আবারও সক্রিয় কিশোর গ্যাং, তুচ্ছ কারণে ঝড়ছে প্রাণ

আবারও সক্রিয় কিশোর গ্যাং, তুচ্ছ কারণে ঝড়ছে প্রাণ

রাজধানীর যাত্রাবাড়ি থানার কুতুবখালী এলাকার বাসিন্দা হাফিজ আহমেদের ছেলে আমির হোসেন (১৮)। পেশায় প্রিন্টিং প্রেসের সহকারী। গত ৭ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় বন্ধুকে রক্ষা করতে গিয়ে প্রতিপক্ষ কিশোর গ্যাং সদস্যদের ছুরিকাঘাতে গুরুত্বর আহত হন। বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিছানায় শরীরের যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছেন আমির। স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারছেন না।

ঘটনার দিনের কথা উল্লেখ করে আমিরের মা মমতাজ বেগম বলেন, ‘আমার দুই ছেলে ফকিরাপুল এলাকায় একটি প্রিন্টিং প্রেসে চাকরি করে। ৭ তারিখ সন্ধ্যায় দুই ভাই বাসায় আসে। আমি তাদের খাবার খেতে দেই। এর মধ্যেই আমির খাবারের বাটি রেখে বাসা থেকে বেরিয়ে যায়। একটু পরেই শুনি আমিরকে কারা যেন মারধর করেছে।’

মমতাজ বেগম আরও বলেন, ‘আমার স্বামী দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। কোনও কাজ করতে পারেন না। দুই ছেলে ও মানুষের বাসায় গৃহকর্মীর কাজ করে যা আয় হতো তা দিয়ে অনেক কষ্টে সংসার চালাতাম। সংকটাপন্ন এই অবস্থায় কি করবো বুঝতে পারছি না। ছেলের চিকিৎসার খরচ যোগাতেই হিমশিম খাচ্ছি। কি ভাবে চলবো বুঝতে পারছি না।’

প্রতিপক্ষের ধারালো অস্ত্রের কোপে গুরুত্বর আহত হয়ে আমির হোসেন প্রাণে বাঁচলেও বাঁচতে পারেনি তার বন্ধু ওয়েলডিং শ্রমিক জামাল হোসেন (১৮)।

প্রতিপক্ষ কিশোর গ্যাং গ্রুপের ধারালো অস্ত্রের কোপে হাসপাতালে আসার আগেই প্রাণ যায় তার। এই ঘটনায় যাত্রাবাড়ি থানায় নিহতের মা সুফিয়া বেগম বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। গ্রেফতার করা হয় হত্যায় জড়িত ৬ জনকে।

ভাগনের এমন মৃত্যু মানতে পারছেন না মামা ইকবাল হোসেন বলেন, ‘আমার ভাগ্নে পরিশ্রমের কাজ করত। তার খারাপ কোনও বিষয় চোখে পড়েনি। কি করে কি হয়ে গেলো বুঝতে পারছি না।’

হত্যায় জড়িতদের চেনেন না দাবি করে ইকবাল বলেন, ‘যারা আমার ভাগ্নেকে মেরেছে তাদের কেউরে চিনি না। তাদের সঙ্গে জামালের কোনো শত্রুতা ছিলো এমন কোনও কথা কেউ বলতে পারবে না। কিন্তু কি নির্মমভাবে হত্যা করলো। কোপানো শেষে তারাই আবার হাসপাতালে নিয়ে গেলো।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই ঘটনায় আমার বোন মামলা করেছে। এর পর আর এই বিষয় কিছু আমরা জানি না। পুলিশও আমাদের কিছু জানায়নি।’

এদিকে জামালের মায়ের মামলায় গ্রেফতার হয় হামলার মুলহোতা মো. সিফাত (১৮) ও তার সহযোগী ইমন গাজী (২১), মো. মোজাহিদ (১৮), মানিক মিয়া (১৮), জাহিদ হাসান (১৮) এবং মোঃ আসাদুল (১৮)। ঘটনার দিন থেকে পলাতক সিফাত গ্রুপের নিয়ন্ত্রক মো. মাসুদ নামের স্থানীয় এক দোকানি।

শুধু মাত্র আমির কিংবা জামাল নয় সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীর যাত্রাবাড়ি, গেন্ডারিয়াসহ আশাপাশের এলাকায় বেশ কয়েকটি কিশোর গ্যাং গ্রুপ সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তচ্ছু বিষয় কেন্দ্র করে অস্ত্র হাতে কুপিয়ে হত্যার মতো ঘটনা ঘটাচ্ছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ৭ জানুয়ারিসহ টানা তিন দিন যাত্রাবাড়ি ও গেন্ডারিয়া এলাকায় তিনটি কিশোর গ্যাংয়ের মারামারি ও ছুরিকাঘাতে একজনের মৃত্যু ও তিনজন আহতের ঘটনা ঘটেছে। এতে নড়েচড়ে বসেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।

স্থানীয়রা বলছে, কিশোর গ্যাং গ্রুপের মধ্যে সিনিয়র–জুনিয়র কেন্দ্র করে সবচেয়ে বেশি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে নিজেরা ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার পাশাপাশি তাদের হামলার শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। তবে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রছায়ায় থাকায় ভুক্তভোগীরা প্রতিকার পান না।

গত ৭ ফেব্রুয়ারি কুতুবখালী উচ্চ বিদ্যালয়ে জামাল হত্যার ঘটনাস্থলসহ আশপাশের এলাকায় ঘুরে জানা গেছে, যাত্রাবাড়ি ও আশপাশের এলাকায় বেশ কয়েকটি কিশোর গ্যাং গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। তারা এলাকায় নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে গ্যাংয়ের সদস্যদের নিয়ে নিয়মিত মহড়া দেয়।

প্রায়ই বিভিন্ন তুচ্ছ বিষয় নিয়ে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে গ্রুপের সদস্যরা। কিশোর গ্যাং গ্রুপের সদস্যরা সিনিয়র–জুনিয়র ভাগ হয়ে মোড়ে মোড়ে আড্ডা, গল্প-গুজব, মোবাইল ব্যবহার ও মোটরসাইকেলে শোডাউন দিয়ে নিজেদের আধিপত্য জানান দেয়। গ্রুপের অধিকাংশ সদস্যই দিনমুজর বা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী।

শিক্ষা থেকে ঝড়ে পড়া এসকল কিশোররা সারাদিন নিজেদের কাজ শেষে রাতের অন্ধকারের নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন।

গত ৭ ফেব্রুয়ারি আরও একটি কিশোর গ্যাং গ্রুপের সংঘর্ষের তথ্য আসে বার্তা২৪ এর হাতে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, যাত্রাবাড়ির পাশের এলাকা গেন্ডারিয়ায় তাছিন আহমেদ জিদান ও মো. সাব্বির নামে দুজনকে এলোপাতারি মারধর ও ছুরিকাঘাত করেছে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। ভুক্তভোগীরাও কিশোর গ্যাংয়েরই সদস্য।

এই ঘটনায়ও গেন্ডারিয়া থানায় দুই গ্রুপের পরিবারের সদস্যরা পৃথক পৃথক মামলা করেছেন। জিদানের পরিবারের মামলায় ছয়জনের নাম উল্লেখ করে আরও ২৫জনকে অজ্ঞাত এবং সাব্বিরের মামলায় দুজনের নাম উল্লেখ করে পাঁচজনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে।

ওয়ারি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, ‘যাত্রাবাড়িসহ আপাশের এলাকায় নিম্ন আয়ের মানুষের বসবাস বেশি। এখানে কিশোর গ্যাং বলতে বখাটে শ্রেণী বেশি সক্রিয়। তারা সারাদিন শ্রমিক হিসেবে কাজ করলেও সন্ধ্যায় একত্রে বসে মাদক সেবন করতে। আর এতেই ছোটখাট বিভিন্ন অপরাধ ঘটাচ্ছে। তবে তারা সক্রিয় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য না। তারা দল বেঁধে এখন পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ওপর চড়াও হওয়ার তথ্যও পাওয়া যায়নি। তারা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় মাদক গ্রহন করে।’

ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়ক লাগোয়া কুতুবখালী এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, সেখানে রিকশা চালক, মাছের আড়তের শ্রমিকসহ বিভিন্ন পেশার নিম্ন আয়ের মানুষের বসবাস। মহাসড়কের পাশের বিভিন্ন স্থানে রাত নামলেই মাদকের জমজমাট আসর বসে। প্রায়ই মাদক সেবন ও মোবাইলে ভিডিও গেম খেলা নিয়ে মারামারি হয়। যা আবার অস্ত্রের মহরায় রুপ নেয়। আর এই সকল মাদকাসক্ত কিশোরদের নিয়ন্ত্রণ করেন স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ী। যারা বর্তমানে সবাই এলাকা ছাড়া।

পুলিশ বলছে, কিশোর গ্যাং সমস্যা নিয়ে ইমধ্যে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি, কাউন্সিলরদের সঙ্গে ও স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নিয়ে কয়েক দফায় বৈঠক করা হয়েছে।

পুলিশের পক্ষ থেকে কিশোর গ্যাং ও মাদক কারবারিদের পক্ষ নিতে নিষেধ করা হয়েছে। কিশোর গ্যাং সদস্যদের ব্যবহার বন্ধে সবাইকে সর্তক করা হয়েছে।

জামাল হত্যার বিষয় জানতে চাইলে গেন্ডারিয়া জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) মধুসূদন দাস বলেন, এই ঘটনায় একটি মামলা হয়েছে। জড়িত প্রায় সবাইকেই গ্রেফতরা করা হয়েছে। বাকিদের ধরতে অভিযান চলছে।

গেন্ডারিয়া থানার ওসি মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, পৃথক দুটি কিশোর গ্যাংয়ের মারামারির ঘটনায় এখন পর্যন্ত একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা দুই পক্ষই মাদকসহ ছোটখাট অপরাধে জড়িত। তাদের মধ্যে মাদক সেবন নিয়ে এই ঘটনা ঘটেছে। আহত তাছিন আহমেদ জিদানের নামে মাদকের তিনটি মামলা আছে।

এ বিষয়ে ডিএমপির ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনার ইকবাল হোসাইন বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের সিনিয়র–জুনিয়র গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় মূলহোতাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর পেছনে আর কেউ আছে কী না সেটা তদন্ত করা হচ্ছে। তবে কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে নতুন কৌশল নেওয়া হচ্ছে। নিম্ন আয়ের এসব এলাকায় বখাটেসহ কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের তালিকা করা হবে।

Scroll to Top