জোহরান মামদানির ২১ মিনিটের বিশ্বজনীন বার্তা | চ্যানেল আই অনলাইন

জোহরান মামদানির ২১ মিনিটের বিশ্বজনীন বার্তা | চ্যানেল আই অনলাইন

এই খবরটি পডকাস্টে শুনুনঃ

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সিটির মেয়র নির্বাচনে ঐতিহাসিক জয় পেয়েছেন জোহরান মামদানি। এক মিলিয়ন ভোটে পরাজিত করেছেন নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের সাবেক গভর্নর অ্যান্ড্রু কুওমোকে। বিজয়ের পর দেওয়া মাত্র ২১ মিনিটের ভাষণে পুরো শহরকে আর সাথে সাথে বিশ্বের লাখ লাখ মানুষকে—আশা, শক্তি এবং পরিবর্তনের বার্তা দিলেন।

স্থানীয় সময় ৫ নভেম্বর মঙ্গলবার এক মিলিয়ন ভোটের জয়ের আনন্দঘন মুহূর্তে তার ভাষণ শুধু স্থানীয় রাজনীতিতে নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মানুষের অধিকার, শ্রমজীবী জনগণের মর্যাদা এবং অভিবাসীদের ক্ষমতায়নের প্রতীক হয়ে উঠেছে। এই সংক্ষিপ্ত কিন্তু গভীর বক্তৃতা প্রমাণ করে, কেবল কথায় নয়—কর্ম ও সংকল্পের মিলিত শক্তিই বিশ্বের রাজনীতি কাঁপাতে পারে।

বিজয়ের পর দেওয়া ভাষণে মামদানি বলেন, নিউইয়র্ক থাকবে অভিবাসীদের শহর—অভিবাসীদের হাতে গড়া, তাদের শ্রমে চালিত এবং আজ থেকে অভিবাসীর নেতৃত্বে পরিচালিত। আগামী ১ জানুয়ারি তিনি নিউইয়র্ক সিটির মেয়র হিসেবে শপথ নেবেন এবং এই জয় সম্ভব হয়েছে শহরের শ্রমজীবী ও তরুণ প্রজন্মের সাহসী অংশগ্রহণের কারণে।

মামদানি ২০২১ সালে ২৫ হাজারেরও বেশি ট্যাক্সিচালকের আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। তারা ঋণদাতাদের কঠোর শর্তের বিরুদ্ধে অনশন ধর্মঘট করেছিলেন। ভাষণে তিনি শহরের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন ইয়েমেনি দোকান মালিক, মেক্সিকান দাদি, সেনেগালিজ ট্যাক্সিচালক, উজবেক নার্স, ত্রিনিদাদীয় রাঁধুনি এবং ইথিওপিয়ান আন্টিদের কথা। মামদানি বলেন, আমরা তোমাদেরই অংশ, তোমাদের সঙ্গেই আছি।

জোহরান মামদানির বিজয় ভাষণের মুহূর্তে জনতার উল্লাস

তার নির্বাচনী অঙ্গীকারগুলোর মধ্যে ছিল এক মিলিয়ন বাসায় ভাড়া ফ্রিজ করা, নিউইয়র্ক স্টেটে কর্পোরেট ট্যাক্স বাড়িয়ে ১১ দশমিক ৫ শতাংশ করা, যা বছরে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব আনার আশা করা হয়। এছাড়া তিনি প্রস্তাব দেন ১ মিলিয়নের বেশি আয়কারীদের ওপর ২ শতাংশ সারচার্জ আর শহরের বাস বিনামূল্যে করা। এই প্রস্তাবগুলো তরুণ ও শ্রমজীবী জনগণের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনা সৃষ্টি করে।

নির্বাচনের সময় ২৬ জন মার্কিন বিলিয়নিয়ার মামদানিকে পরাজিত করতে ২২ মিলিয়ন ডলার খরচ করেছিলেন। কিন্তু অর্থের প্রভাবকে ছাপিয়ে যায় মানুষের অংশগ্রহণ ও উচ্ছ্বাস। মামদানি বলেন, আমরা জিতেছি, কারণ নিউইয়র্কবাসী সাহস করেছে বিশ্বাস করতে—অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়। শহরের মানুষ দীর্ঘ সময় ধরে শ্বাস আটকে রেখেছিল। আজ সেই নিঃশ্বাস নেওয়া সম্ভব হয়েছে। তিনি স্বেচ্ছাসেবীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন যারা এক লাখেরও বেশি স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে প্রচারযাত্রাকে অপ্রতিরোধ্য করে তুলেছেন।

মামদানি ঘোষণা দেন, আগামীতে তিনি এমন এক নিউইয়র্ক গড়বেন যেখানে ভাড়া স্থির থাকবে, বাস দ্রুত ও বিনামূল্যে চলবে এবং শিশুদের সার্বজনীন চাইল্ডকেয়ার নিশ্চিত করা হবে। তিনি বলেন, এই নতুন যুগে সরকারের অজুহাত নয়, কর্মকেই প্রধান করে দেখা হবে। হাজারও শিক্ষক নিয়োগ করা হবে, প্রশাসনিক অপচয় কমানো হবে এবং এনওয়াইসিএইচএ-র অন্ধকার করিডোরে আবার আলো জ্বালানো হবে।

মামদানি বিশেষভাবে সংখ্যালঘু ও অভিবাসী জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা নিশ্চিত করার কথা বলেন। তিনি বলেন, শহর ইহুদি জনগণের পাশে থাকবে এবং অ্যান্টি-সেমিটিজমের বিরুদ্ধে দৃঢ় থাকবে। একইসঙ্গে ১০ লাখের বেশি মুসলমান জানবেন, তারা শহরের ক্ষমতার অংশ। তিনি সতর্ক করেন, আর কখনো ইসলামবিদ্বেষ ছড়িয়ে এই শহরে নির্বাচন জেতা যাবে না।

আশা, শক্তি এবং পরিবর্তনের বার্তা দিলেন জোহরান মামদানি

ভাষণে তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে বলেন, আমরা তোমার মতো ধনকুবেরদের আর কর ফাঁকি দিতে দেব না। তোমার মতো বাড়িওয়ালারা আর ভাড়াটিয়াদের শোষণ করতে পারবে না। আমাদের শহরই দেখাবে কিভাবে তোমাকে পরাজিত করা যায়।

ভাষণের শেষভাগে মামদানি বলেন, তিনি তরুণ, মুসলিম এবং একজন ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট—এবং এর কোনো কিছুর জন্য ক্ষমা চাইবেন না। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, প্রতিটি ভাড়া-নির্ধারিত বাসিন্দা, প্রতিটি দাদা-দাদী, প্রতিটি মা যখন নিরাপদে ও সুষ্ঠুভাবে জীবনযাপন করবে, তখন বোঝা যাবে এই শহর তার মানুষকে ভালোবাসতে শিখেছে।

মামদানি সকল নিউইয়র্কবাসীর উদ্দেশ্যে বলেন, একসঙ্গে আমরা ভাড়া স্থির করব, বাস বিনামূল্যে করব, শিশুদের যত্ন নিশ্চিত করব। এই শহর তোমাদের, এই ক্ষমতাও তোমাদের।

২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি তিনি শপথ নেবেন। মূল পরীক্ষা শুরু হবে তখনই—যখন বিলিয়নিয়ার স্বার্থগোষ্ঠী, প্রশাসনিক কাঠামো এবং ওয়াশিংটনের চাপের মুখে তাকে তার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে হবে। জোহরান মামদানির বিজয় ধনকুবেরতন্ত্র ও ডানপন্থার বিরুদ্ধে জনগণের শক্তিশালী বার্তা হিসেবে প্রতিফলিত হচ্ছে। বিজয় শুধু শব্দ নয়, বাস্তব কর্মের মাধ্যমে প্রমাণ করা হবে, তিনি কি সত্যিই নিউইয়র্ককে নতুন পথে নেতৃত্ব দিতে পারবেন।

Scroll to Top