায়, এই গবেষণা রোগীর শরীরে ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি (কলোনাইজেশন) এবং পরবর্তী সংক্রমণের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক তুলে ধরেছে।

গবেষণাটি যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের অর্থায়নে পরিচালিত হয়। এতে সহজে চিকিৎসা করা যায় না এমন প্রতিরোধী গ্রাম-ঋণাত্মক ব্যাকটেরিয়া নিয়ে বিশেষভাবে গবেষণা করা হয়েছে। এই ধরনের ব্যাকটেরিয়া প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী হওয়ায় নিউমোনিয়া, রক্তপ্রবাহের সংক্রমণ, মূত্রনালীর সংক্রমণ এবং ক্ষতের সংক্রমণের মতো গুরুতর রোগের চিকিৎসা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।

গবেষণায় চারটি প্রধান গ্রাম-ঋণাত্মক ব্যাকটেরিয়া বিশ্লেষণ করা হয়েছে ইশেরিশিয়া কোলাই, ক্লেবসিয়েলা নিউমোনিয়ে, অ্যাসিনেটোব্যাক্টার বাউমানি এবং সিউডোমোনাস অ্যারুজিনোসা।

গবেষণায় দেখা যায়, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে ভর্তি প্রায় ৪৮ দশমিক ৫ শতাংশ রোগীর অন্ত্রে সহজে চিকিৎসা করা যায় না এমন প্রতিরোধী গ্রাম-ঋণাত্মক ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি ছিল। যদিও এ অবস্থাকে কলোনাইজেশন বলা হয় এবং এতে তাৎক্ষণিক রোগের লক্ষণ নাও দেখা দিতে পারে, তবুও এসব রোগী নিজেরা সংক্রমিত হওয়ার পাশাপাশি অন্যদের মধ্যেও জীবাণু ছড়িয়ে দিতে পারেন।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, শুরুতে এসব ব্যাকটেরিয়ামুক্ত থাকা ১৯৮ জন রোগীর মধ্যে ১০৫ জন, অর্থাৎ ৫৩ শতাংশ, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন। এছাড়া, যেসব রোগীর ক্ষেত্রে কালচার পরীক্ষায় এসব প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে, তাঁদের মধ্যে ৯০ শতাংশেরও বেশি রোগীর মৃত্যু হয়েছে।

গবেষকদের মতে, সীমিত সুবিধাসম্পন্ন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র, অতিরিক্ত রোগীর চাপ এবং হাসপাতাল-সংশ্লিষ্ট সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকি এই অস্বাভাবিক মৃত্যুহারের অন্যতম কারণ হতে পারে।

সম্পূর্ণ জিনোম বিন্যাস বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অনেক রোগীর শরীরে শুরুতে নীরব অবস্থায় থাকা ব্যাকটেরিয়াই পরবর্তীতে প্রাণঘাতী সংক্রমণের কারণ হয়েছে। অর্থাৎ, শরীরে উপসর্গ ছাড়াই বহন করা জীবাণু পরবর্তী সময়ে গুরুতর রোগে রূপ নিতে পারে।

আইসিডিডিআর,বি-এর অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স গবেষণা ইউনিটের প্রধান এবং গবেষণার প্রধান গবেষক ড. ফাহমিদা চৌধুরী বলেন, হাসপাতাল হওয়া উচিত রোগীর সুস্থ হওয়ার জায়গা, নতুন প্রাণঘাতী সংক্রমণের উৎস নয়। তাঁর মতে, সংকটাপন্ন রোগীদের সুরক্ষায় সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা এবং দায়িত্বশীল অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

একই গবেষণা দলের দ্বিতীয় গবেষণায় ঢাকার একটি নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকা অনুযায়ী সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির প্রভাব মূল্যায়ন করা হয়।

এই কর্মসূচির আওতায় স্বাস্থ্যকর্মী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের নিয়মিত হাত পরিষ্কার রাখা, পরিবেশগত পরিচ্ছন্নতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। পাশাপাশি সংক্রমণ, মৃত্যুহার এবং কার্বাপেনেম-প্রতিরোধী জীবাণুর উপস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয়।

সাত মাসের এই কর্মসূচির পর নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে প্রতি ১০০ জন ভর্তি রোগীর মধ্যে রক্তপ্রবাহের সংক্রমণ ২৮ জন থেকে কমে ৪ জনে নেমে আসে, যা ৮৬ শতাংশ হ্রাস। একই সময়ে মৃত্যুহারও প্রতি ১০০ জনে ২৬ থেকে কমে মাত্র ৪ জনে নেমে আসে।

গবেষকদের মতে, এই ফলাফল প্রমাণ করে যে কার্যকর সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করলে ওষুধ-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার প্রাণঘাতী প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

আইসিডিডিআর,বি-এর নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ বলেন, গবেষণা দুটি দেশের হাসপাতালগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। তাঁর মতে, চিকিৎসা নিতে এসে রোগীরা যদি ওষুধ-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হন, তবে তা স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তবে একই সঙ্গে গবেষণার ফলাফল দেখিয়েছে, সংক্রমণ প্রতিরোধ, হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা, নিয়মিত নজরদারি এবং দায়িত্বশীল অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের মতো মৌলিক পদক্ষেপ জোরদার করলে সংক্রমণ ও মৃত্যুহার বহুগুণ কমানো সম্ভব।

গবেষকেরা মনে করছেন, বাংলাদেশের পাশাপাশি সীমিত সম্পদের অন্যান্য দেশের জন্যও এই গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। তাঁদের মতে, হাত ধোয়া, হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা, জীবাণুমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা, অ্যান্টিবায়োটিকের দায়িত্বশীল ব্যবহার এবং কার্যকর সংক্রমণ প্রতিরোধ ব্যবস্থা বাস্তবায়নের মাধ্যমে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স মোকাবিলা এবং ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব।

Scroll to Top