মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে গণহত্যা চালানোর অভিযোগে দায়ের করা একটি ঐতিহাসিক মামলার শুনানি শুরু হয়েছে জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালত আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে)। এক দশকেরও বেশি সময় পর আইসিজেতে পূর্ণাঙ্গভাবে গৃহীত এটিই প্রথম কোনো গণহত্যা মামলা।
গতকাল সোমবার (১১ জানুয়ারি) নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে অবস্থিত আইসিজেতে মামলার শুনানি শুরু হয়। টানা তিন সপ্তাহ ধরে চলবে এই শুনানি। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই মামলার রায় শুধু মিয়ানমারের ক্ষেত্রেই নয়, গাজায় ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার করা গণহত্যা-সংক্রান্ত আবেদনের ওপরও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৯ সালে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে এই মামলা দায়ের করে। এর দুই বছর আগে, ২০১৭ সালে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর অভিযানে প্রায় সাত লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা নিজ দেশ ছেড়ে পালিয়ে প্রতিবেশী বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। সে সময় শরণার্থীরা গণহত্যা, ধর্ষণ ও গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়ার মতো ভয়াবহ নির্যাতনের বর্ণনা দিয়েছিলেন।
তৎকালীন জাতিসংঘের একটি অনুসন্ধানী মিশন জানায়, ২০১৭ সালের ওই সামরিক অভিযানে ‘গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ড’ সংঘটিত হয়েছে। তবে মিয়ানমার সরকার এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে দাবি করে, এটি ছিল কথিত রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলার জবাবে পরিচালিত একটি বৈধ সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান।
জাতিসংঘের মিয়ানমার বিষয়ক স্বাধীন তদন্ত ব্যবস্থার প্রধান নিকোলাস কুমজিয়ান সে সময় রয়টার্সকে বলেন, এই মামলা গণহত্যার সংজ্ঞা, প্রমাণের ধরন এবং অপরাধের প্রতিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।
নতুন আশার সঞ্চার
বাংলাদেশের কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীরা এই মামলার মাধ্যমে ন্যায়বিচার পাওয়ার আশা প্রকাশ করেছেন।
দুই সন্তানের জননী, ৩৭ বছর বয়সী জানিফা বেগম বলেন, “আমরা ন্যায়বিচার ও শান্তি চাই। সেনাবাহিনীর অভিযানের সময় আমাদের নারীদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়েছে। গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, পুরুষদের হত্যা করা হয়েছে এবং নারীরা ভয়াবহ সহিংসতার শিকার হয়েছেন।”
অনেক শরণার্থী মনে করেন, আইসিজের রায় কার্যকর করার সরাসরি ক্ষমতা না থাকলেও এই বিচার প্রক্রিয়া বাস্তব পরিবর্তনের পথ তৈরি করবে।

৩৩ বছর বয়সী সাবেক শিক্ষক ও শরণার্থী সংগঠন ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গার সদস্য মোহাম্মদ সাঈদ উল্লাহ বলেন, “আমি আশা করি আইসিজে আমাদের গভীর ক্ষতগুলোর কিছুটা হলেও সান্তনা দেবে। অপরাধীদের অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। বিচার যত দ্রুত ও ন্যায্য হবে, ফল তত ইতিবাচক হবে। তখন হয়তো প্রত্যাবাসনের পথও খুলবে।”
মিয়ানমারের উইমেনস পিস নেটওয়ার্কের প্রধান ওয়াই ওয়াই নু বলেন, এই বিচার শুরুর মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের মধ্যে নতুন আশার জন্ম হয়েছে। তাঁর ভাষায়, “দশকের পর দশক ধরে চলা আমাদের দুর্ভোগ হয়তো এবার শেষের পথে।”
তিনি আরও বলেন, “রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে চলমান নিপীড়নের মধ্যে বিশ্বকে ন্যায়বিচারের প্রশ্নে দৃঢ় থাকতে হবে এবং মিয়ানমারে দায়মুক্তির অবসান ঘটিয়ে আমাদের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করতে হবে।”
আইসিজের এই শুনানিতে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক আদালতে রোহিঙ্গা নির্যাতনের শিকারদের বক্তব্য উপস্থাপন করা হবে। তবে সংবেদনশীলতা ও নিরাপত্তাজনিত কারণে শুনানিগুলো জনসাধারণ ও গণমাধ্যমের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে।
রোহিঙ্গা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন লিগ্যাল অ্যাকশন ওয়ার্ল্ডওয়াইড জানিয়েছে, আইসিজে যদি গণহত্যা সনদের আওতায় মিয়ানমারকে দায়ী ঘোষণা করে, তবে এটি কোনো রাষ্ট্রকে আইনগতভাবে গণহত্যার জন্য জবাবদিহির আওতায় আনার এক ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত হবে।
আইসিসিতে আলাদা মামলা
২০১৯ সালে আইসিজের প্রাথমিক শুনানিতে মিয়ানমারের তৎকালীন নেত্রী অং সান সু চি গাম্বিয়ার আনা অভিযোগকে ‘অসম্পূর্ণ ও বিভ্রান্তিকর’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তবে ২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। এরপর থেকে দেশটি চরম রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে রয়েছে।
বর্তমানে বিরোধী ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট (এনইউজি) জানিয়েছে, তারা আইসিজের এখতিয়ার গ্রহণ করেছে এবং মামলার বিরুদ্ধে আগের সব আপত্তি প্রত্যাহার করেছে। শুনানির আগে দেওয়া এক বিবৃতিতে এনইউজি স্বীকার করে, রাষ্ট্রের ব্যর্থতার কারণেই সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ভয়াবহ নৃশংসতা সংঘটিত হয়েছে। তারা প্রথমবারের মতো ‘রোহিঙ্গা’ পরিচয়ও আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেছে।
এদিকে, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে ভূমিকার অভিযোগে মিয়ানমারের সামরিক প্রধান সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইং-এর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) আলাদা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি রয়েছে।
আইসিসির প্রসিকিউশন জানিয়েছে, মিয়ানমারে এবং আংশিকভাবে বাংলাদেশে সংঘটিত রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নির্বাসন ও নিপীড়নের মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য ওই সেনাপ্রধান ব্যক্তিগতভাবে দায়ী।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, সামরিক শাসনের অধীনে বর্তমানে মিয়ানমারে যে নির্বাচন প্রক্রিয়া চলছে, তা স্বাধীন ও সুষ্ঠু নয়। এ অবস্থায় আইসিজের চলমান এই বিচারকে রোহিঙ্গাদের ন্যায়বিচারের পথে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।




