অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসে শরীরের যেসব অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হয় | চ্যানেল আই অনলাইন

এই খবরটি পডকাস্টে শুনুনঃ

রক্তে শর্করার মাত্রা দীর্ঘদিন বেশি থাকলে শরীরের ছোট-বড় রক্তনালী ও স্নায়ুতন্ত্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এসব সমস্যাকে ডায়াবেটিসের দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস ধীরে ধীরে মাথা থেকে পা পর্যন্ত শরীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

হৃদযন্ত্র ও মস্তিষ্কে ঝুঁকি বাড়ে

ডায়াবেটিস রক্তনালীর স্বাভাবিক নমনীয়তা কমিয়ে দেয় এবং সেখানে চর্বি জমার প্রবণতা বাড়ায়। এতে উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি তৈরি হয়। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি সাধারণ মানুষের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি হতে পারে।

কিডনি বিকল হওয়ার আশঙ্কা

রক্ত পরিশোধনের গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করে কিডনি। দীর্ঘদিন রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকলে কিডনির সূক্ষ্ম রক্তনালীগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে কিডনির কার্যক্ষমতা কমে গিয়ে গুরুতর অবস্থায় কিডনি বিকল হতে পারে। বিশ্বজুড়ে কিডনি বিকল হয়ে ডায়ালাইসিস প্রয়োজন হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ ডায়াবেটিস।

চোখের দৃষ্টিশক্তি কমতে পারে

অতিরিক্ত রক্তশর্করা চোখের রেটিনার সূক্ষ্ম রক্তনালীগুলো ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এর ফলে দৃষ্টি ঝাপসা হওয়া, চোখে ছানি পড়াসহ বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে। দীর্ঘদিন চিকিৎসা না হলে গুরুতর দৃষ্টিশক্তি হ্রাস এমনকি স্থায়ী অন্ধত্বও হতে পারে।

স্নায়ুর ওপর ক্ষতিকর প্রভাব

দীর্ঘদিন রক্তে শর্করা বেশি থাকলে স্নায়ুর কার্যক্ষমতা কমে যেতে পারে। এর ফলে হাত-পায়ে ঝিনঝিন করা, অবশ ভাব, জ্বালাপোড়া বা সুই ফোটার মতো ব্যথা অনুভূত হতে পারে।

পায়ে ক্ষত ও সংক্রমণের ঝুঁকি

ডায়াবেটিসে রক্ত সঞ্চালন কমে যাওয়া এবং পায়ের স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে ছোটখাটো আঘাত বা জুতার ঘষা অনেক সময় রোগী টের পান না। সামান্য ক্ষত থেকেও সংক্রমণ ছড়িয়ে গুরুতর আকার ধারণ করতে পারে। চিকিৎসা না হলে গ্যাংগ্রিন হওয়ার আশঙ্কা থাকে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে আক্রান্ত অংশ কেটে ফেলতেও হতে পারে।

ত্বক ও মুখে সংক্রমণ

ডায়াবেটিসে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। ফলে ত্বকে ফোড়া, ছত্রাকের সংক্রমণ, দাঁত ও মাড়ির বিভিন্ন সমস্যা এবং মূত্রনালির সংক্রমণ বারবার দেখা দিতে পারে।

যৌন ও মূত্রথলির সমস্যা

ডায়াবেটিসের কারণে রক্তনালী ও স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হলে যৌনস্বাস্থ্যেও সমস্যা দেখা দিতে পারে। পুরুষদের ক্ষেত্রে লিঙ্গোত্থানজনিত সমস্যা এবং নারীদের ক্ষেত্রে মূত্রথলির নিয়ন্ত্রণে সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব

দীর্ঘদিন ডায়াবেটিসের মতো রোগের সঙ্গে বসবাসের মানসিক চাপ থেকে বিষণ্নতা বা অবসাদের মতো সমস্যা তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহে সমস্যা হলে স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া ও ডিমেনশিয়ার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

সুগার হঠাৎ কমে গেলে যা হতে পারে

দীর্ঘমেয়াদি জটিলতার পাশাপাশি রক্তে শর্করা হঠাৎ খুব কমে গেলেও জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা ৩.৯ মিলিমোল/লিটারের নিচে নেমে গেলে হাইপোগ্লাইসেমিয়া হতে পারে।

এ অবস্থায় বুক ধড়ফড়, অতিরিক্ত ঘাম, মাথা ঘোরা, শরীর কাঁপা এমনকি অজ্ঞান হওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। ব্যক্তি সচেতন থাকলে দ্রুত শর্করাযুক্ত খাবার বা পানীয় দেওয়া প্রয়োজন। গুরুতর অবস্থায় দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে।

সুগার অতিরিক্ত বেড়ে গেলেও বিপদ

রক্তে শর্করা অত্যন্ত বেড়ে গেলে ডায়াবেটিক কিটোঅ্যাসিডোসিস (ডিকেএ) বা হাইপারঅসমোলার হাইপারগ্লাইসেমিক স্টেটের মতো গুরুতর জটিলতা হতে পারে।

এ সময় অতিরিক্ত তৃষ্ণা, বমি বমি ভাব বা বমি, দ্রুত শ্বাস নেওয়া, পেটে ব্যথা এবং গুরুতর ক্ষেত্রে অচেতন হওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ইনসুলিন, তরল ও অন্যান্য জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে।

নিয়ন্ত্রণে রাখাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ

ডায়াবেটিসকে অনেক সময় ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয়, কারণ দীর্ঘদিন কোনো স্পষ্ট উপসর্গ ছাড়াই শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে নিয়মিত চিকিৎসা, রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চললে এর অনেক জটিলতা প্রতিরোধ বা বিলম্বিত করা সম্ভব।

এএইচএ১সি-এর মতো পরীক্ষার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি রক্তশর্করা নিয়ন্ত্রণের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা যায়। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে এএইচএ১সি ৭ শতাংশের নিচে রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও ব্যক্তিভেদে কাঙ্ক্ষিত মাত্রা ভিন্ন হতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রক্তে শর্করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা উচিত।

Scroll to Top