টনিক দেয়া ড্রাগনে সয়লাব বরিশালের ফলের বাজার

টনিক দেয়া ড্রাগনে সয়লাব বরিশালের ফলের বাজার

অধিক লাভের আশায় স্বাদ ও পুষ্টিগুনে ভরপুর ফল ড্রাগন এখন পরিণত হয়েছে বিষে। দেশের প্রায় সব স্থানে এই ফলটির চাষ হলেও বরিশালের ফলের আড়তে বেশিরভাগ ড্রাগন ফল আসে রাজধানী থেকে এবং এগুলো উৎপাদন হয় দেশের বিভিন্ন সীমান্তবর্তী এলাকায়। তবে প্রাকৃতিক উপায়ে উৎপাদিত কোন ড্রাগন ফল খুঁজে পওয়া যায়নি বরিশালের ফলের আড়তে।

দামে কম হলেও সব স্থানে বিক্রি হচ্ছে বিষাক্ত টনিক ব্যবহার করে উৎপাদন করা ১ থেকে দেড় কেজি ওজনের এক একটি ড্রাগন ফল। ক্রেতারা না চেনায় আর দামে সস্তা হওয়ায় পকেটের টাকা দিয়ে এখন বিষ কিনে খাচ্ছে বরিশালের ক্রেতারা। বিক্রেতাদের দাবি চাইলেও বিক্রি করতে পারছেন না প্রাকৃতিক উপায়ে উৎপাদিত ড্রাগন ফল। কারণ লাভ বেশি হওয়ায় ও না বোঝা ক্রেতাদের প্রাকৃতিকের থেকে টনিক দেওয়া ড্রাগনের প্রতি আকর্ষণ বেশি থাকায় এখন তারাও বিক্রি করছেন।

চিকিৎসকদের মতে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার বাইরে কৃত্রিমভাবে উৎপাদিত যেকোনো পণ্যেরই স্বাস্থ্য ঝুঁকি থাকে। আর টনিক ব্যবহৃত ড্রাগন মারাত্মক ক্ষতিকর।

কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট জানায়, সম্প্রতি ড্রাগন চাষে টনিক ব্যবহারের বিষয়টি জানতে পেরেছেন তারা। সীমান্ত এলাকার কিছু কৃষক এই টনিক ব্যবহার করছে। এরইমধ্যে ড্রাগন ফলে যে টনিক ব্যবহার করা হচ্ছে সেগুলোর নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এগুলোর রাসায়নিক পরীক্ষা করে দেখা হবে।

টনিক হচ্ছে এক ধরণের হরমোন। এটা গাছে ব্যবহার করলে তার বৃদ্ধি দ্রুত হয়। এই পদ্ধতির ব্যবহার বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট উৎসাহিত করে না। ড্রাগন ফল উৎপাদনের জন্য যে টনিক ব্যবহার করা হচ্ছে তার নাম হচ্ছে জিএ৩ বা জিবারেলিক এসিড থ্রি। এটি মূলত এক ধরণের হরমোন। তবে এটি টনিক নামেই ভারত থেকে বাংলাদেশে আসছে। ‘এটি মূলত গ্রোথ হরমোন। তবে টনিক হিসেবে যেটি ব্যবহার করা হয় সেটিতে হরমোন ছাড়াও এর সঙ্গে আরও কিছু উপাদানও মিশ্রিত করা হয়। এগুলো খুব র‌্যাপিড এক্সপ্যানশন করে ফ্রুটসের। অনেকগুলো বাগানেই এগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে।

সাধারণ ও প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত ড্রাগন ফলের ওজন আড়াই শ’ থেকে সর্বোচ্চ তিন শ’ গ্রাম পর্যন্ত হয়ে থাকে। আর টনিক ব্যবহার করে উৎপাদিত ড্রাগন ফলের ওজন তিন শ’ গ্রাম থেকে শুরু করে নয় শ’ গ্রাম পর্যন্ত হয়ে থাকে। টনিক ব্যবহার করে উৎপাদিত ফলের বাহ্যিক আকার উদ্ভট হয়ে যায়। এই ড্রাগন ফলের রঙ পার্পেল বা লাল রঙ থাকে না। সহজ করে বলতে গেলে, পুরো ফলটি আর এক রঙা থাকে না। পার্পেল বা লাল রঙের সঙ্গে সবুজ রঙের মিশ্রণ থাকে। এক পাশে বা কমপক্ষে এক তৃতীয়াংশ সবুজ থাকে। কারণ পুরো এক রঙের হওয়া পর্যন্ত গাছে রাখা হলে সেটি পঁচে যায়। আর এক সাথে চার-পাঁচদিনের মধ্যে বিক্রি না হলে পুরোটাই হলুদ রঙের হয়ে যাবে। টনিক ব্যবহার করে উৎপাদিত ড্রাগন ফল হবে পানসে। মিষ্টি একেবারেই হবে না। এছাড়া স্বাদেও বেশ ভিন্ন হবে।

বরিশাল নগরীর ফল বিক্রেতা আলম মাজির সঙ্গে বার্তা২৪.কমের কথা হলে জানায়, বরিশালের কোথাও এখন টনিক ছাড়া ড্রাগন পাওয়া যায় না। টনিক দেওয়া ড্রাগনের একটির ওজনই প্রায় কেজির কাছাকাছি বা তার থেকে বেশিও হয়ে থাকে। ২০০ থেকে ২৫০ টাকা কেজি দরে এগুলো বিক্রি হয়। আর প্রকৃতিক উপায়ে উৎপদিত ড্রাগনের একটির ওজন হবে সর্বোচ্চ ৩০০ গ্রাম এবং দামও হবে কমপক্ষে ৪০০ টাকা কেজি। বেশিরভাগ ক্রেতারাই আসল ও নকলের পার্থক্য বোঝে না। দাম কম হলেই কিনে নেয়। অনেক ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক না নিয়ে বেছে নেয় কম দামের টনিক ব্যবহৃত ড্রাগন ফল।

টনিক ব্যবহৃত ড্রাগনের স্বাস্থ্য ঝুঁকির বিষয়ে শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. সাইফুল ইসলাম বার্তা২৪.কম-কে বলেন, স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার বাইরে কৃত্রিমভাবে উৎপাদিত যেকোনো পণ্যেরই স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকে। যদিও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বিভিন্ন রাসায়নিক নিরাপদ উপায়ে ব্যবহারের মাত্রা ঠিক করে দেয়। কিন্তু বাংলাদেশে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটা মানা হয় না। বেশি পরিমাণে হরমোন বা রাসায়নিক ব্যবহার করা হলে তা স্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। অতি দ্রুত এমন ফলের উৎপাদন বিক্রয় ও বাজারজাত করণ বন্ধে পদক্ষেপ গ্রহণ প্রযোজন বলে জানান তিনি।

Scroll to Top