জুলাইয়ের চেতনা কি পৌঁছেছে কারখানা ও শ্রমবাজারে? | চ্যানেল আই অনলাইন

জুলাইয়ের চেতনা কি পৌঁছেছে কারখানা ও শ্রমবাজারে? | চ্যানেল আই অনলাইন

রাশেদা বেগম গাজীপুরের একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন। জুলাইয়ের আন্দোলনের সময় কয়েকদিন কারখানা বন্ধ ছিল। তিনি আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন, কিন্তু এতে তার আয় কমে যায়।

বর্তমানে মাসিক বেতন বেড়েছে সামান্য। কিন্তু বাসাভাড়া ও নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে দ্বিগুণের কাছাকাছি। ওভারটাইম ছাড়া সংসার চালানো কঠিন বলে জানালেন তিনি। রাশেদার ভাষায়, “আন্দোলনের সময় মনে হয়েছিল কিছু একটা বদলাবে, এখনো সেই অপেক্ষাতেই আছি।”

জলিল মিয়া রাজধানীতে রিকশা চালান। আন্দোলনের সময় রাস্তায় অস্থিরতার কারণে আয় প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে প্রতিদিনের আয় অনিশ্চিত। জ্বালানি ও খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধিতে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে, নেই কোনো সামাজিক নিরাপত্তা। তার কথায়, “দিনে যা আয় করি, সেদিনই শেষ। ভবিষ্যৎ বলতে কিছু নেই।”

সোহেল নারায়ণগঞ্জের একজন দৈনিক মজুরিভিত্তিক নির্মাণশ্রমিক। আন্দোলনের সময় কাজ বন্ধ থাকায় কয়েক সপ্তাহ বেকার ছিলেন। বর্তমানে কাজের সুযোগ অনিয়মিত, দৈনিক মজুরি কিছুটা বেড়েছে, কিন্তু কাজ কম, দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকলেও কোনো বীমা নেই। তিনি চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, মজুরি বাড়লেও কাজ না থাকলে লাভ কী?

জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান—বঞ্চনা, বৈষম্য ও অধিকারহীনতার বিরুদ্ধে এক বিস্ফোরিত জনরোষ—দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে নতুন এক প্রত্যাশার জন্ম দিয়েছিল। সেই প্রত্যাশার বড় অংশজুড়ে ছিল শ্রমজীবী মানুষ। আজ আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস-এ প্রশ্ন উঠছে আন্দোলনের পর বাস্তবে কতটা বদলেছে তাদের জীবন? জুলাইয়ের চেতনা কি সত্যিই পৌঁছেছে কারখানা ও শ্রমবাজারে?

বিশ্লেষকদের মতে, এই শ্রেণির মানুষ আন্দোলনের ‘সংগঠিত শক্তি’ না হলেও ‘প্রভাবশালী চাপ’ হিসেবে কাজ করেছে। তারা বলছেন, জুলাইয়ের আন্দোলনে শ্রমজীবী মানুষের অংশগ্রহণ ছিল নীরব কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ। শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, পরিবহন খাতে অচলাবস্থা—এসবই আন্দোলনের গতি বাড়াতে ভূমিকা রাখে।

গার্মেন্টস ও শিল্পখাতের শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কিছু ক্ষেত্রে পরিবর্তনের আভাস মিললেও তা এখনও সীমিত।

কিছু কারখানায় মজুরি সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে, কর্মপরিবেশে কিছু উন্নয়ন হয়েছে। পাশাপাশি শ্রমিকদের সঙ্গে মালিকপক্ষের সংলাপ বেড়েছে।

তবে অনেক শ্রমিকই বলছেন, এই পরিবর্তনগুলো টেকসই নয়। একজন পোশাকশ্রমিকের ভাষায়, “কিছুদিন একটু ভালো থাকে, তারপর আবার আগের মতো হয়ে যায়।”

আইন অনুযায়ী শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার অধিকার থাকলেও, বাস্তবে তা এখনও সীমাবদ্ধ। ট্রেড ইউনিয়ন গঠন ও কার্যক্রম পরিচালনায় নানা প্রতিবন্ধকতার অভিযোগ রয়েছে।

শ্রমিকের অধিকার ও পেশাগত নিরাপত্তার গুরুত্ব বিবেচনায় দিবসের এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘সুস্থ শ্রমিক, কর্মঠ হাত; আসবে এবার নব প্রভাত’।

জুলাই আন্দোলনের পেছনে নীরব কিন্তু শক্তিশালী একটি স্তম্ভ ছিল শ্রমজীবী মানুষ—কারখানার শ্রমিক, রিকশাচালক, দিনমজুর, পরিবহনকর্মী। আন্দোলনে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে শ্রমজীবী মানুষের অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখযোগ্য। শিল্পাঞ্চলে কর্মবিরতি, পরিবহন খাতে অঘোষিত ধর্মঘট, এমনকি বিভিন্ন স্থানে শ্রমিকদের মিছিল—সব মিলিয়ে আন্দোলনের গতি ত্বরান্বিত হয়।

নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, শ্রমিকরা আন্দোলন করেছেন, এটা সত্য একটা গণতান্ত্রিক আন্দোলন আমাদের এগিয়ে নিয়েছে। কিন্তু শ্রমিকদের জাগরণ হবে, তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় শ্রমিকবান্ধব সরকার হবে। এটা কি আশা করা যায়?

মান্না বলেন, শ্রমিকদের দাবি নিয়ে ত্রয়োদশ সংসদে কোনো কথা হয়েছে, মানুষের অর্থনৈতিক দুর্দশা নিয়ে কোনো কথা হয়েছে? সরকার যদি সত্যিকারের কল্যাণ রাষ্ট্র গড়তে চায়, তাহলে শুধু কার্ড বিতরণ করলেই হবে না, বরং মানুষকে বাস্তব ও দৃশ্যমান সুফল দেয়—এমন কিছু করতে হবে।

শ্রমিকদের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করার দিন ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস’

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নিহত ও আহতদের মধ্যে প্রায় অর্ধেক মানুষ শ্রমজীবী। শেখ হাসিনার পদত্যাগ এবং দেশত্যাগের মধ্য দিয়ে ১৫ বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসনের পতন হয়। নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। কিন্তু গণঅভ্যুত্থানের আলোয় শ্রমিকের জীবন কতটুকু বদলেছে?

আন্দোলনের পরপরই প্রায় ১৪০টি কারখানা বন্ধ হয়ে যায়, আনুমানিক ১ লাখ ৩০ হাজার পোশাকশ্রমিক যাদের বেশিরভাগই নারী, হঠাৎ কর্মহীন হয়ে পড়েন। অনেক কারখানা মালিক যারা বিগত সরকারের ঘনিষ্ঠ ছিলেন তারা শ্রমিকদের বেতন না দিয়েই দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, শ্রমিকের অধিকারকে উপেক্ষা করে বাংলাদেশে ভবিষ্যতের রাজনীতি টেকসই হতে পারে না। যারা মানবাধিকার নিয়ে কাজ করেন, তাদের অনেকেই শ্রমিক অধিকারকে সেই বৃহত্তর কাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করেন না। এর ফলে শ্রমিকদের সমস্যা প্রায়ই আলাদা খাতে পড়ে থাকে এবং যথাযথ গুরুত্ব পায় না।

বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান বলেন, আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো শ্রমিকদের রাজনৈতিক একটা অংশ মনে করে। এই শ্রমিকদের সমস্যা সমাধানে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যমত ও সদিচ্ছা দরকার। কিন্তু এগুলো আমরা এখনো পাচ্ছি না। শুধু কাগজে কলমে, আইনে ও মানবাধিকারে সবকিছু থাকলেও শ্রমিকরা কোনো সুযোগ সুবিধা পান না। শ্রমিকদের কোনো আইনি সুরক্ষা নেই। প্রতিনিয়ত শ্রমিক অধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে।

হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)-এর তথ্য-বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ২০২৫ সালে মোট ২৬০টি ঘটনায় ৯৬ জন নিহত, এক হাজার ২১ জন আহত এবং ১৬৮ জন কর্মক্ষেত্রে মারা যান। উদ্বেগজনকভাবে, ২০২৬ সালের মাত্র প্রথম তিন মাসেই ১৩৯ ঘটনায় নিহত ৩০ এবং আহত ৫৭৩। চলতি বছরের মার্চ মাসে ৭৭টি ঘটনায় ১৭৬ জন আহত, ১৯ জন নিহত ও কর্মক্ষেত্রে ৩৮ জনের মৃত্যু হয়।

মানবাধিকারকর্মী নূর খান বলেন, শ্রমিক ও মালিকের মধ্যে বিদ্যমান আকাশচুম্বী বৈষম্য রয়েছে। মালিকেরা চিকিৎসার জন্য কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে বিদেশে চলে যান। কিন্তু একজন শ্রমিক ঢাকা মেডিকেলেও চিকিৎসার সুযোগ পান না।

জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান যে আশা তৈরি করেছিল, তার কিছু প্রতিফলন দেখা গেলেও তা এখনও সীমিত এবং অসম। কারখানা ও শ্রমবাজারের বড় অংশে সেই চেতনা পুরোপুরি পৌঁছায়নি। শ্রম বিশ্লেষকরা বলছেন, জুলাইয়ের চেতনা বাস্তবায়নের জন্য শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার।

Scroll to Top