জাতীয় দলের পাইপলাইন শক্ত করার প্রক্রিয়ায় বিসিবির বাড়তি মনোযোগ – Sarabangla

জাতীয় দলের পাইপলাইন শক্ত করার প্রক্রিয়ায় বিসিবির বাড়তি মনোযোগ – Sarabangla

বলা হয়ে থাকে, আধুনিক ক্রিকেটে যে দলের পাইপলাইন যত বেশি শক্ত সেই দল ততো ধারাবাহিক। আর এই পাইপলাইন শক্ত হয় আসলে ঘরোয়া ক্রিকেটের ভিত্তির ওপর। শুধু পাইপলাইন শক্ত করাতে নয় বরং ঘরোয়া ক্রিকেট কাঠামোর ওপর আসলে একটি দেশের পুরো ক্রিকেটই নির্ভর করে। ঘরোয়া ক্রিকেট মানসম্পন্ন হলে তবেই জাতীয় দলের জন্য মানসম্পন্ন ক্রিকেটার উঠে আসে। বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেট নিয়ে আক্ষেপ বহু পুরনো। ক্রিকেটের মান, প্রতিদ্বন্দ্বীতা, উইকেট, আম্পায়ারিং কিংবা বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা, বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে সকল কিছু নিয়েই আছে দীর্ঘ আক্ষেপ। এই আক্ষেপ দূর করার দিকে মনোযোগ তামিম ইকবালের নেতৃত্বে বর্তমান বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) নতুন কমিটির। নিয়মিত ক্রিকেট হওয়া, বেশি ক্রিকেটারদের খেলার সুযোগ করে দেওয়া, প্রতিযোগিতার মান বাড়ানো, আম্পায়ারিং নিয়ে জবাবদিহিতা, বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতকরণ এবং ঘরোয়া ক্রিকেটকে পুরোপুরি পেশাদার করে তোলার কাজ করে যাচ্ছে নতুন বোর্ড।

শুধু ঘরোয়া টুর্নামেন্টের সংখ্যা বাড়ানো নয়; বরং এমন একটি ধারাবাহিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখান থেকে নিয়মিত উঠে আসবে জাতীয় দলের উপযোগী ক্রিকেটার। সেই লক্ষ্য সামনে রেখে বিসিবি বেশ কিছু উদ্যোগ হাতে নিয়েছে।

১. ডমেস্ট্রিক থ্রি: তিন সংস্করণে খেলার সুযোগ

ঘরোয়া ক্রিকেটকে ঢেলে সাজানোর প্রক্রিয়া হিসেবে ডমেস্ট্রিক ‘থ্রি’ টুর্নামেন্ট চালুর ঘোষণা দিয়েছে বিসিবি। এই প্রক্রিয়ায় তিনটি সংস্করণেই সারাবছর ক্রিকেট চলবে বলে জানিয়েছে বিসিবি। ছয়টি দলের এই টুর্নামেন্টে চার দিনের, ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি—তিন সংস্করণকে একই কাঠামোয় আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। অর্থাৎ একটি দল চার দিনের, ওয়ানডে এবং টি-টোয়েন্টি তিন সংস্করণের ম্যাচই খেলবে। প্রতিটি দলকে সেভাবেই ক্রিকেটদের বাছাই করে চুক্তি করতে হবে। এসেক্ষেত্রে বেশিসংখ্যাক ক্রিকেটার খেলার মধ্যে থাকবে বলে প্রত্যাশা বিসিবি।

সম্প্রতি রাজধানীর একটি হোটেলে জমকালোভাবে নতুন এই টুর্নামেন্টের ঘোষণা দেওয়া হয়। বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল বলেছিলেন, ‘আগে ঘরোয়া ক্রিকেটকে অনেকে বলতেন ‘পিকনিক’। যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বীতাপূর্ণ ক্রিকেট হতো না। সেটা এখন আর থাকবে না। ঘরোয়া ক্রিকেট এখন প্রতিদ্বন্দ্বীতাপূর্ণ হবে। তা নিশ্চিত করবে বিসিবি।’

২। দ্বিতীয় একাদশ: জাতীয় দলের পাইপলাইন বড় করার চেষ্টা

ঘরোয়া ক্রিকেটের প্রচলিত কাঠামোয় জাতীয় দল, বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) এবং প্রথম সারির প্রতিযোগিতায় খেলা ক্রিকেটারদের সুযোগ-সুবিধা তুলনামূলক বেশি। অন্যদিকে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় বিভাগে খেলা অনেক প্রতিভাবান ক্রিকেটারকে একটি প্রতিযোগিতা শেষ হলে পরবর্তী প্রতিযোগিতা শুরু হওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হয় দীর্ঘ সময়।

এই ব্যবধান কমাতে ন্যাশনাল ক্রিকেট লিগের (এনসিএল) দ্বিতীয় একাদশের প্রতিযোগিতা চালু করেছে বিসিবি। এতে প্রথম একাদশে সুযোগ না পাওয়া ক্রিকেটারদের নিয়ে আলাদা টুর্নামেন্ট হচ্ছে। যাতে দ্বিতীয় সারির ক্রিকেটাররাও খেলার মধ্যে থাকতে পারছেন এবং পরের ধাপে উঠে আসার প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকতে পারছেন। নতুন বোর্ডের পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, জাতীয় দলের বাইরের ক্রিকেটারদেরও নিয়মিত ম্যাচের মধ্যে রাখা। এতে প্রতিভা মূল্যায়নের পরিধি বাড়বে এবং বিকল্প খেলোয়াড়ের সংকট কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।

৩. আম্পায়ারিংয়ে স্বচ্ছতা

বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে বিতর্কিত আম্পায়ারিং এবং ম্যাচে পক্ষপাতমূলক সিদ্ধান্ত অনেকটা ওপেন সিক্রেট। এই জায়গায় জবাবদিহিতা আনছে তামিম ইকবালের বোর্ড। আম্পায়ারিং যাতে স্বচ্ছ হয় সেটা নিশ্চিত করতে চায় বিসিবি। মানসম্পন্ন ক্রিকেটার তৈরির জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ পরিবেশ যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন নিরপেক্ষ আম্পায়ারিংও।

আম্পায়ারদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, পারফরম্যান্স মূল্যায়ন এবং অভিযোগ তদন্তের কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে বিসিবি। আম্পায়ারদের ভুল সিদ্ধান্তের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে নীতিমালারও করা হচ্ছে।

৪. ক্রিকেটারদের আর্থিক নিরাপত্তা ও পেশাদার পরিবেশ

ক্রিকেটাররা যাতে নির্ভার থাকতে পারেন সেই উদ্যোগও নিয়েছে বোর্ড। তামিম ইকবালের নতুন বোর্ড দায়িত্ব নেওয়ার পর ঘরোয়া ক্রিকেটারদের বেতন ও ম্যাচ ফি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়িয়েছে। পাশাপাশি কোচ, আম্পায়ার, স্কোরার ও অন্যান্য ক্রিকেটসংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের পারিশ্রমিক কাঠামো পর্যালোচনার কথাও জানিয়েছে বোর্ড। সঙ্গে অনুশীলনের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ রাখা, ফিটনেস ঠিক রাখা, পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিতকরণসহ নানান উদ্যোগ নিয়েছে বোর্ড। এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ক্রিকেটারদের খেলায় মনোযোগ ধরে রাখা সহজ হবে বলে প্রত্যাশা বিসিবির।

এখন বিসিবির জন্য চ্যালেঞ্জ উদ্যোগগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি রূপ দেওয়া। দ্বিতীয় একাদশ ও ডি-৩ টুর্নামেন্ট থেকে নিয়মিত ক্রিকেট তুলে আনতে হলে উদ্যোগগুলো দীর্ঘমেয়াদী হওয়া জরুরী। দেশের ঘরোয়া ক্রিকেট শক্তিশালী হলে জাতীয় দলও উপকৃত হবে—তবে পরিবর্তনের ফল এক মৌসুমেই পাওয়া যাবে না। প্রতিযোগিতার মান বাড়ানো, খেলোয়াড় তৈরির কার্যকারী প্রক্রিয়া, পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা, জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা ধারাবাহিকভাবে নিশ্চিত করতে পারলে কার্যকর খেলোয়াড় উঠে আসবে নিশ্চিয়। বিসিবি এসব উদ্যোগে কতটা ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারে সেটাই এখন দেখার।

Scroll to Top