টাঙ্গাইলে নিখোঁজের একদিন পর মাদ্রাসা শিক্ষকের মরদেহ উদ্ধার

টাঙ্গাইলে নিখোঁজের একদিন পর মাদ্রাসা শিক্ষকের মরদেহ উদ্ধার

রাজশাহীর পদ্মা নদীর চরাঞ্চল, যা পদ্মার চর নামে পরিচিত। বছরের আড়াই থেকে তিন মাস পদ্মায় পানি থাকে, বাকি সময় বালুচরে পরিণত হয়। এই সময় চরজুড়ে জীবন-জীবিকা নির্বাহের চিত্র দেখা যায়। যেখানে চরবাসী চাষাবাদ এবং কৃষি কর্মকাণ্ডে নিযুক্ত থাকে।

এই চরাঞ্চলের উর্বর মাটি এবং সহজলভ্য জলাধার কৃষকদের বিভিন্ন ধরনের ফসল চাষে উৎসাহিত করছে, যা তাদের জীবিকা নির্বাহ এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করছে। পদ্মার চর এখন কৃষকদের স্বপ্ন পূরণের এক উর্বর ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।  

পলি মাটি সমৃদ্ধ এই চরে এখন পেঁয়াজ, রসুন, ধান, গম, ভুট্টা, মসুর, মটরশুঁটি, বাঁধাকপি, ফুলকপি, লাউ, টমেটো ও শিম জাতীয় শাক সবজি চাষ হচ্ছে। এতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিকভাবেও উন্নতি হচ্ছে। এক সময়ের ভয়াবহ পদ্মা এখন চরাঞ্চলে কৃষি কর্মকাণ্ডের এক উর্বর ভূমির রূপ নিয়েছে।

এই বালু চরে প্রায় ১৩ ধরনের ফসল হয়। মসুর, গম, সরিষা, বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি ছাড়াও ভুট্টা বোরো ধান, পেঁয়াজের চাষাবাদ হয়। চরের এই মানুষ সাধারণত কৃষি পেশার ওপরে নির্ভরশীল। আর নদীতে পানি থাকলে মাছ ও নৌকা চালিয়ে আয় হয় তাদের। অনেকেই আবার রাজশাহী শহরে বিভিন্ন কাজের সঙ্গে জড়িত হয়েছেন। তারা শহরে বিভিন্ন দোকানে সেল্সম্যানের কাজ করেন। কেউ কেউ ব্যাটারি চালিত রিকশা বা অটোরিকশা চালায়। এছাড়া অনেকেই আবার বিভিন্ন গবাদী পশু পালন করে থাকেন। সেই পশু বিক্রি করে তাদের জীবিকা পরিচালনা করে থাকেন।


সরেজমিনে অনুসন্ধানে দেখা যায়, পদ্মা নদীর মধ্যভাগে চর সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে নদীর জলপ্রবাহ বিভিন্ন দিকে বিভক্ত হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও পানির স্রোত বহমান থাকলেও, অন্যান্য স্থানে বালুর চর প্রসারিত হয়ে আছে। এসব চরে বিভিন্ন ফসলের চাষাবাদ এবং গবাদি পশুর পালন করা হচ্ছে। তবে নদীতে পানির অভাবের কারণে, চরের বাসিন্দারা যাতায়াতের ক্ষেত্রে গুরুতর সমস্যায় পড়েছেন।

চর মাজার দিয়াড় এলাকার নৌকার মাঝি রুমন বলেন, নদীতে পানি কম। পানি কম থাকার কারণে অনেক দূর ঘুরে নৌকা নিয়ে যেতে হয়। এতে সময়ও বেশি লাগে। খরচও বেশি হয়। আগের মতো নৌকায় ইনকাম (উপার্জন) নাই। আগে দিনে চার থেকে পাঁচ বার যাওয়া আসা করতাম। এখন কমে গেছে। রোজা লাগার পরে মানুষ তেমন পারাপার হচ্ছে না। তবে ১৫ রোজা থেকে মানুষ পারাপার বাড়বে। কারণ মানুষ ঈদের বাজার করতে রাজশাহীতে আসবে।

অন্যদিকে, রাজশাহী জেলায় ১৮ হাজার জেলে রয়েছেন, যার মধ্যে পদ্মা নদীতে মাছ ধরা নিয়ে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ১২ হাজার। নদীতে পানির অভাবে এসব জেলেকে জীবিকার অন্যান্য পথ খুঁজতে হচ্ছে। আলী হোসেন, রাজশাহী নগরীর মিজানের মোড়ের এক বাসিন্দা, যিনি পদ্মা নদীতে মাছ ধরে তার জীবিকা নির্বাহ করতেন, এখন পানির অভাবে মাছ ধরতে না পেরে অটোরিকশা চালানোর কাজ করছেন।

মো. সাগর, যিনি প্রায় ২০ বিঘা জমিতে মসুরের চাষ করেছে। তিনি জানান, প্রতি বছর মসুর ডালের পাশাপাশি অন্যান্য ফসলও চাষ করে থাকেন। চরের ফসল চাষে খরচ কম বলে তিনি উল্লেখ করেন। চাষাবাদ প্রক্রিয়া সহজ এবং মাঝে মধ্যে ফসলের যত্ন নিতে হয়। গত বছরের তুলনায় এবার মসুর ডালের ফলন বেশি হয়েছে।

ধানের চাষ করেন নাইমুল ইসলাম। তিনি জানান, প্রতি বছর ধান চাষ করে থাকেন এবং এ বছরও তা অব্যাহত রেখেছেন। তবে, বীজ এবং শ্রমিকের মজুরির দাম বেড়ে যাওয়ায় খরচ বেশি হচ্ছে। উন্নত ফলন পেলে তারা লাভের মুখ দেখতে পাবেন। পদ্মা নদীর পলি মাটিতে ধান চাষ করে তারা ভালো ফলন পেয়ে থাকেন। পদ্মার চরে প্রতি বিঘা ধান চাষে খরচ হয় ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা। ভালো ফলন পেলে বিক্রি করে খরচের টাকা উঠিয়ে সংসারে আর্থিক সচ্ছলতা ফেরানো সম্ভব।


রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর বলছে, রাজশাহীর জেলার আওতায় পদ্মার ১৪টি চর। এ চরের আয়োতন ১৪ হাজার ৮৫৩ হেক্টর। যার মধ্যে আবাদি জমির পরিমাণ ১০ হাজার ১৮৭ হেক্টর। পদ্মার চর এবং তার আশপাশের চরাঞ্চলগুলো রাজশাহী জেলার কৃষি অর্থনীতিতে অপরিহার্য একটি ভূমিকা রাখছে। এই চরাঞ্চলগুলোতে উর্বর জমি এবং আবাদ উপযোগী পরিবেশের সুবাদে বছরভর বিভিন্ন ধরণের ফসল চাষাবাদ হয়। ধান, গম, খেসারি, মরিচ, পেঁয়াজ, বাদাম, তিল, ভুট্টা ইত্যাদি ফসলের চাষ এই এলাকার কৃষকদের জীবিকা নির্বাহে সহায়ক হয়ে উঠেছে।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মোঃ মোজদার হোসেন বলেন, এটি স্পষ্ট যে, চরাঞ্চলগুলোতে কৃষি কার্যক্রম বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বিভিন্ন ফসলের চাষ বেড়েছে। এই এলাকার কৃষকরা বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখেও তাদের কৃষি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন, যা স্থানীয় অর্থনীতি এবং খাদ্য নিরাপত্তা উন্নতিতে অবদান রাখছে।

পদ্মার চর এবং আশপাশের চরাঞ্চলগুলোর বৈশিষ্ট্য হলো, এখানকার জমি উর্বর এবং চাষাবাদে খরচ অপেক্ষাকৃত কম। তবে, যেসব চরে পানি সরবরাহের সুবিধা কম, সেখানে ফসল চাষে খরচ বেশি হয়। নদী ভাঙন এবং নতুন চর সৃষ্টির ফলে জমি-জমা হারানো পরিবারগুলো নতুন চরে চাষাবাদের মাধ্যমে তাদের জীবিকা পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে।

Scroll to Top