জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন টকশো ‘তৃতীয় মাত্রা’র উপস্থাপক ও সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) নির্বাহী পরিচালক জিল্লুর রহমানের স্ত্রী ফাহমিদা হক। এই মনোনয়নকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সাংবাদিক ও রাজনীতিক দম্পতি কী নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে স্বকীয়তা বজায় রাখতে পারবেন নাকি একজনের প্রভাবে অন্য জন্য প্রভাবিত হবেন?
এমন প্রেক্ষাপটে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন জিল্লুর রহমান। তিনি বলেন, স্ত্রীর রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে তার পেশাগত অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আসবে না।
বাংলাদেশে গণমাধ্যম ও রাজনীতির ভিন্ন ভিন্ন অঙ্গনে একই পরিবারের সদস্যদের সক্রিয় থাকার উদাহরণ নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে এমন একাধিক দম্পতির উপস্থিতি আলোচনায় এসেছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ মতিয়া চৌধুরী ও তার স্বামী প্রখ্যাত সাংবাদিক বজলুর রহমান। মতিয়া চৌধুরী ছিলেন দেশের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ এবং সংসদ উপনেতা, অন্যদিকে বজলুর রহমান ছিলেন দৈনিক দৈনিক সংবাদ-এর সম্পাদক। দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সাংবাদিক জীবনের এই দুই ধারা একই পরিবারে মিলিত হলেও দুই ক্ষেত্রেই তাদের আলাদা পরিচিতি ছিল।
আরেক আলোচিত দম্পতি নঈম নিজাম ও ফরিদা ইয়াসমিন। নঈম নিজাম দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন-এর সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, আর ফরিদা ইয়াসমিন ছিলেন সাংবাদিক ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি। পরে তিনি সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে সংসদ সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। সাংবাদিকতা ও রাজনীতির দুই ভিন্ন অঙ্গনে তাদের সক্রিয় উপস্থিতি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
একইভাবে মোজাম্মেল হক বাবু ও অপরাজিতা হক দম্পতি গণমাধ্যম ও রাজনীতির সম্পর্কের আরেকটি উদাহরণ। মোজাম্মেল হক বাবু ছিলেন টেলিভিশন সাংবাদিকতা ও টকশো অঙ্গনের পরিচিত মুখ, আর অপরাজিতা হক সংরক্ষিত নারী আসনে সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
আন্তর্জাতিক পরিসরেও সাংবাদিকতা অথবা বিপরীত মেরুর রাজনীতি ভিন্ন ভিন্ন অঙ্গনে একই পরিবারের সদস্যদের সক্রিয় থাকার একাধিক নজির রয়েছে। এসব উদাহরণ অনেক সময় গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং ব্যক্তিগত পেশাগত সীমারেখা নিয়ে আলোচনার জন্ম দেয়।
যুক্তরাষ্ট্রে মেরি ম্যাটালিন ও জেমস কারভিল সবচেয়ে আলোচিত রাজনৈতিক দম্পতিদের একটি উদাহরণ। মেরি ম্যাটালিন রিপাবলিকান পার্টির কৌশলবিদ হিসেবে প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ. ডব্লিউ. বুশ প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করেন। অন্যদিকে জেমস কারভিল ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রভাবশালী কৌশলবিদ, যিনি ১৯৯২ সালের বিল ক্লিনটনের নির্বাচনী বিজয়ের মূল স্থপতিদের একজন হিসেবে পরিচিত। ভিন্ন রাজনৈতিক শিবিরে কাজ করা সত্ত্বেও তাদের দাম্পত্য সম্পর্ক যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রায়ই আলোচিত হয়।
যুক্তরাষ্ট্রেই ক্রিশ্চিয়ান আমানপোর ও জেমস রুবিন দম্পতিও গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি উদাহরণ বলা যেতে পারে। ক্রিশ্চিয়ান আমানপোর আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতায় বিশেষ করে যুদ্ধ, মানবাধিকার ও বৈশ্বিক সংকট নিয়ে রিপোর্টিংয়ের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। তার স্বামী জেমস রুবিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের সাবেক কর্মকর্তা এবং কূটনীতিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এই সম্পর্ককে অনেকেই সাংবাদিকতা ও রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণ কাঠামোর ঘনিষ্ঠ সংযোগের উদাহরণ হিসেবে দেখেন।
যুক্তরাজ্যে সারা ভাইন ও মাইকেল গোভ দম্পতি গণমাধ্যম এবং রাজনীতির পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনায় আসেন। সারা ভাইন ব্রিটিশ মিডিয়ায় রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয় নিয়ে কলাম লেখার জন্য পরিচিত ছিলেন। অন্যদিকে মাইকেল গোভ যুক্তরাজ্যের কনজারভেটিভ পার্টির শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিবিদ। যিনি শিক্ষা, বিচার ও পরিবেশসহ একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন। তাদের সম্পর্ক ভেঙে গেলেও দীর্ঘ সময় ধরে এটি ব্রিটিশ মিডিয়া ও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার বিষয় ছিল।
একক ব্যক্তি হিসেবে ভারতে সাগরিকা ঘোষ সাংবাদিকতা থেকে সরাসরি রাজনীতিতে প্রবেশের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। তিনি দীর্ঘদিন টেলিভিশন সাংবাদিকতা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণধর্মী অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি ভারতের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভা-এর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ভিন্ন ভিন্ন ভূমিকায় পেশাগত স্বকীয়তা ধরে রেখেছেন।
সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে এসব উদাহরণ দেখায় যে সাংবাদিকতা ও রাজনীতি অনেক সময় একই পারিবারিক পরিসরে অবস্থান করলেও পেশাগতভাবে দুটি আলাদা ও সংবেদনশীল ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হয়ে থেকেছে।







