
ছবি: সংগৃহীত
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও পেশাগত মান বজায় রাখতে শক্তিশালী স্ব-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা। তাদের মতে, সম্পাদকীয় স্বাধীনতা, মালিকপক্ষের জবাবদিহি, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও পেশাগত নৈতিকতা নিশ্চিত করতে কার্যকর স্ব-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রয়োজন।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) খুলনায় মিডিয়া রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এমআরডিআই) আয়োজিত বিভাগীয় মতবিনিময় সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
সভায় বক্তারা বলেন, সম্পাদকীয় নীতিমালার কার্যকর চর্চা, গণমাধ্যম পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি এবং পাঠক-দর্শকের অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা সংবাদমাধ্যমের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারে। স্বাধীনতা ও জবাবদিহির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার মাধ্যমে গণমাধ্যমের প্রতি মানুষের আস্থাও বাড়ানো সম্ভব।
বাংলাদেশে সাংবাদিকতার পেশাগত ও নৈতিক মানোন্নয়ন এবং সংবাদমাধ্যমে স্ব-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কার্যকর করার সম্ভাব্য কাঠামো নিয়ে আলোচনা করতে এ সভার আয়োজন করা হয়। হাইকমিশন অব কানাডা ইন বাংলাদেশের অর্থায়নে কানাডা ফান্ড ফর লোকাল ইনিশিয়েটিভের আওতায় ধারাবাহিক সংলাপের অংশ হিসেবে এটি ছিল এমআরডিআইয়ের প্রথম বিভাগীয় সংলাপ।
সভায় গণমাধ্যমের মালিক ও প্রকাশক, সম্পাদক, সংবাদ সিদ্ধান্তগ্রহীতা, সাংবাদিক ইউনিয়ন ও সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
এমআরডিআইয়ের নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর রহমান বলেন, স্ব-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা যত কার্যকর হবে, সংবাদমাধ্যমে বাহ্যিক হস্তক্ষেপের সুযোগ তত কমবে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা মানুষের আস্থার ওপর নির্ভরশীল উল্লেখ করে তিনি বলেন, পাঠক, শ্রোতা ও দর্শকের আস্থা ধরে রাখতে সংবাদমাধ্যমকেই নিজেদের জবাবদিহির ব্যবস্থা করতে হবে। এ জন্য সাংবাদিকদের পাশাপাশি সম্পাদক ও মালিকদের জন্য পৃথক আচরণবিধি প্রণয়নের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সাবেক প্রধান ও দ্য ডেইলি স্টারের কনসাল্টিং এডিটর কামাল আহমেদ বলেন, একটি স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন প্রয়োজন, যেখানে গণমাধ্যম নিজেদের ভুল নিজেরাই সংশোধনের সুযোগ পাবে। শুধু শাস্তি বাড়িয়ে বা আইন কঠোর করে কোনো খাতের পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নতি করা যায়নি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
গণমাধ্যমের সামগ্রিক সংস্কারের পাশাপাশি স্ব-নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে কামাল আহমেদ বলেন, স্ব-নিয়ন্ত্রণ যেন সেলফ সেন্সরশিপে পরিণত না হয়, সেদিকেও নজর রাখতে হবে।
দৈনিক গ্রামের কাগজের সম্পাদক মবিনুল ইসলাম মবিন বলেন, সম্পাদকীয় স্বাধীনতাকে প্রাতিষ্ঠানিক মূলনীতি হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের সুরক্ষা, পেশাগত মান বজায় রাখা এবং অনৈতিক বাহ্যিক বা অভ্যন্তরীণ হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যানের মতো সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
সভায় আলোচকরা বলেন, টেকসই স্ব-নিয়ন্ত্রণের জন্য এমন স্বাধীন ও শক্তিশালী সম্পাদকীয় নীতিমালা প্রয়োজন, যা সরকার, মালিকপক্ষ, বিজ্ঞাপনদাতা ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের চাপ মোকাবিলা করতে সক্ষম।
মানব সেবা ও সামাজিক উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক শামীমা সুলতানা শীলু বলেন, সাংবাদিকদের দায়িত্বশীলভাবে কাজ করতে হবে এবং আইন মেনে চলার পাশাপাশি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে। সাংবাদিকতায় প্রবেশের আগে যথাযথ প্রশিক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পেশাগত নৈতিকতা নিশ্চিত করতে সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই।
সভায় সাংবাদিকদের কর্মপরিবেশ নিয়েও আলোচনা হয়। অংশগ্রহণকারীরা বলেন, নৈতিক সাংবাদিকতার সঙ্গে সাংবাদিকদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সম্পর্ক রয়েছে। গণমাধ্যম মালিকদের সময়মতো বেতন, আনুষ্ঠানিক নিয়োগপত্র, আইনানুগ সুযোগ-সুবিধা ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তারা।
বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের যুগ্ম মহাসচিব হেদায়েত হোসেন মোল্লা গণমাধ্যমে আর্থিক স্বচ্ছতা ও সততা নিশ্চিতের ওপর গুরুত্ব দেন। কর্মীদের অধিকার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সুনির্দিষ্ট নীতিমালার পাশাপাশি সর্বজনীন ও আইনসম্মত নিয়োগপত্রের কাঠামো তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রধান সারা মনামী হোসেন বলেন, সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে বেশি তথ্যের চেয়ে প্রয়োজনীয় ও নির্ভরযোগ্য তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। কোনো তথ্য বা ঘটনা প্রকাশের আগে সেটি আদৌ সংবাদযোগ্য কি না, সেই প্রশ্নও সাংবাদিকদের করতে হবে।
সভায় আরও বক্তব্য দেন দৈনিক লোকসমাজের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক আনোয়ারুল কবির নান্টু, দৈনিক কল্যাণের সম্পাদক একরাম-উদ-দৌলা, দৈনিক মাথাভাঙ্গার সম্পাদক ও প্রকাশক সরদার আল আমিন, দৈনিক সময়ের খবরের সম্পাদক ও প্রকাশক মো. তরিকুল ইসলাম, দৈনিক প্রবাহের সহকারী সম্পাদক খালিদ হোসেন, সাংবাদিক গৌরাঙ্গ নন্দী, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সহকারী মহাসচিব এহতেশামুল হক শাওনসহ বিভিন্ন গণমাধ্যম, সাংবাদিক সংগঠন ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
প্রতিবেদক
চ্যানেল আই অনলাইন
চ্যানেল আই অনলাইন
আরও পড়ুন
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…
