
বুয়েনোস আইরেস, ০৬ অক্টোবর – কিছু ফুটবলার মাঠে নামেন, ম্যাচ খেলেন, গোল করেন এবং একসময় নীরবে বিদায় নেন। আর কিছু ফুটবলার বিদায় নিলেও তাদের স্মৃতি ম্লান হয় না; তারা থেকে যান মানুষের আবেগে, গল্পে আর নিঃশ্বাসে।
লিওনেল আন্দ্রেস মেসি সেই দ্বিতীয় দলের মানুষ
বল পায়ে তার রাজকীয় ছুটে চলা, একের পর এক ডিফেন্ডারকে তাসের ঘরের মতো ভেঙে দেওয়া, কিংবা হঠাৎ করা সেই চিরচেনা জাদুকরী গোল—এসব কেবল ফুটবলের দৃশ্য নয়, বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে আঁকা অমলিন স্মৃতি। সেই মেসিই এবার আর্জেন্টিনার আকাশী-সাদা জার্সিতে শেষবারের মতো মাঠে নামতে যাচ্ছেন।
বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে হারের পর আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন এই মহাতারকা। তবে দেশের মাটিতে প্রিয় সমর্থকদের সামনে শেষবারের মতো জাতীয় দলের প্রিয় জার্সি গায়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। বেনিনের বিপক্ষে বুধবারে আয়োজিত ম্যাচটিই হতে যাচ্ছে আর্জেন্টিনার হয়ে তার শেষ উপস্থিতি।
একটি ম্যাচ, ৯০ মিনিটের খেলা—অথচ সেই ৯০ মিনিটের ভেতরেই যেন গুটিয়ে যাবে দুই দশকেরও বেশি সময়ের এক অতুলনীয় ফুটবল মহাকাব্য।
ম্যারাডোনার দেশ থেকে ‘ফুটবল ঈশ্বর’-এর আসন
আর্জেন্টিনার রোসারিওর সেই ছোট্ট ছেলেটি একদিন বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন হবেন—এমনটা হয়তো রোসারিওর অলিগলিতে কেউ ভাবেনি। ম্যারাডোনার দেশে প্রতিটি ক্ষুদে ফুটবলারই ‘ম্যারাডোনা’ হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে বড় হয়। মেসিও ব্যতিক্রম ছিলেন না। কিন্তু নিজের ঈশ্বরপ্রদত্ত প্রতিভা, লড়াকু মানসিকতা আর অদম্য ধারাবাহিকতায় মেসি একসময় ছাড়িয়ে গেছেন নিজের সর্বকালের সব মানদণ্ডকেও।
তবে জাতীয় দলের হয়ে তার পথচলা ফুলবিছানো ছিল না।
কঠিন সেই অপেক্ষা: ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির কাছে হার, পরপর কোপা আমেরিকার ফাইনালে কান্না আর সমালোচনা—সবকিছুর মধ্য দিয়েই যেতে হয়েছে তাকে।
ফিরে আসার গল্প: গভীর হতাশায় একবার আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানালেও ভালোবাসার টানে ফিরে এসেছিলেন। আর সেই ফিরে আসাটাই বদলে দেয় আধুনিক ফুটবলের ইতিহাস।
স্বর্ণালী অধ্যায়: ২০২১ সালে কোপা আমেরিকা জয়, ২০২২-এ ফিনালিসিমা এবং একই বছর কাতারের মরুর বুকে সেই স্বপ্নের বিশ্বকাপ জয়—যার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে পান পূর্ণাঙ্গ পূর্ণতা।
পরিসংখ্যান যা কোনোদিন গল্পটা পুরো বলতে পারবে না
দেশের জার্সিতে মেসি রেখে যাচ্ছেন এমন কিছু পরিসংখ্যান, যা ভাঙা যেকোনো ফুটবলারের জন্যই প্রায় অসম্ভব:
ম্যাচ সংখ্যা: জাতীয় দলের হয়ে ২০৮ ম্যাচ (আর্জেন্টিনার ইতিহাসে সর্বোচ্চ)।
গোল সংখ্যা: ১২৫টি আন্তর্জাতিক গোল (শীর্ষে অবস্থান)।
বিশ্বকাপ রেকর্ড: ২১ গোল ও ১২ অ্যাসিস্টে বিশ্বকাপে মেসির মোট গোল-অবদান ৩৩টি! তিনটি বিশ্বকাপ ফাইনালে শুরুর একাদশে মাঠে নামা একমাত্র খেলোয়াড়ও তিনি।
কিন্তু ফুটবল বিশেষজ্ঞরা বলেন—মেসিকে কি শুধু সংখ্যা দিয়ে মাপা যায়? যায় না। কারণ কিছু খেলোয়াড়ের মানদণ্ড সংখ্যার চেয়েও অনেক উর্ধ্বে।
মেসি এমন কিছু রেখে যাচ্ছেন, যার তুলনা হয় না— স্কালোনি
মেসির বিদায় সামনে রেখে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনি। তিনি বলেন, “মাঠে মেসি যা করেন, অন্য কাউকে সেভাবে করতে আমি কখনো দেখিনি। মেসির অনুপস্থিতিই হবে আর্জেন্টিনা ফুটবলের সবচেয়ে বড় শূন্যতা। তবে তিনি শুধু গোল আর ট্রফি নয়, সতীর্থদের জন্য রেখে যাচ্ছেন শৃঙ্খলা ও অনুকরণীয় এক মানদণ্ড।”
শেষ বাঁশি এবং একটি যুগের অবসান
বুধবারের ম্যাচে গ্যালারি আবারও ভরে উঠবে। হাতে থাকবে নীল-সাদা পতাকা, গ্যালারিতে উঠবে ‘মেসি… মেসি…’ ধ্বনি। কিন্তু এই ম্যাচের প্রতিটি মুহূর্তের অর্থ হবে আলাদা, কারণ বিশ্ববাসী জানবে—এই দৃশ্য আর কোনোদিন দেখা যাবে না।
বিদায়ের শেষ বাঁশির পর হয়তো আকাশী-সাদা হাত দুটি তুলে বলবেন—বিদায়!
মেসি মাঠ থেকে চলে যাবেন ঠিকই, কিন্তু কোটি ভক্তের হৃদয় এবং ফুটবলের ইতিহাসে তিনি থেকে যাবেন একটি নাম হয়ে, একটি যুগ হয়ে, এবং চিরন্তন এক জাদুকরের রূপকথা হয়ে।
এনএন/ ০৬ অক্টোবর ২০২৬
FAQ
মেসির শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ কবে?
আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির বিদায়ী ম্যাচ নির্ধারিত হয়েছে ৬ অক্টোবর ২০২৬, বুয়েনস আইরেসের এস্তাদিও মনুমেন্টালে বেনিনের বিরুদ্ধে। ভারতীয় সময়ে ম্যাচটি ৭ অক্টোবর ভোরে অনুষ্ঠিত হবে।
মেসির শেষ ম্যাচ কার বিরুদ্ধে?
বেনিনের বিরুদ্ধে একটি আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচেই আর্জেন্টিনার জার্সিতে শেষবার মাঠে নামছেন মেসি।
আর্জেন্টিনার হয়ে মেসি কত গোল করেছেন?
বেনিন ম্যাচের আগে মেসির আন্তর্জাতিক গোলসংখ্যা ১২৫।
আর্জেন্টিনার হয়ে মেসি কত ম্যাচ খেলেছেন?
বেনিন ম্যাচের আগে মেসি ২০৭টি ম্যাচ খেলেছেন। বেনিনের বিরুদ্ধে খেললে সংখ্যাটি হবে ২০৮।
মেসি কেন আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নিলেন?
২০২৬ বিশ্বকাপের পর মেসি জানান যে তাঁর আন্তর্জাতিক অধ্যায় শেষ করার সময় এসেছে। FIFA তাঁর ৩১ আগস্টের ঘোষণাকে জাতীয় দল থেকে অবসর হিসেবে নিশ্চিত করেছে।




