অস্ট্রেলিয়া সিরিজ মাঠে গড়ানোর আগে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা ওপেনিং জুটি। চোটের কারণে স্কোয়াডের ভারসাম্য কিছুটা নষ্ট হয়েছে বটে। তবে নির্বাচক ও টিম ম্যানেজমেন্টের জন্য তার চেয়েও বড় মাথাব্যথার কারণ ব্যাটিংয়ের শুরুটা। দীর্ঘদিন ধরে টেস্ট ক্রিকেটে উদ্বোধনী জুটির ব্যর্থতা যেন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতায় পরিণত হয়েছে।
২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এমন একটি সফরে অভিজ্ঞ ওপেনিং জুটি নিয়ে নামতে চাইবে যে কোনো দল। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এবারও উদ্বোধনী জুটি নিয়ে নিশ্চিত হতে পারেনি টাইগাররা। দলে থাকা তিন ওপেনার—সাদমান ইসলাম, তানজিদ হাসান তামিম ও সৌম্য সরকার—প্রত্যেকের সামনেই রয়েছে আলাদা প্রশ্ন।
নির্ভরতার জায়গা নেই, শুধু সম্ভাবনার হিসাব
সাদমান ইসলাম বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে অভিজ্ঞ ওপেনার হলেও ধারাবাহিকতা তাঁর বড় সমস্যা। তানজিদ হাসান তামিম এখন পর্যন্ত মাত্র একটি টেস্ট খেলেছেন। অন্যদিকে প্রায় পাঁচ বছর পর টেস্ট দলে ফিরেছেন সৌম্য সরকার, যার ওপর ভরসার বড় কারণ দেশের বাইরে পেস-সহায়ক উইকেটে খেলার কিছু অভিজ্ঞতা।
অর্থাৎ, নিশ্চিত পারফরম্যান্স নয়, সম্ভাবনা আর পরিস্থিতিভিত্তিক হিসাব কষেই ওপেনিং সাজাতে হচ্ছে টিম ম্যানেজমেন্টকে।
পরিসংখ্যানই বলছে সংকট কতটা গভীর
বাংলাদেশের ওপেনিং সংকট নতুন নয়। তবে ওয়ার্ল্ড টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ শুরুর পর থেকে সেটি আরও প্রকট হয়েছে। এই সময়ে বাংলাদেশের কোনো ওপেনার টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে একটি সেঞ্চুরিও করতে পারেননি।
সবশেষ ওপেনার হিসেবে তিন অঙ্ক ছুঁয়েছিলেন জাকির হাসান, প্রায় চার বছর আগে ভারতের বিপক্ষে। এরপর টানা ১৩ ইনিংসে ফিফটি না পাওয়ায় তিনিও এখন জাতীয় দলের বাইরে।
তামিম ইকবালের অবসরের পর সাতজন ভিন্ন ব্যাটারকে ওপেনিংয়ে সুযোগ দিয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু ২১ টেস্টে তাঁদের ব্যাট থেকে আসেনি একটি সেঞ্চুরিও। ফিফটি এসেছে মাত্র ১০টি, যা একই সময়ে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নেওয়া দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন।
মাহমুদুল-সাদমান জুটিও দিতে পারেনি সমাধান
গত দুই বছরে মাহমুদুল হাসান ও সাদমান ইসলামকে নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করার চেষ্টা হয়েছিল। দুজনই আলাদাভাবে সেঞ্চুরি করেছেন—মাহমুদুল আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে এবং সাদমান জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। তবে দুটি ম্যাচই ছিল টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের বাইরে।
সবচেয়ে বড় বিষয়, একসঙ্গে ওপেনিং করা ১০ ইনিংসের একটিতেও এই জুটি পঞ্চাশ রানের উদ্বোধনী জুটি গড়তে পারেনি। পরবর্তীতে মাহমুদুলের ফর্মের অবনতি হওয়ায় অস্ট্রেলিয়া সফরের দল থেকেও বাদ পড়তে হয়েছে তাঁকে।
ওপেনিং ব্যর্থতায় বদলেছে মুখ, বদলায়নি ফল
এনামুল হক, জাকির হাসান, মাহমুদুল হাসান—একে একে অনেকেই সুযোগ পেয়েছেন। কিন্তু কেউই নিজেদের স্থায়ী করতে পারেননি। ২০২৩ সালের শুরু থেকে ওয়ার্ল্ড টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশের উদ্বোধনী জুটির গড় মাত্র ২০.১৭, যা অংশগ্রহণকারী সব দলের মধ্যে সবচেয়ে কম।
এই পরিসংখ্যানই বলে দেয়, ম্যাচের শুরুতেই পিছিয়ে পড়া বাংলাদেশের জন্য প্রায় নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
সামনে আরও কঠিন পরীক্ষা
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এই সংকট আরও বড় হয়ে দেখা দিতে পারে। প্যাট কামিন্স, মিচেল স্টার্ক ও জশ হ্যাজলউডের মতো বিশ্বমানের পেস আক্রমণের সামনে প্রথম এক ঘণ্টা টিকে থাকাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।
যদিও এবার ডারউইনের উইকেট নিয়ে ধারণা, এটি পার্থ বা ব্রিসবেনের মতো অতিরিক্ত গতিময় হবে না। তবুও নতুন বলের বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়ার পেসারদের দক্ষতা বাংলাদেশের উদ্বোধনী ব্যাটারদের কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলবে।
টেস্ট ক্রিকেটে প্রথম এক ঘণ্টাই অনেক সময় ম্যাচের গতিপথ ঠিক করে দেয়। উদ্বোধনী জুটি যদি দলকে শক্ত ভিত এনে দিতে পারে, তাহলে মধ্যক্রমের ব্যাটারদের কাজ অনেক সহজ হয়ে যায়। কিন্তু শুরুতেই উইকেট হারালে পুরো ব্যাটিং লাইনআপ চাপের মুখে পড়ে।
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে কঠিন এই সিরিজে বাংলাদেশের সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করবে ওপেনাররা কতটা দায়িত্ব নিতে পারেন, তার ওপর। দীর্ঘদিনের ব্যর্থতার বৃত্ত ভেঙে যদি এবার ভালো সূচনা এনে দিতে পারেন সাদমান, তানজিদ কিংবা সৌম্য—তবেই হয়তো ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে নতুন ইতিহাস গড়ার স্বপ্নটা বাস্তব রূপ পেতে পারে।




