বঙ্গভবনের পরের বাসিন্দা হিসেবে যেসব নাম আলোচনায় | চ্যানেল আই অনলাইন

বঙ্গভবনের পরের বাসিন্দা হিসেবে যেসব নাম আলোচনায় | চ্যানেল আই অনলাইন

এই খবরটি পডকাস্টে শুনুনঃ

দেশের রাজনীতিতে গত কয়েক দিন আলোচনা ছিল, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন কি সত্যিই পদত্যাগ করছেন? ১৯ জুলাই স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য ব্যাংককে যান স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। কথা ছিল আরও কিছুদিন থাকবেন, কিন্তু দুই দিন আগেই ফিরে এলেন। এই তাড়াহুড়োই গুঞ্জনে আরও হাওয়া দিল। কেউ বললেন, রাষ্ট্রপতি ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের আগেই বিদায়ের ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছেন। কেউ মনে করালেন মে মাসের সেই খবর, ‘লন্ডনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নাকি তিনি ভারতে থাকা শেখ হাসিনার সঙ্গে ফোনে কথা বলেছিলেন’। রাষ্ট্রপতি নিজেও আগে বলেছিলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের আচরণে তিনি অপমানিত বোধ করেছেন।

ছবি: সংগৃহীত

শুক্রবার, ২৪ জুলাই বিকেল ৫টায় স্পিকার সংসদের শপথকক্ষে সংবাদ সম্মেলন ডাকলেন। ততক্ষণে সবাই আঁচ করে ফেলেছে কী ঘটতে যাচ্ছে। স্পিকার হাতে তুলে ধরলেন এক পাতার একটা চিঠি। রাষ্ট্রপতি লিখেছেন, সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী তিনি পদত্যাগ করছেন। বঙ্গভবন খালি। এখন প্রশ্ন একটাই, পরের বাসিন্দা কে? সংসদে বিএনপির একাই আছে ২৪৭টি আসন, মোট ৩৫০ আসনের মধ্যে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন সংসদ সদস্যদের ভোটে, সাধারণ মানুষের সরাসরি ভোটে নয়। ফলে দল যাকে মনোনয়ন দেবে, তার বঙ্গভবনে ওঠাটা শুধু সময়ের ব্যাপার। তাই এখন সবার চোখ বিএনপির স্থায়ী কমিটির দিকে, আর সেই কমিটির কেন্দ্রে থাকা তারেক রহমানের দিকে।

যে নাম সবার আগে

আলোচনায় সবচেয়ে বেশি শোনা যাচ্ছে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম। মির্জা ফখরুলের জন্ম ১৯৪৮ সালে, ঠাকুরগাঁওয়ে। রাজনীতি তার রক্তেই। বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন সংসদ সদস্য, চাচা মির্জা গোলাম হাফিজ ছিলেন জাতীয় সংসদের স্পিকার। ঢাকা কলেজ পেরিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করে ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজে অর্থনীতির অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। জীবন সেখানেই থেমে যেতে পারত। ক্লাসরুম, ছাত্র, নিরিবিলি এক অধ্যাপকের জীবন। কিন্তু ১৯৮৬ সালে তিনি শিক্ষকতা ছেড়ে দিলেন। নেমে পড়লেন রাজনীতির রুক্ষ পথে। ১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান হলেন। ২০০১ সালে সংসদ সদস্য। ধাপে ধাপে দলের ভেতরে গুরুত্বপূর্ণ পদে উঠলেন, একসময় হাতে পেলেন মহাসচিবের দায়িত্ব। এরপর থেকে যা ঘটেছে, সেটাই মির্জা ফখরুলকে খালেদা জিয়ার সবচেয়ে পরীক্ষিত সহযোদ্ধায় পরিণত করেছে। বিএনপির সবচেয়ে অন্ধকার সময়গুলোতে দলের হাল ধরে রেখেছেন তিনি। যখন খালেদা জিয়া কারাবন্দী, তারেক রহমান লন্ডনে, দলের বিরুদ্ধে মামলার পাহাড়, নেতা-কর্মীরা এলাকাছাড়া, তখন এই সাদা চুলের ভদ্রলোকটাই মাঠে দাঁড়িয়ে থেকেছেন। বহুবার জেলে গিয়েছেন। শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। একটা সময় স্ত্রী রাহাত আরা বেগম হাসপাতালে মৃত্যুশয্যায়, তখনো তিনি কারাগারে। নানা চাপ ছিল গত ১৭ বছর তবু দল ছাড়েননি, খালেদা জিয়া তথা বিএনপির প্রতি আনুগত্য থেকে বিন্দুমাত্র সরেননি। দল ও দলের বাইরে দুই জায়গাতেই তার একধরনের গ্রহণযোগ্যতা আছে, যেটা রাজনীতিতে এখন বিরল। মিডিয়া তাকে ভয় পায় না, প্রতিপক্ষ তাকে ঘৃণা করে না, মাঠের কর্মীরা তাকে শ্রদ্ধা করে। এখন তিনি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বেও আছেন। তাই বঙ্গভবনের নতুন বাসিন্দার কথা উঠলে সবার আগে যে নামটা মুখে আসে, সেটা মির্জা ফখরুলেরই।

অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা

তবে রাষ্ট্রপতি বেছে নেওয়ার অভিজ্ঞতা বিএনপির জন্য সবসময় সুখের হয়নি। ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে দল রাষ্ট্রপতি বানিয়েছিল এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে, দলের প্রতিষ্ঠাকালের ঘনিষ্ঠ এক নেতা। কিন্তু বছর না ঘুরতেই সম্পর্কে ফাটল ধরে। অভিযোগ ওঠে, জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীতে তিনি মাজারে যাননি। দলের সংসদ সদস্যরা ক্ষুব্ধ হয়ে পদত্যাগের দাবি তোলেন, ইমপিচমেন্টের হুমকিও দেন। ২০০২ সালের ২১ জুন চাপের মুখে পদ ছাড়েন বি চৌধুরী। এরপর বিএনপি ছেড়ে গড়ে তোলেন নতুন দল বিকল্পধারা, আজীবন থেকে যান প্রতিপক্ষের কাতারে। এর কিছুদিন পরই দল বসায় আরেক অধ্যাপককে, ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ। ২০০৬ সালে বিদায়ী বিএনপি সরকারের পর তিনি রাষ্ট্রপতির পাশাপাশি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্বও কাঁধে নেন। কিন্তু তার একপেশে বিতর্কিত ভূমিকা দেশকে টেনে নেয় ওয়ান-ইলেভেনের দিকে, সেনা-সমর্থিত সরকার ও দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার দিকে। সেই ধাক্কা বিএনপিকেও কম ভোগায়নি। দুই অধ্যাপক, দুই তিক্ত অভিজ্ঞতা। একজন দল ছেড়ে চলে গেলেন, আরেকজনের হাত ধরে এল রাজনৈতিক ঝড়। হয়তো সেই কারণেই এবার বিএনপি আর পরীক্ষা-নিরীক্ষায় যেতে চাইছে না। এবার তারা খুঁজছে এমন কাউকে, যার আনুগত্য নিয়ে প্রশ্ন নেই, যাকে বহুবার আগুনে পুড়িয়ে যাচাই করা হয়ে গেছে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সেই মাপকাঠিতে সবচেয়ে এগিয়ে, তবে স্থায়ী কমিটির আরও কয়েকজন প্রবীণও একই বিবেচনায় আলোচনায় আছেন।

আলোচনায় আরও যারা

খন্দকার মোশাররফ হোসেন: জন্ম ১৯৪৬ সালে, কুমিল্লায়। পেশায় ভূ-তত্ত্ববিদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক। বিএনপি সরকারের আমলে বিদ্যুৎ, স্বরাষ্ট্র ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব সামলেছেন। স্থায়ী কমিটির প্রবীণতম সদস্যদের একজন। আবদুল মঈন খান: জন্ম ১৯৪৭ সালে, নরসিংদীতে। নটর ডেম কলেজ ও যুক্তরাজ্যের সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা। খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভায় তথ্য এবং বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। আন্তর্জাতিক মহলে বিএনপির পরিচিত মুখ। নজরুল ইসলাম খান: জামালপুরে জন্ম। স্থায়ী কমিটির সদস্য, এখন মন্ত্রী পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধানের দায়িত্বও সামলেছেন। গয়েশ্বর চন্দ্র রায়: জন্ম ১৯৫১ সালে, কেরানীগঞ্জে। সাবেক প্রতিমন্ত্রী, স্পষ্টভাষী নেতা হিসেবে পরিচিত। এখন সংসদ সদস্য। হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম: জন্ম ১৯৪৪ সালে। মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বের জন্য বীর বিক্রম খেতাব, তার আগে পাকিস্তান জাতীয় ফুটবল দলেও খেলেছেন। বিএনপি সরকারের আমলে পাট, বাণিজ্য ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন। গত মার্চে ত্রয়োদশ সংসদের স্পিকার নির্বাচিত হন, এখন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে। আলতাফ হোসেন চৌধুরী: বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান। বিমান বাহিনীর সাবেক প্রধান, আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বেও ছিলেন। বিএনপির বাইরেও অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নামও আলোচনায় ছিল, দেশের ২৫তম প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালনকারী সৈয়দ রেফাত আহমেদের নামও আলোচিত হয়েছে। পাশাপাশি আলোচনায় এসেছে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নামও। তবে উনাদের নাম সম্ভাবনার তালিকার একদম শেষের দিকে বলে মনে হচ্ছে।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয় কীভাবে

বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন জাতীয় সংসদের সদস্যদের ভোটে, সাধারণ মানুষ সরাসরি ভোট দেয় না। সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যরাও এই ভোটে অংশ নেন। রাষ্ট্রপতি পদ শূন্য হলে নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণা করে ও পুরো প্রক্রিয়া পরিচালনা করে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এখানে রিটার্নিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করেন। সংসদীয় দলগুলো তাদের প্রার্থী ঠিক করে। প্রার্থী হতে একজন সংসদ সদস্যের প্রস্তাবক ও আরেকজনের সমর্থক লাগে। একজনই প্রার্থী হলে ভোট ছাড়াই তিনি নির্বাচিত ঘোষিত হন। একাধিক প্রার্থী থাকলে সংসদ সদস্যরা গোপন ব্যালটে ভোট দেন, সবচেয়ে বেশি ভোট পাওয়া প্রার্থী জয়ী হন। সংবিধান অনুযায়ী পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে এই নির্বাচন শেষ করতে হয়। এই সময়ে স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। নির্বাচিত রাষ্ট্রপতির মেয়াদ পাঁচ বছর।

অপেক্ষা আর প্রশ্নের উত্তর

সংবিধান বলছে, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা মূলত আনুষ্ঠানিক। প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শেই তাকে বেশিরভাগ সিদ্ধান্ত নিতে হয়। তবু এই পদ ঘিরে এত টান, এত আলোচনা কেন? কারণ দেশের যেকোনো সংকটে বঙ্গভবনের বাসিন্দার ভূমিকা হঠাৎ করেই বড় হয়ে ওঠে। ২০২৪ সালের অগাস্ট আমাদের সেটাই দেখিয়েছে। আইনমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, আগামী সেপ্টেম্বরের সংসদ অধিবেশনেই নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হওয়ার কথা। বিএনপির স্থায়ী কমিটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে, আর সেই কমিটির কেন্দ্রে আছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সংসদে দলের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে তাদের প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়ও নির্বাচিত হতে পারেন। তাই বঙ্গভবনের পরবর্তী বাসিন্দা কে হবেন, সেই উত্তরটা আসলে লেখা আছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ডেস্কে রাখা কাগজে। শুধু নামটা প্রকাশ্যে আসতে যেটুকু বাকি। (এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Scroll to Top