শ্রম আইন লঙ্ঘনের মামলায় গ্রামীণ টেলিকমের চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে গতকাল সোমবার ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও ৩০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দিয়েছেন ঢাকার তৃতীয় শ্রম আদালত। গ্রামীণ টেলিকমের ১০১ জন শ্রমিক-কর্মচারীকে চাকরিতে স্থায়ী না করা, গণছুটি নগদায়ন না করা, শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনে নির্দিষ্ট লভ্যাংশ জমা না দেওয়ার অভিযোগ ছিল মুহাম্মদ ইউনূস এবং অপর তিন আসামির বিরুদ্ধে। এই মামলায় অপর আসামিরা ছিলেন গ্রামীণ টেলিকমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আশরাফুল হাসান, পরিচালক নুরজাহান বেগম এবং মো. শাহজাহান।
ছয় মাসের দণ্ড পাওয়ার পরও ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে কারাগারে যেতে হয়নি। আপিলের শর্তে তাকে তাৎক্ষণিক জামিন দিয়েছেন আদালত। মুহাম্মদ ইউনূসের আইনজীবীরা তাকে দারিদ্রের বিরুদ্ধে লড়াই করা নোবেলবিজয়ী আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে উল্লেখ করার প্রসঙ্গ টেনে রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেছেন, ‘এই বিচার গ্রামীণ টেলিকমের চেয়ারম্যানের অপরাধের বিচার, নোবেলজয়ীর নয়।’ উল্লেখ্য, ড. মুহাম্মদ ইউনূস শান্তিতে নোবেলবিজয়ী বাংলাদেশি অর্থনীতিবিদ; ক্ষুদ্রঋণ ধারণার প্রতিষ্ঠায় অবদানের জন্যে ২০০৬ সালে তিনি এবং তার প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংক যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন।
রায় ঘোষণার পর মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ‘যে দোষ করিনি, সেই দোষে শাস্তি পেলাম। এই দুঃখটা মনে রয়ে গেল।’ তার আইনজীবী আবদুল্লাহ আল মামুন এ রায়কে নজিরবিহীন মন্তব্য করে বলেন, ‘শ্রম আদালতের এ রায় অপূর্ণাঙ্গ। ড. ইউনূস আদালতের কাছ থেকে ন্যায়বিচার পাননি।’ বাদীপক্ষের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান বলেছেন, ‘রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেছেন, শ্রম আইন লঙ্ঘন করা হয়েছে। গ্রামীণ টেলিকম শ্রম আইন না মেনে নিজস্ব আইন মেনেছে। এ জন্য দুবার তাদের কারণ দর্শানো হয়। তারা কোনো সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেনি। তাদের যে ত্রুটিগুলি ছিল, সেটি তারা সংশোধন করেনি।’ প্রতিক্রিয়াগুলো সহজাত; অর্থাৎ মামলায় বিজয়ী-বিজিতপক্ষ নিজেদের পক্ষেই যুক্তি দেয়, মন্তব্য করে।
মামলা রুজুর তারিখ থেকে রায় পর্যন্ত সময়কাল সোয়া দুই বছরের। ২০২১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর মামলা করেছিল সরকারি সংস্থা কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর। অভিযোগ ছিল, শ্রম আইন, ২০০৬ এবং বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালা, ২০১৫ অনুযায়ী গ্রামীণ টেলিকমের শ্রমিক বা কর্মচারীদের শিক্ষানবিশকাল পার হলেও তাদের নিয়োগ স্থায়ী করা হয়নি। প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শ্রমিক বা কর্মচারীদের মজুরিসহ বাৎসরিক ছুটি দেওয়া, ছুটি নগদায়ন ও ছুটির বিপরীতে নগদ অর্থ দেওয়া হয় না। গঠন করা হয়নি গ্রামীণ টেলিকমে শ্রমিক অংশগ্রহণ তহবিল ও কল্যাণ তহবিল এবং লভ্যাংশের ৫ শতাংশের সমপরিমাণ অর্থ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন আইন অনুযায়ী গঠিত তহবিলে জমা দেওয়া হয় না। এর জবাবে, বিবাদীপক্ষ আদালতকে জানিয়েছিলেন, গ্রামীণ টেলিকমের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয় নিজস্ব নীতিমালা অনুযায়ী। গ্রামীণ টেলিকম কোম্পানি আইনের ২৮ ধারা অনুযায়ী একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। এর লভ্যাংশ বিতরণযোগ্য নয়, সামাজিক উন্নয়নে ব্যয় করা হয়। মূলত, রাষ্ট্রীয় আইন ও শ্রম বিধিমালার বিপরীতে কোম্পানির নিজস্ব নীতিমালার যে দ্বন্দ্ব তার প্রকাশ ছিল এই মামলা ও রায়ে।
গ্রামীণ টেলিকমের চেয়ারম্যান এবং ওই কোম্পানির অন্যদের বিরুদ্ধে বিচারিক আদালতের রায়ের পর আপিল হবে। আপিলসহ বিচার প্রক্রিয়ার অন্য ধাপগুলোতে নির্ধারিত হবে তাদের ভাগ্য। তবে আদালত রায়ের পর্যবেক্ষণে যেখানে বলেছেন, তারা নোবেলবিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের বিচার করেননি, করেছেন গ্রামীণ টেলিকমের কর্মকর্তাদের অপরাধের বিচার। মামলার অভিযোগ এবং বিচারের প্রক্রিয়া সম্পর্কে সে মন্তব্যে আমরা বিশ্বাস রাখতে চাই, কিন্তু এখানে কি বাধ সাধছে না তাৎক্ষণিক জামিনের বিষয়। আপিল করা হবে তাই জামিন—এখানে কি সামনে এল না মুহাম্মদ ইউনূসের নোবেল-বিজয়ের পরিচিতি? বিচার করতে আদালত দেখলেন অপরাধকে, আবার জামিন দিতে গিয়ে কি দেখলেন ব্যক্তিকে? একই আদালত, ব্যবধান মিনিট কয়েক; অথচ পৃথক বিবেচনা!
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের পরিচিতি, প্রভাব ব্যাপক। তার এই মামলা, বিচারিক প্রক্রিয়া, রায় এবং জামিনের অধিকাংশ তার নোবেলবিজয়ীর পরিচিতি প্রাধান্য পেয়েছে। রায়ের খবরও যথারীতি এসেছে বিশ্বমিডিয়ায়। বার্তা সংস্থা এএফপি, বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন ছড়িয়েছে সারাবিশ্বে। ব্লুমবার্গ, ফ্রান্সটোয়েন্টিফোর, আলজাজিরা, সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট, পিটিআই, দ্য হিন্দু, হিন্দুস্তান টাইমস, গালফ নিউজ, এআরওয়াই নিউজসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে আদালতের দণ্ডের খবর প্রকাশিত হয়েছে।
এই রায়ের পর বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে প্রভাব নিয়ে কথা বলেছেন পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন। তিনি বলেছেন, ‘ব্যক্তির (ড. মুহাম্মদ ইউনূস) কারণে রাষ্ট্রের (যুক্তরাষ্ট্র) সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্কে প্রভাব না পড়াটাই স্বাভাবিক। এটা আমাদের একটি আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হয়েছে এবং ওনার আবেদন করার সুযোগ আছে বা উনি জামিনও পেয়েছেন।’ তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, ‘পৃথিবীর বহু নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ফৌজদারি ও দেওয়ানি অপরাধে শাস্তিপ্রাপ্ত হয়েছেন, অনেকে অনেক দিন জেলও খেটেছেন। যৌথভাবে নোবেল পুরস্কার পাওয়া একজন আরেকজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে এমন ঘটনাও আছে।’ রায়ের প্রতিক্রিয়ায় বিএনপির পক্ষ থেকে দেওয়া বিবৃতিতে দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী বলেছেন, ‘শেখ হাসিনার ইচ্ছা পূরণে ড. মুহাম্মদ ইউনুসের মতো একজন বিশ্ব সমাদৃত মানুষের বিরুদ্ধে হাস্যকর ও সাজানো মামলায় রকেট গতিতে সাজা প্রদান অবৈধ সরকারপ্রধানের বন্য প্রতিহিংসারই বহিঃপ্রকাশ।’
সোয়া দুই বছরের বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে গতকাল ঘোষিত হয়েছে রায়। ধারণা করা হচ্ছে, এই রায়ের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক কিছু প্রতিক্রিয়া আসবে। মামলা চলাকালে গত বছরের আগস্টে এটাকে ‘বিচারিক হয়রানি’ উল্লেখ করে হিলারি ক্লিনটন, বারাক ওবামাসহ ১৮৩ জন বিশ্বনেতা ও নোবেলজয়ী শেখ হাসিনাকে চিঠি লিখে বিচার প্রক্রিয়া বন্ধের অনুরোধ জানান। বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়ে নির্বাহী আদেশের আবেদন জানানো বিশ্বনেতাদের ওই চিঠি স্বাভাবিকভাবেই আমলে নেওয়া হয়নি। তারা মুহাম্মদ ইউনূসের বিচারকে রাজনৈতিকভাবে দেখছেন, রায়ের পর বিশ্বমিডিয়ায় আসা প্রতিবেদনগুলোতেও উল্লিখিত হয়েছে রাজনৈতিক ইঙ্গিত। শেখ হাসিনার শাসনের সমালোচক মুহাম্মদ ইউনূস, এবং শেখ হাসিনা তাকে পছন্দ করেন না বলেও উল্লেখ রয়েছে প্রতিবেদনগুলোতে। বিশ্বের দেশে-দেশে যে প্রতিবেদনগুলোতে প্রকাশিত তার অধিকাংশই বার্তা সংস্থা এএফপি এবং রয়টার্স থেকে নেওয়া বলে ভাষাও অভিন্ন।
শান্তিতে নোবেলবিজয়ী বাংলাদেশি অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মামলার শুরু থেকে আলোচনার যাত্রা। যেকোনো মামলার ভবিতব্য দণ্ড অথবা খালাস। এই মামলার ক্ষেত্রে ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড হয়েছে তার। আমাদের জীবিত একমাত্র নোবেলবিজয়ী বলে তার বিরুদ্ধে এই রায়ে অনেকেই হয়ত অবাক, কিন্তু এটা অবাক হওয়ার মতো কিছু কি? সাম্প্রতিক ইতিহাস বলে, কেবল গত বছরই বিশ্বে অন্তত চারজন শান্তিতে নোবেলবিজয়ীর কারাদণ্ড হয়েছে। মিয়ামনারের অং সান সু চি, বেলারুশের আলেস বিয়ালিয়াৎস্কি, ইরানের নার্গেস মোহাম্মদী এবং ফিলিপাইনের মারিয়া রেসার কারাদণ্ড হয়েছে। আগেও এমন হয়েছে দেশে-দেশে, সুতরাং এটা নজিরবিহীন কিছু নয়। তবে আমেরিকার ঘনিষ্ঠজন বলে পরিচিত মুহাম্মদ ইউনূস, এবং নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের টানাপড়েন, ভিসানীতি-শ্রমনীতি নিয়ে আলোচনার এই সময়ে মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে বিচারিক আদালতের এই রায়ের মূল্যায়ন যুক্তরাষ্ট্র রাজনৈতিকভাবে করে কি-না সেটাই দেখার!



