রাঙামাটির লংগদু উপজেলার ৫ শতাধিক কৃষককে কৃষিঋণের ফাঁদে ফেলার সঙ্গে জড়িত ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সংঘবদ্ধ চক্রকে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) চট্টগ্রামকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
মঙ্গলবার (২৩ জানুয়ারি) দুপুরে রাঙামাটির চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক মোঃ আবু হানিফ এই নির্দেশনা প্রদান করেন।
এরআগে পাবলিক প্রসিকিউটর ও রাঙামাটি জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি মোঃ রফিকুল ইসলাম সোনালী ব্যাংক লংগদু শাখা থেকে বিভিন্ন মানুষজনের নামে ভুয়া ঋণ দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করা হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন। এবং জালিয়াতি বন্ধে বেআইনী কার্যকলাপ বিষয়ে আদালতের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। এসময় সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত কয়েকটি প্রতিবেদনও আদালতে উপস্থাপন করেন পিপি।
বিষয়টি আমলে নিয়ে চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ আবু হানিফের আদালতে তার লিখিত আদেশে উল্লেখ করেন, উক্ত প্রকাশিত ও প্রচারিত সংবাদ সমূহ পাঠ ও দর্শন করে আদালতের এরূপ ধারণা হয় যে, লংগদু থানাধীন সোনালী ব্যাংক পিএলসি, লংগদু শাখা, রাঙামাটির এক বা একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ উক্ত ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশে একটি সংঘবদ্ধ চক্র ব্যাংকে রাখা জনগণের মূল্যবান অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। বেআইনী কার্যকলাপ জালিয়াতির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের নামে মিথ্যা ও ভুয়া ঋণ গ্রহণের কাগজপত্র তৈরি করে অর্থ উত্তোলন করে বেআইনীভাবে প্রায় পাঁচ শতাধিক মানুষকে হয়রানি ও ক্ষতিগ্রস্থ করেছেন।
এমতাবস্থায়, অপরাধে দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের তদন্ত করে জরুরি ভিত্তিতে প্রতিবেদন দাখিল করার জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) চট্টগ্রামকে নির্দেশ প্রদান করা হলো। দি পেনাল কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিউর ১৮৯৮ এর ১৯০(১)(সি) ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে আদেশ প্রদান করা হয়েছে। আদালত দৈনিক পত্রিকা সমূহের প্রতিবেদনের কপিসহ আদেশের অনুলিপি তদন্তকারী সংস্থা পিবিআই-চট্টগ্রাম এবং উপ পরিচালক দুর্নীতি দমন কমিশন রাঙামাটি জেলা কার্যালয়ে প্রেরণের নির্দেশ দেন। আগামী ৫ মার্চ আদালতে প্রতিবেদন প্রাপ্তির তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে।
এদিকে এরআগে সংবাদ মাধ্যমে রিপোর্ট প্রকাশিত হলে বিয়ষটি নিয়ে রাঙামাটির সোনালী ব্যাংকের ডেপুটি ম্যানেজার, দুদক, জেলা লিগ্যাল এইডসহ সোনালী ব্যাংকের চট্টগ্রামস্থ প্রধান কার্যালয় বরাবর আবেদন করেছিলেন লংগদুর বাসিন্দা তরুণ আইনজীবী অ্যাডভোকেট আলাল উদ্দিন। তিনি লংগদুর ক্ষতিগ্রস্ত প্রান্তিক কৃষকদের পক্ষে প্রতিকার চেয়ে লিখিত আবেদন করেন।
তিনি বলেন, লংগদুর উপজেলা একটি পিছিয়ে পড়া এলাকা। সেখানকার হতদরিদ্র কৃষকদের ঋণের ফাঁদে ফেলে কোটি কোটি টাকা লুটে নেওয়া হয়েছে। তাই আমি তাদের পাশে থাকার প্রত্যয়ে লড়ে যাচ্ছি।
এ বিষয়ে রাঙামাটি জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও পাবলিক প্রসিকিউটর মোঃ রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, একজন সচেতন নাগরিক ও আইনজীবী হিসেবে আমি বিষয়টি খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, উক্ত বিষয়ে কোনো মামলা হয়নি। তাই আমি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সুবিচার পাওয়ার লক্ষ্যে আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি। আদালত আমার অভিযোগটি আমলে নিয়ে উক্ত আদেশ প্রদান করেছেন।
পিপি বলেন, আমার মনে হচ্ছে সেখানে বড় ধরনের অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। যাদের নামে ঋণ তোলা হয়েছে তারা সবাই নিম্নবিত্তের লোক। আমি চাই, ক্ষতিগ্রস্তরা ন্যায় বিচার পাক এবং প্রকৃত অপরাধীরা আইনের আওতায় আসুক।
উল্লেখ্য, রাঙামাটির লংগদু উপজেলায় এনআইডিসহ বিভিন্ন কাগজপত্র জাল-জালিয়াতি করে প্রায় ৫০৬ জন প্রান্তিক কৃষকের নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেয় একটি সংঘবদ্ধ চক্র। বিগত ১০ থেকে ১২ বছর আগে সোনালী ব্যাংকের কতিপয় ব্যাংক কর্মকর্তা আলোড়ন চাকমা, আব্দুস ছাত্তার, বিল্লু কুমার তনচঙ্গ্যা, পিন্টু চাকমা, জ্ঞানেন্দু বিকাশ চাকমা, প্রফুল্ল কুমার দাশ, নবীন কান্তি চাকমা ও পূর্ণগীতি চাকমাসহ সোনালী ব্যাংকের ফিল্ড অফিসার, তৎকালীন ব্যবস্থাপক, স্থানীয় কিছু জনপ্রতিনিধি এবং তাদের চামচা মিষ্টি কালাম, সন্তোষ, হেলাল, হাতেম, লেখক জামাল, মুজিবুর মাস্টার নামক প্রতারকরা পরস্পর যোগসাজশে সেসময় কৃষি ঋণ প্রদানের নামে অন্তত ১০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। যার পরিমাণ সুদে-আসলে বর্তমানে ৩০ কোটি টাকা।



